পরিবহণের অপেক্ষায় যাত্রীরা। সোমবার, ধর্মতলায়। —নিজস্ব চিত্র।
ভোটার তালিকায় বাদ পড়া জনতার জন্য উৎকণ্ঠায় মহানগরের প্রাণকেন্দ্রে ধর্নায় বসেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু যান নিয়ন্ত্রণে পুলিশের অতি স্পর্শকাতরতা এবং সাবধানতায় দুর্ভোগের শিকার সেই জনতাই। যা পরিস্থিতি, তাতে ধর্মতলার জওহরলাল নেহরু রোডে মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না মঞ্চের উল্টো দিকে জনসাধারণের চলাফেরা থেকে ইদের বাজার, দুটোই পদে পদে ঠোক্কর খাচ্ছে।
রাজ্যের লক্ষ লক্ষ লোকের ভোটাধিকারের ন্যায্য দাবি মেলে ধরার কথা বলে গত শুক্রবার, ৬ মার্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না চলছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, রাতে অবস্থান মঞ্চে থাকছেনও মুখ্যমন্ত্রী। অনেকের মনে হচ্ছে, শহরের প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলায় স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখার বদলে ভিভিআইপি রাজনীতিকদের ‘স্বাচ্ছন্দ্যই’ পুলিশের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান শুরুর এক দিন আগেই ওই তল্লাটে পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখেন নগরপাল সুপ্রতিম সরকার। সেই মতো ধর্না মঞ্চ ঘিরে যাবতীয় পরিকল্পনা করা হয়। তার পরেও জনসাধারণের দুর্ভোগে প্রশ্ন উঠছে, কার জন্য কাজ করে এ শহরের পুলিশ?
তা ছাড়াও প্রশ্ন উঠছে, মানুষের স্বার্থের জন্য যাঁরা ধর্না দিচ্ছেন বলে দাবি, মানুষেরই এই দুর্ভোগ কি আদৌ তাঁদের চোখে পড়ছে? যদি পড়ে থাকে, তা হলে দুর্ভোগ কমাতে কি কোনও পদক্ষেপ করা হচ্ছে? এ প্রসঙ্গে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ বলেন, ‘‘ব্যস্ত সময়ে যান চলাচলে সমস্যা এড়াতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া আছে। আর যেখানে ধর্না চলছে সেখানে হকারেরা বিশেষ বসেনও না।’’ তাঁর আরও মন্তব্য, ‘‘রাজ্যবাসীর জীবন-জীবিকা চিরতরে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এই কর্মসূচি। মনে রাখতে হবে, এ দেশের কোনও নাগরিককে যাতে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া না হয়, তা নিশ্চিত করতে এই ধর্না।’’
ধর্মতলার টিপু সুলতান মসজিদের আশপাশে ইফতারের পসরা সাজান অনেকে। মসজিদে বৈকালিক আজানের সঙ্গে সঙ্গে মসজিদ চত্বর বা আশপাশেই অনেকে ইফতার সারেন। তা ছাড়া, ধর্মতলায় সাবেক মেট্রো সিনেমার ফুটপাত থেকে পিছনে নিউ মার্কেট তল্লাট রমজান মাসে রাত পর্যন্ত ইদের কেনাকাটি উপলক্ষে সরগরম থাকে। কিন্তু বাস চলাচলে কড়া নিয়ন্ত্রণে ইদের বাজার ফেরত গৃহমুখী জনসাধারণ দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
ধর্মতলায় জওহরলাল নেহরু রোডের একটা দিকে (যে দিকে মুখ্যমন্ত্রীর ধর্না মঞ্চ) গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। সন্ধ্যার পরে চাঁদনি চকের ই-মল থেকে নিউ এম্পায়ার-লাইটহাউসের গলি পর্যন্ত রাস্তায় যান চলাচল কার্যত বন্ধ। ই-মলের পাশে ম্যাডান স্ট্রিট হয়ে নিউ মার্কেটের পাশ দিয়ে দক্ষিণ কলকাতামুখী গাড়ি ফের জওহরলাল নেহরু রোডে পড়ছে। রাতে জওহরলাল নেহরু রোডে মেট্রো চ্যানেলে ধর্নামঞ্চের দিকটা কার্যত শব্দবিহীন এলাকা ঘোষণা করে দিয়েছেন লালবাজারের কর্তারা।
আবার উত্তরমুখী যানবাহনের একাংশ পার্ক স্ট্রিট উড়ালপুল থেকে নামতেই মেয়ো রোড হয়ে বি বা দী বাগের দিক দিয়ে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দিনের বেলায় কিছু ছোট গাড়ি অবশ্য জওহরলাল নেহরু রোডে ধর্না মঞ্চের দিকটা ছেড়ে মেট্রো সিনেমার সামনে দিয়ে উত্তরে যাওয়ার ছাড়পত্র পাচ্ছে। তবে তারা সরাসরি চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ বা লেনিন সরণি ধরতে পারছে না। বাঁ দিকে এসপ্ল্যানেড ইস্টের রাস্তা ধরে ডেকার্স লেনের কাছ থেকে উল্টো দিকে ঘুরে ফের ধর্মতলার মোড় হয়ে তাদের এগোতে হচ্ছে।
সোমবার বিকেল ৪টে নাগাদ ধর্মতলার সরকারি বাস গুমটির সামনে ছোট ছেলেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেটিয়াবুরুজের লাইলা বিবি। নিউ মার্কেটে ইদের বাজার করতেই এসেছিলেন। কিন্তু ফিরতে বাসের জন্য আধ ঘণ্টার উপরে ঠায় দাঁড়িয়ে। বাসের দেখা নেই! মুখে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে বলছিলেন, ‘‘রোজায় আছি! আমিই বাড়ি ফিরে পরিবারের সবার ইফতারের ব্যবস্থা করব। জানি না, সব কিছু সময় মতো হবে কিনা!’’
ধর্মতলা এলাকায় ইদের বাজার মার খাচ্ছে বলে ব্যবসায়ীরাও মনমরা। সালোয়ার কামিজের পসরা সাজিয়ে বসা শেখ জিলানি বা জুতো বিক্রেতা মহম্মদ আরবাজ় বলছিলেন, ডামাডোলে বাজারের ভিড়ও অনেক কম। ভিক্টোরিয়া হাউসে সিইএসসি-র এক আধিকারিক বলছেন, রোজ সকালে পার্ক স্ট্রিটের দিক থেকে ঘুরপথে অফিস যেতে দেরি হচ্ছে। সন্ধ্যায় ডোরিনা ক্রসিংয়ের মুখে এক দম্পতি দিশাহারা, অ্যাপ-ক্যাব বুক করে ধৈর্যের পরীক্ষা। শুনেছেন, ধর্নার জন্য পুলিশ যেতে দিচ্ছে না।
পুলিশের অবশ্য দাবি, নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মেনে যান চলাচল মসৃণই রয়েছে। তবে ভিড় আছে বলেই মঞ্চের দিকটা যান চলাচল বন্ধ। লালবাজারের এক পুলিশকর্তার কথায়, ‘‘ধর্না মঞ্চে দফায় দফায় মিছিল আসছে। মিছিল এলে ট্র্যাফিকের পথে একটু রদবদল তো হয়েই থাকে।’’