বইমেলায় যাদবপুর ইউনিভার্সিটি প্রেসের স্টলে এক বইপ্রেমী। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক।
বই শুধু পড়ার নয়। দেখারও। বইমেলায় যাদবপুর ইউনিভার্সিটি প্রেসের স্টলে কমিক-স্ট্রিপ ও পটচিত্রের মোড়কে রামপ্রসাদ, কবীরদের গান, দোহায় হামলে পড়েছেন ক’জন নবীন পাঠক। তারাকে ‘দুটো দুঃখের কথা কই গো’ বলে সংলাপ, তার ইংরেজি তর্জমার পাশে ছবিটিও রামপ্রসাদের চিরকালীন সরস মনের স্বাক্ষর। কিংবা আঠারো শতকের ফারসি গদ্য বাহার-ই-জ়াখর-এর অংশে ভারতীয় অধ্যাত্ম দর্শনে দেহমন ও পৃথিবীর সম্পর্কের সচিত্র ব্যাখ্যা পাঠককে টেনে নিয়ে যাচ্ছে লেখনীর বয়ানের অতলে।
‘ফেমিন টেলস’ বিষয়ক এই গ্রাফিক সঙ্কলনের দামটা একটু চড়া তবু লোভ সামলাতে পারলেন না, কিশোর পুত্রকে সঙ্গে করে আনা আসানসোলের এক স্কুলশিক্ষক। বললেন, “ছবিতে, লেখায় সহজ ইংরেজি, বাংলায় বাংলা-ব্রিটেনের পুরনো দুর্ভিক্ষের গল্পগুলো ছেলেকে পড়াতে চাই!” ১৬-১৯ শতকের ভারত ও ব্রিটেনের কয়েকটি বিখ্যাত দুর্ভিক্ষের আখ্যান নিয়ে যৌথ প্রকল্পে শামিল হয়েছিল বিলেতের এক্সিটার বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর। সেই কাজই গ্রাফিক সঙ্কলন হয়ে উঠেছে। আজকের সদা ব্যস্ত তাৎক্ষণিক মনোযোগের যুগে এ নিছকই বইয়ের বিকল্প টোটকা নয়! লেখা ছড়াও ছবিতে ভিন্ন মাত্রা আনছে ইতিহাস-সাহিত্য পাঠে। পিংলার সদ্য প্রয়াত দুখুশ্যাম চিত্রকর এবং দেশের প্রথম সারির তরুণ অলঙ্করণ শিল্পীদের সমন্বয়েরও ফসল এই কাজ।
যাদবপুর ইউনিভার্সিটি প্রেসের অধিকর্তা তথা ইংরেজির অধ্যাপক অভিজিৎ গুপ্ত বলছিলেন, “আমরা দেখলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা গবেষণা প্রকল্প থেকেও আকর্ষক বই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে! কাজটার উৎকর্ষের জন্য বইটা একটু দামি হলেও ভাবছি, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, শেক্সপিয়রের সময়ের ব্রিটেন বা চণ্ডীমঙ্গলের সময়কার বাংলার দুর্ভিক্ষ নিয়ে আলাদা ছোট বই হতে পারে। দামটাও তাতে কমবে।” এই বইটি অন্য ভাষায় তর্জমা করানোর কথাও ভাবছেন যাদবপুর প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ।
দেশের শিক্ষাবাজেটে বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রাপ্তির হাঁড়ির হালের পটভূমিতে নানা কিসিমের বইয়ের উদ্ভাবনে স্বনির্ভর হওয়ার পথও দেখাচ্ছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। এখনও ২৫-৩০ শতাংশ সহায়তা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ করেন। কিন্তু বই বিক্রি ও নানা ধাঁচের প্রকল্প, গাঁটছড়ায় স্বনির্ভর হওয়াই লক্ষ্য যাদবপুরের প্রকাশনার।
এই চেষ্টা ততটা দেখা যায় না এ দেশের বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনার গর্বের ঐতিহ্য থাকলেও তা ধরে রাখার চেষ্টা এখন ছিটেফোঁটা। বইমেলায় তাদের স্টল থাকলেও অনলাইন কেনাকাটার সুবিধা পর্যন্ত নেই। পূর্বতন উপাচার্যের আমলে বিশ্বভারতীর বই প্রকাশও কার্যত বন্ধ ছিল। এখন তারা আবার রবীন্দ্র রচনাবলীর সুলভ সংস্করণ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের নানা বই ছাপছেন। বইমেলায় স্বরবিতান থেকে গোরা, রক্তকরবীর আকর্ষণও কম নয়। কিন্তু রবীন্দ্র আদর্শের পথ ধরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নানা বিষয়ের জ্ঞানচর্চার বই প্রকাশ ধারা দুর্লভ।
যাদবপুরে কিন্তু গ্রাফিক আঙ্গিকে কোয়ান্টাম মেক্যানিক্স, এআই থেকে ইতিহাস চর্চার গুরুত্বপূর্ণ বই হয়েছে, হচ্ছে। জালিয়ানওয়ালাবাগের স্মৃতির ইতিহাস কিংবা বিশশতকের ভারত-কাঁপানো বাংলা নাটক সীতার সমকালীন সটীক সংস্করণও বিকোচ্ছে। আবার জাপানি, জার্মান, পর্তুগিজ, পোলিশ, ফরাসি, ইউক্রেনের সাহিত্য থেকে বাংলা তর্জমার প্রকল্পে সরাসরি সে-দেশের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধছে যাদবপুর প্রকাশনা। জেমস জয়েসের ডাবলিনার্স বাংলায় ‘ডাবলিননামা’ হয়েছে। গগনেন্দ্রনাথের ভোঁদড় বাহাদুর, গিরিন্দ্রশেখর বসুর লালকালোর-ও রয়েছে ইংরেজি তর্জমা। অভিজিতের কথায়, “যাদবপুরে অঢেল সৃজনশীল স্বাধীনতা। আমলাতান্ত্রিক ফাঁস নেই বলেই এগোতে পারছি।”