বুকভাঙা: দুর্ঘটনার খবর শুনেই ছুটে এসেছিলেন হাসপাতালে। সেখানে মৃতের তালিকায় ভাই রাহুল চৌধুরীর নাম দেখে হাহাকার সীমা চৌধুরীর। বুধবার, এসএসকেএম হাসপাতালে। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক
এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারের সামনে উদ্ভ্রান্তের মতো ছোটাছুটি করছিলেন বিরু মাহাতো। জামাইবাবু কৃষ্ণ চৌধুরীর কর্মস্থলে নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে পড়েছে শুনেই কল্যাণী থেকে ছুটে এসেছিলেন শ্যালক। গোড়ায় অবশ্য জামাইবাবুর খবর বিরুকে জানাননি হাসপাতালের কর্মীরা। কিছু ক্ষণ পরেই এসে পৌঁছন কৃষ্ণের ভাই শরবণ চৌধুরী-সহ অন্য আত্মীয়েরা। জানতে পারেন, দুর্ঘটনায় চিরতরেই হারিয়ে গিয়েছেন কৃষ্ণ।
শরবণ জানান, জগদ্দলের বাসিন্দা কৃষ্ণ ভাটপাড়ার রিলায়্যান্স জুটমিলে কাজ করতেন। মাস ছয়েক আগে ছাঁটাই হওয়ার পরে তারাতলায় পাইপলাইন ঝালাইয়ের কাজ করছিলেন। সংসারের একমাত্র রোজগেরে ছিলেন তিনিই। দুর্ঘটনার খবর শুনেই হাসপাতালে এসেছিলেন কৃষ্ণনগরের সীমা চৌধুরী। মৃতের তালিকায় ভাই রাহুল চৌধুরীর নাম দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
আর এক মৃত রোহিত চৌধুরী বর্ধমানের বাসিন্দা। এই ঘটনায় আটক এক শ্রমিক সরবরাহকারী তাঁর নিজের মামা। তিনি অন্যত্র কাজে ছিলেন। মাস কয়েক ধরে মামার হয়েই কাজ করছিলেন রোহিত। তাঁর বাবা কাজ করতে পারেন না। মা নীলম চৌধুরী আনাজ বিক্রেতা। রাতে পিজি-র ট্রমা কেয়ারের সামনে মাটিতে আছাড় খেয়ে কাঁদতে কাঁদতে নীলম বলছিলেন, ‘‘তোর তো বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। এ তুই কোথায় গেলি?’’
বুধবার তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে পড়ার খবর শুনে এসএসকেএমের ট্রমা কেয়ারের সামনে ভিড় করেছিলেন বহু শ্রমিকের পরিবার। তাঁদের কেউ কেউ পরিজনের সংবাদ পেয়েছেন। কারও কান্নার শব্দে চারপাশ ভারী হয়ে গিয়েছে, কেউ উদ্বিগ্ন মুখে বসে পড়েছেন হাসপাতাল চত্বরেই। রাত পর্যন্ত অনেকেই আত্মীয়ের খোঁজ পাননি। যেমন, বাসন্তীর ইদ্রিস আলি এসেছিলেন জামাইবাবু খালেক সর্দারের খোঁজে। খালেকের নাম আহতের তালিকায় নেই। অজ্ঞাতপরিচয় দু’টি দেহ দেখানো হয়েছিল ইদ্রিসকে। কিন্তু তিনি শনাক্ত করতে পারেননি। খোঁজ মিলছে না বাসন্তীর বাসিন্দা সাহিল সর্দার, রজ্জাক আলি গায়েনেরও।
ট্রমা কেয়ারের বিপর্যয় ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন রাজেন্দ্র রাও। ৫৫ বছরের রাজেন্দ্র জানালেন, এ দিন সকাল থেকে লোহার কাঠামোটা দুলছিল। কিন্তু কেন, কেউ বুঝতে পারেননি। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই হুড়মুড়িয়ে সব ভেঙে পড়ে। ওই শ্রমিক বলেন, ‘‘আমরা সকলেই চাপা পড়ে যাই। বুঝতে পারছিলাম, মাথা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে মুখের পাশ দিয়ে। কিন্তু, কিছু করতে পারছিলাম না।’’ হাসপাতালে পৌঁছনোর পরে রাজেন্দ্র লোকজনদের দেখে কেঁদে বলেন, ‘‘আমি বেঁচে আছি!’’
সব মিলিয়ে বুধবার রাত পর্যন্ত ২৩ জনকে এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে নিয়ে আসা হয়। তার মধ্যে পাঁচ জন মারা গিয়েছেন। এসএসকেএম সূত্রের খবর, আহতদের অনেকেরই হাত-পা ভেঙেছে। অনেকের মাথায় চোট। কারও কারও শরীরের ভিতরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।
বিকেলেই রাজেশ রুইদাস-সহ দু’জন রোগীকে ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তরিত করা হয়। বদন মুন্ডা নামে এক মহিলা শ্রমিককে ট্রমা কেয়ারের ‘রেড জ়োন’-এ রাখা হয়েছে। দু’জন শ্রমিকের মেরুদণ্ডে চোট আছে। রাত পর্যন্ত কোনও আহতেরই অস্ত্রোপচার করা হয়নি। আহতদের চিকিৎসার জন্য বিকেলেই শল্য, অস্থি, ইমার্জেন্সি মেডিসিন, স্নায়ু-শল্যের প্রবীণ চিকিৎসকদের নিয়ে বিশেষ দল তৈরি করেন এসএসকেএম-কর্তারা।
এ দিন দুপুরের পর থেকেই কলকাতা পুলিশ ও কলকাতা পুরসভার একের পর এক অ্যাম্বুল্যান্স আহতদের নিয়ে ট্রমা কেয়ার সেন্টারে ঢুকতে থাকে। বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ একটি অ্যাম্বুল্যান্স এসে দরজা খুলতেই ভিতরে ধুলো-কাদা মাখা এক মধ্য পঞ্চাশের ব্যক্তিকে দেখা যায়। অ্যাম্বুল্যান্স থেকে বেরিয়ে বিস্ফারিত চোখে চারপাশে দেখছিলেন তিনি। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন, এ কথা হয়তো বিশ্বাস হচ্ছিল না। পরে অ্যাম্বুল্যান্সে আনা হয় আর এক শ্রমিককে। মুখ ধুলো, কাদায় মাখামাখি। তার উপর দিয়েই কপাল থেকে চিবুক পর্যন্ত নেমে এসেছে রক্তের ধারা!
এ দিন হাসপাতালে আসেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, স্বাস্থ্য-প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার, স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম-সহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা। এসেছিলেন বন্দরের বিধায়ক ফিরহাদ হাকিমও। রাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘বুধবার রাতে ময়না তদন্ত করে বৃহস্পতিবার সকালে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। ক্রিটিক্যাল কেয়ারে চিকিৎসাধীন দু’জনের মধ্যে এক জন ভেন্টিলেশনে। আর এক জনের দেহে বিভিন্ন জায়গায় হাড় ভেঙেছে। যাঁরা এখনও আটকে আছেন, তাঁদের প্রয়োজনীয় সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে।’’ রাতে ফের হাসপাতালে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।