Taratala Godown Roof Collapsed

‘নির্মাণবিধি ভঙ্গ হয়নি!’ গুদামের নকশা পরীক্ষা করে রায় দেয় বিল্ডিং কমিটি, সই করে ছাড়পত্র দেন ফিরহাদ, প্রকাশ্যে এল নথি

ঘটনার দু’দিন পরে শুক্রবার সকালেও তারাতলার ওই গুদাম চত্বরে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ, দমকল, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলাকারী দল (এনডিআরএফ)। নিয়ে আসা হয়েছে অক্সিকাটার যন্ত্র।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ ১০:৪৫
কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম।

কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

তারাতলায় ভেঙে পড়া গুদামের নকশায় ভুল ছিল বলে বৃহস্পতিবার অভিযোগ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অথচ নকশায় ভুল নেই— এমনটা জানিয়ে পুরসভা যে নথি প্রকাশ করেছিল, তাতে স্বাক্ষর ছিল কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের, যিনি রাজনৈতিক মহলে ববি নামেই সমধিক পরিচিত। সেই নথি আনন্দবাজার ডট কম-এর হাতে এসেছে। ওই নথির একদম শেষে লেখা হয়েছে, “বহুতল (এ ক্ষেত্রে গুদাম) তৈরির ক্ষেত্রে কোনও অনিয়ম হচ্ছে না।” অর্থাৎ, গুদাম তৈরি করার ক্ষেত্রে ছাড়পত্র দিয়েছিল কলকাতা পুরসভা। বৃহস্পতিবার এই নথিই বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু দেখিয়েছিলেন। অন্য দিকে, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তারাতলাকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪ হয়েছে।

Advertisement
তারাতলায় চলছে উদ্ধারকাজ।

তারাতলায় চলছে উদ্ধারকাজ। ছবি: পিটিআই

বৃহস্পতিবার বিধানসভায় ওই নথি দেখিয়ে ফিরহাদ রাজ্যের প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূলকে আক্রমণ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বলেছিলেন, ‘‘সব জায়গায় টাকা নিতে নিতে সিটি অফ জয়কে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছে। এটা (এই দুর্ঘটনা) আপনাদের (তৃণমূল) পাপের ফল।’’ মুখ্যমন্ত্রী যখন এই অভিযোগ করেন, ফিরহাদ তখন বিধানসভায় উপস্থিত ছিলেন না। পরে শুভেন্দুর তোলা অভিযোগ প্রসঙ্গে কলকাতার প্রাক্তন মেয়র বলেন, “এ ব্যাপারে আমার জানা নেই। সাধারণ ভাবে পুরসভার প্ল্যান অনুমোদন হয় বিল্ডিং ডিপার্টমেন্ট থেকে। এমবিসি-তে (মিউনিসিপ্যাল বিল্ডিং কমিটি) টেকনিক্যাল লোকেরা থাকেন। আমার তাতে কোনও এক্তিয়ার নেই। কোনটা বেআইনি হল, কোনটা হল না, সেটা দেখারও এক্তিয়ার আমার নেই। এমবিসি থেকে কমিশনার হয়ে অনুমোদনের জন্য আমার কাছে আসে। ওটা শুধু একটা ফর্মালিটি, সই করার জন্য।’’ ভেঙে পড়া গুদামটির প্ল্যানের বিষয়ে তাঁর কিছুই জানা নেই বলেও দাবি করেন ফিরহাদ।

এ ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠেছে যে, এ ক্ষেত্রে কি দায় এড়াতে পারেন ফিরহাদ? না কি স্বাক্ষর থাকার জন্য তিনিও তদন্তের আওতায় আসতে পারেন। এই প্রসঙ্গে আইনজীবী তথা কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন মেয়র বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, “অনুমোদিত প্ল্যানে মেয়রের সই থাকে না। সংশ্লিষ্ট বিভাগের ইঞ্জিনিয়ার বা পুর কমিশনারের স্বাক্ষর থাকে। ফাইল নোটিংয়ে মেয়রের স্বাক্ষর থাকতে পারে। আমি মেয়র হিসাবে কখনও অনুমোদিত প্ল্যানে সই করিনি। উনি কেন করেছেন জানি না। যে হেতু উনি স্বাক্ষর করেছেন, তা-ই তদন্তের অবকাশ রয়েছে।”

