— প্রতীকী চিত্র।
রোগী ভর্তি থেকে ইচ্ছে মতো ভাড়া— সবেতেই দীর্ঘ দিন ধরে চলছে অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের ‘দাদাগিরি’। সরকারি হাসপাতালে এসে শয্যা না পাওয়া অধিকাংশ রোগীই এই অ্যাম্বুল্যান্স-চক্রের খপ্পরে পড়ে চলে যান বেসরকারি হাসপাতালে। দিনের পর দিনের এই চেনা ছবির বদল ঘটাতে এ বার শহরের পাঁচটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে রাখা হয়েছে দু’টি করে সরকারি অ্যাম্বুল্যান্স। রেফার হওয়া রোগীদের ওই অ্যাম্বুল্যান্সই পৌঁছে দেবে অন্য হাসপাতালে। শনিবার রাত থেকে পরীক্ষামূলক ভাবে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। এবং ওই দিনই গভীর রাতে শহরের চারটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আচমকা পরিদর্শনে গেলেন স্বাস্থ্যসচিব।
সম্প্রতি রাজ্যের স্বাস্থ্য প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে একাধিক নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে রেফারের নামে রোগী-ভোগান্তি বন্ধ করতে বেসরকারি অ্যাম্বুল্যান্সের উপরে সরকারি নজরদারি ও কড়া নিয়ন্ত্রণ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সরকারি মেডিক্যাল কলেজ থেকে রোগী প্রত্যাখ্যানের সংখ্যা শূন্যে নামানোরও নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। শুক্রবার এসএসকেএমে উচ্চ পর্যায়ের ওই বৈঠকের পরে শনিবার রাজ্যের সমস্ত মেডিক্যাল কলেজ এবং সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভিডিয়ো-বৈঠক করেন স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম। সূত্রের খবর, সেখানেই পরীক্ষামূলক ভাবে এসএসকেএম, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ, নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ, আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে পরীক্ষামূলক ভাবে অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা চালুর কথা জানানো হয়।
স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর, ওই পাঁচটি হাসপাতালেই সুপারের তত্ত্বাবধানে আরও তিন-চার জন আধিকারিককে নিয়ে একটি বিশেষ ডেস্ক তৈরি করা হয়েছে। তাঁরা জরুরি বিভাগের দিকে নজর রাখবেন। কোনও রোগী শয্যা না পেলে তাঁকে ওই ডেস্ক থেকে অন্যত্র যেতে বিনামূল্যে অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। স্বাস্থ্যসচিব বলেন, ‘‘রোগী-স্বার্থে কোথাও কোনও খামতি রাখা হবে না।’’
নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরেই স্বাস্থ্য ভবনের তরফে রাজ্যের সমস্ত মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে জানানো হয়েছিল, যে কোনও সময়ে সেখানে আচমকা পরিদর্শনে যেতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী। তাই সতর্ক থাকতে হবে। তবে মুখ্যমন্ত্রী এখনও তা শুরু না করলেও তাঁর নির্দেশে দফতর যে তৎপর, তারই প্রমাণ মিলল শনিবার রাতে। ওই রাতে প্রথমে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছে যান স্বাস্থ্যসচিব। আচমকাই তাঁকে দেখে হকচকিয়ে যান হাসপাতালের কর্মীরা। সূত্রের খবর, প্রতিটি হাসপাতালে প্রায় ঢোকার মুখে সেখানকার কর্তৃপক্ষকে ফোন করেন স্বাস্থ্যসচিব। কোথাও তাঁর ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি ছুটে এসেছেন অধ্যক্ষ, সুপারেরা। কোথাও আবার তাঁরা গাড়ির অভাবে আসতে পারেননি। তাঁদের জায়গায় ওই হাসপাতালের সিনিয়র চিকিৎসকেরা হাজির হয়েছিলেন।
ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ থেকে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ, আর জি কর হয়ে এন আর এসে যান স্বাস্থ্যসচিব। সর্বত্রই জরুরি বিভাগে গিয়ে সেখানকার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন তিনি। কত জন চিকিৎসক-নার্স রয়েছেন, ওষুধ কী আছে— সব দেখতে চান স্বাস্থ্যসচিব। পাশাপাশি, তিনি কথা বলেন রোগী এবং তাঁদের পরিজনদের সঙ্গেও। জরুরি বিভাগ থেকে বেরিয়ে হাসপাতাল চত্বরও ঘুরে দেখেন স্বাস্থ্যসচিব। ‘রিয়্যাল টাইম বেড ভ্যাকেন্সি সিস্টেম’-এর যে মনিটর সব হাসপাতালে লাগানো হয়েছিল, সেগুলি কী অবস্থায় রয়েছে, তা-ও খতিয়ে দেখেন। সূত্রের খবর, কার্যত সর্বত্রই তা বন্ধ রয়েছে। অবিলম্বে সেগুলি চালুর নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
পরিদর্শনের পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রাতে বৈঠকও করেছেন স্বাস্থ্যসচিব। যেমন, আর জি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার এবং সেখানে চলা জরুরি বিভাগ ঘুরে দেখে সেখানকার অধ্যক্ষ, সুপারের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। পরিকাঠামোর বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ নেন। আবার এন আর এসে গিয়ে রোগীদের পরিজন ও হস্টেলের পানীয় জলের ব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে স্বাস্থ্যসচিব নির্দেশ দেন, কলকাতা পুরসভাকে দিয়ে প্রতি সপ্তাহে জলের নমুনা পরীক্ষা করানো বাধ্যতামূলক।