Dey House of tangra

প্রতিবেশীদের স্মৃতিতে আজও আতঙ্ক ট্যাংরার সেই দে বাড়ি

সে দিন ভোরে ই এম বাইপাসের আনন্দপুর থানা এলাকায় একটি গাড়ি দুর্ঘটনার তদন্তে নেমে ট্যাংরার অতুল শূর রোডের দে পরিবারের ‘চিত্তনিবাস’-এর ভয়াবহ ঘটনার কথা জানতে পারে পুলিশ।

চন্দন বিশ্বাস
শেষ আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৭
পরিত্যক্ত: পরিবারের তিন জনের দেহ উদ্ধারের ঘটনার এক বছর পরে দে বাড়ি। বুধবার, ট্যাংরার অতুল শূর রোডে।

পরিত্যক্ত: পরিবারের তিন জনের দেহ উদ্ধারের ঘটনার এক বছর পরে দে বাড়ি। বুধবার, ট্যাংরার অতুল শূর রোডে। ছবি: রণজিৎ নন্দী।

সিসি ক্যামেরায় চার দিক মোড়া চারতলা বাড়ির সাদা রঙে এক বছরেও ধুলোর প্রলেপ জমেনি। সুবিশাল বাড়ির দেওয়ালে ও একতলার টালিতে ধুলো না জমলেও বাড়ির ভিতরে বিপরীত ছবি। মলিনতার ছাপ সেখানে স্পষ্ট। বন্ধ দরজা এবং গ্যারাজের ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি যত দূর যায়, তাতেই তা কিছুটা নজরে পড়ে। দরজার ফাঁকে জমে রয়েছে বিদ্যুতের বিল। বাড়ির পিছনে জমানো আবর্জনা। যা বাড়িটির সঙ্গে বড্ড বেমানান। এক বছর আগে ট্যাংরার দে পরিবারের সদস্যদের ভিড়ে চারতলা এই ‘চিত্তনিবাস’ গমগম করলেও সে সব এখন অতীত। বাড়িটি এখন এক বছর আগের আতঙ্কের স্মৃতি পড়শিদের কাছে।

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫। সে দিন ভোরে ই এম বাইপাসের আনন্দপুর থানা এলাকায় একটি গাড়ি দুর্ঘটনার তদন্তে নেমে ট্যাংরার অতুল শূর রোডের দে পরিবারের ‘চিত্তনিবাস’-এর ভয়াবহ ঘটনার কথা জানতে পারে পুলিশ। চারতলা ওই বাড়ি থেকে তিনটি দেহ উদ্ধার করে তারা। বাড়ির ভিতরে পড়ে ছিল দে পরিবারের বড় বৌ সুদেষ্ণা, ছোট বৌ রোমি এবং রোমির কিশোরী কন্যা প্রিয়ম্বদার দেহ। সেই ঘটনার তদন্তে নেমে তাঁদের খুনের অভিযোগে রোমির স্বামী প্রসূন দে এবং সুদেষ্ণার স্বামী প্রণয় দে-কে গ্রেফতার করে ট্যাংরা থানার পুলিশ। তদন্তে উঠে আসে, ঋণে জর্জরিত হয়ে স্ত্রী এবং সন্তানদের খুন করে আত্মহত্যার পরিকল্পনা করেছিল প্রসূন এবং প্রণয়। সেই মতো দুই ভাই পায়েসের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে পরিবারের সকলকে খাইয়ে দিয়েছিল। এর পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে শ্বাসরোধ এবং ধারালো অস্ত্রের প্রয়োগের প্রমাণও তদন্তে মেলে। কিন্তু ওই পায়েস খেয়ে তিন জনের মৃত্যু হলেও প্রসূন, প্রণয় এবং প্রণয়ের নাবালক ছেলে বেঁচে যায়। তিন জন একসঙ্গে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। সেই মতো রাতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে বাইপাসে মেট্রোর স্তম্ভে ধাক্কা মারে তারা। দুর্ঘটনায় তিন জন গুরুতর আহত হলেও বেঁচে যায়।

দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পরে প্রসূন ও প্রণয়কে গ্রেফতার করে পুলিশ। সেই বিচার প্রক্রিয়া এখনও চলছে। এক রাতে পরিবার হারানো দে পরিবারের জীবিত নাবালকের ঠিকানাও বদলে গিয়েছে। আপাতত তার ঠাঁই হয়েছে এক আত্মীয়ের বাড়িতে।

বুধবার অতুল শূর রোডের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, বাড়ির বাইরে বৈভবের চিহ্ন এখনও স্পষ্ট। বাড়ির চার দিকে লাগানো সিসি ক্যামেরা, একাধিক বাতানুকূল যন্ত্র। তালাবন্ধ দরজার ফাঁকে জমে আছে কয়েকটি বিদ্যুতের বিল। তবে কয়েক মাস ধরে আর সে সবও আসে না। গ্যারাজের দরজায় সাঁটা ঋণখেলাপির নোটিস। এক বছর পরেও বাড়ি ঘিরে প্রতিবেশীদের কৌতূহল কমেনি। কয়েক মিনিট ঘুরতেই প্রতিবেশীদের কয়েক জন এগিয়ে এসে বলতে শুরু করলেন, ‘‘আবার কিছু হয়েছে? বাড়িটি ভেঙে ফেলা হবে নাকি?’’ এক জনের বক্তব্য, ‘‘বাড়িটা ভেঙে ফেললেই ভাল। তিনটি দেহ মিলেছিল। ভয় করে।’’ ওই যুবকের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকেই পাশের ফ্ল্যাটের জানলা দিয়ে এক মহিলা জানালেন, ঘটনার পরে প্রথম কয়েক মাস এই চত্বরে পুলিশের ভিড় থাকত। আশপাশ থেকে অনেকে দে বাড়ি দেখতে আসতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় পাতলা হয়েছে। মহিলা যোগ করলেন, ‘‘চার দিকে আলো রয়েছে। তবু রাতে বাড়িটার সামনে দিয়ে যেতে গা ছমছম করে। এক বছর আগে পর পর দেহ বার করার স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে।’’

বন্ধ গ্যারাজের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেই একটি ক্রিকেট বল চোখে পড়ল। বলে ধুলোর আস্তরণ। হয়তো ঠিকানাহারা নাবালকেরই সেটি।

আরও পড়ুন