ঘটনার দু’দিন পরে শুক্রবার সকালেও তারাতলার ওই গুদাম চত্বরে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ, দমকল, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলাকারী দল (এনডিআরএফ)। গুদামের ভেঙে পড়া ছাদের নীচে প্রাণের সন্ধান চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। নিয়ে আসা হয়েছে অক্সিকাটার যন্ত্র। ওই যন্ত্র দিয়ে সাহায্য করছেন ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষ। অক্সিকাটার দিয়ে লোহার বিম কাটার কাজ করা হয়। উদ্ধার অভিযানে সেনার আধিকারিকদের পাশাপাশি উপস্থিত রয়েছেন রেলের সেকশন ম্যানেজারও।

যে ১৪ জনের মৃত্যুর খবর জানানো হয়েছে, তাঁরা হলেন কৃষ্ণ চৌধুরী (উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ভাটপাড়ার বাসিন্দা), রোহিত চৌধুরী (পূর্ব বর্ধমান জেলার অগ্রদ্বীপ), চন্দ্রমা চৌধুরী (নদিয়া জেলার কোতোয়ালি), রাহুল চৌধুরী (নদিয়া জেলার কোতোয়ালি), পাপ্পুকুমার রজক (উত্তর ২৪ পরগনা জেলার শ্যামনগর), ঘী কুমার (বিহারের মুঙ্গের), আসগর হোসেন (কলকাতার একবালপুর), সাহিল সর্দার (দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বাসন্তী), হাসান ইমান (গার্ডেনরিচ), গণেশ কালান্দি (ধানবাদ), নবীন সিংহ (পশ্চিম বর্ধমান জেলার রানিগঞ্জ) এবং স্বপন মণ্ডল (শ্যামনগর)। মৃতদের মধ্যে দু’জনের এখনও নামপরিচয় জানা যায়নি। আহত ১৯ জন এখনও এসএককেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

পুরসভার নথি অনুযায়ী, তারাতলার ওই এলাকায় চারতলাবিশিষ্ট গুদাম তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। নথিতে ফিরহাদ ছাড়াও পুরসভার নির্মাণ বিভাগের ডিরেক্টর এবং পুর কমিশনারের স্বাক্ষর রয়েছে। নির্মাণের নকশা অনুমোদনের জন্য আবেদনকারী হিসাবে শম্ভুনাথ বেহরার নাম লেখা হয়েছে। শম্ভুনাথ ‘বেহরা ব্রাদার্স’ নামক সংস্থার অন্যতম অংশীদার হিসাবে এই আবেদন করেছিলেন। কলকাতা পুরসভা সূত্রে আগেই জানা গিয়েছিল, যে জমিতে গুদাম তৈরির কাজ চলছিল, সেটি বন্দর কর্তৃপক্ষের। ২০২৪ সালের অগস্টে তাঁরা ‘বেহরা ব্রাদার্স’ নামের ওই সংস্থাটিকে জমিটি ৩০ বছরের জন্য লিজ় দিয়েছিলেন। এই সংস্থা মূলত চা-পাতা গুদামজাত করা এবং প্যাকেজিংয়ের কাজ করে।

বুধবার বেলা ১২টা ৭ মিনিটে তারাতলায় আচমকাই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে নির্মীয়মাণ ওই গুদামের ছাদ। লোহার কাঠামো, কংক্রিটের স্তূপের নীচে চাপা পড়ে যান অন্তত ৪০ জন শ্রমিক। পুলিশ, দমকলের সঙ্গে রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যেরা উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছিলেন। পরে রাজ্য সরকারের অনুরোধে ভারতীয় সেনা এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী তাতে যোগ দেয়। একাধিক ক্রেন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঘটনাস্থলে। হাইড্রোলিক ক্রেন দিয়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ শুরু হয়। ভারী ভারী লোহার বিম ওই ক্রেনের সাহায্যে তুলে নীচে আটকে থাকা ব্যক্তিদের বার করার চেষ্টা চলে। এ ছাড়া, বিভিন্ন দিক থেকে গ্যাস কাটার দিয়ে লোহা কেটে ফাঁকা অংশ তৈরি করে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। কাউকে কাউকে সেখান দিয়ে বার করা সম্ভব হয়। লোহার বিমের গায়ে লেগে ছিল রক্ত ও মাংসপিণ্ড।

বুধবার বিধানসভার বক্তৃতায় ফিরহাদকে নিশানা করার পাশাপাশি প্রাক্তন মেয়রের তৎকালীন ওএসডি (অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি) কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কেও আক্রমণ করেছিলেন শুভেন্দু। পুরো নাম উচ্চারণ না করলেও শুভেন্দু বলেছিলেন, ‘‘কলকাতা পুরসভায় কালী না-বললে কোনও প্ল্যান (পাশ) হয় না।’’ তার পর বৃহস্পতিবার রাতেই সেই কালীকে প্রথমে আটক করা হয়। পরে তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

Advertisement
আরও পড়ুন