আরজি কর হাসপাতালে লিফ্টে আটকে মৃত্যু হয়েছে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আরজি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার ভবনের লিফ্ট কেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল? ঠিক কী কারণে যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটে? একাধিক বোতাম টেপার ফলে লিফ্টে কোনও সমস্যা হয়েছিল কি না, একাধিক প্রশ্ন রয়েছে। শনিবার বেলার দিকে হাসপাতালে যায় ফরেনসিক দল। তারা ঘটনাস্থল থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। ধৃত পাঁচ জনকে শনিবারই শিয়ালদহ আদালতে হাজির করানো হবে। তাঁদের হেফাজতে চাইবে পুলিশ।
আরজি করের লিফ্টে আটকে বেঘোরে প্রাণ হারিয়েছেন দমদমের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিন বছরের সন্তানের চিকিৎসা করাতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তিনি। ভোররাতে ট্রমা কেয়ারের লিফ্টে আটকে পড়েন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী এবং সন্তানও। অভিযোগ, লিফ্ট নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এক বার উপরে উঠে একেবারে নেমে যায় বেসমেন্ট পর্যন্ত। সেখানে দরজা একবার খুলেছিল। বেরিয়ে আসেন অরূপের স্ত্রী, সন্তান। কিন্তু তিনি বেরোনোর আগেই দরজা বন্ধ হয়ে যায়। লিফ্ট উপরে উঠতে শুরু করে। এই সময়ে লিফ্টের দরজায় আটকে গুরুতর জখম হন অরূপ। বেসমেন্টে লিফ্টের বাইরে একটি লোহার গ্রিলযুক্ত দরজা তালাবন্ধ অবস্থায় ছিল। পরিবারের অভিযোগ, সঠিক সময় তালা খোলা গেলে অরূপকে বাঁচানো যেত। কিন্তু তাঁর স্ত্রী, সন্তানের প্রাণপণ চিৎকার সত্ত্বেও কেউ সাহায্যে এগিয়ে আসেননি। ভাঙা যায়নি তালা।
সরকারি হাসপাতালের লিফ্টের সামনে লিফ্টম্যানের থাকার কথা। কেন ওই লিফ্টে কেউ ছিলেন না? প্রশ্ন উঠেছে। শুক্রবারই এই ঘটনায় তিন জন লিফ্টম্যান মিলনকুমার দাস, বিশ্বনাথ দাস, মানসকুমার গুহ, নিরাপত্তারক্ষী আশরাফুল রহমান, শুভদীপ দাসকে টালা থানার পুলিশ গ্রেফতার করে। শনিবার ফরেনসিক দফতরের পদার্থবিদ্যা বিশেষজ্ঞদের একটি দল সংশ্লিষ্ট লিফ্ট থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছে। কোন তলা থেকে অরূপেরা লিফ্টে উঠেছিলেন, কোন বোতাম টিপেছিলেন, লিফ্ট কোথায় তাঁদের নিয়ে যায় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আগে থেকেই লিফ্টে যান্ত্রিক সমস্যা থাকলে তা কেন নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়নি? উঠছে সেই প্রশ্নও। রবিবার ঘটনাস্থলে যাবেন ফরেনসিক দফতরের জীববিদ্যা বিভাগের আধিকারিকেরা।
যেখান থেকে অরূপের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সেখান থেকেও ফরেনসিক দল নমুনা সংগ্রহ করেছে। নমুনা নেওয়া হয়েছে বেসমেন্ট থেকেও। লিফ্টের রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ছিল কি না, ঠিক কোথায় গলদ ছিল, খুঁজে বার করতে মরিয়া তদন্তকারীরা। লালবাজারের গোয়েন্দারা বিষয়টি দেখছেন। টালা থানা থেকে হোমিসাইড বিভাগ তদন্তভার গ্রহণ করেছে। অরূপের দেহের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট বলছে, তাঁর হাত, পা এবং পাঁজর ভেঙে গিয়েছে। হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস, যকৃৎও আঘাতে ফেটে (রাপচার) গিয়েছে।
মৃতের পরিবারের অভিযোগ, বেসমেন্টে লিফ্টের বাইরের লোহার গ্রিলের দরজা খোলার জন্য দেড় থেকে দু’ঘণ্টা কাকুতিমিনতি করেছিলেন তাঁরা। ঘটনাস্থলে অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। এমনকি, উর্দিধারী কেন্দ্রীয় বাহিনীকেও দেখা গিয়েছে, যারা এই ধরনের উদ্ধারকাজে অপেক্ষাকৃত দক্ষ। মৃতের দিদির অভিযোগ, হাতজোড় করে অনুরোধ করা সত্ত্বেও কেউ তালা ভাঙতে এগিয়ে আসেননি। তালার চাবি খোঁজা হচ্ছিল। জানানো হয়, চাবি রয়েছে পূর্ত দফতরের কাছে! দাবি, দ্রুত ওই তালা ভাঙা হলে হয়তো অরূপকে বাঁচানো যেত।
অরূপের স্ত্রী ঘটনার একমাত্র প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যক্ষদর্শী। ফলে তাঁর বয়ান এই তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। অনিচ্ছাকৃত হত্যার মামলা রুজু করে তদন্ত চলছে। আরজি কর কর্তৃপক্ষ একাধিক বৈঠকও করেছেন। তাঁরা স্বাস্থ্য ভবনে একটি রিপোর্ট জমা দেবেন।