আরজি কর হাসপাতালে লিফ্টে আটকে মৃত্যু অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। — ফাইল চিত্র।
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের ট্রমা কেয়ার সেন্টারের লিফ্টে আটকে দমদমের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তকারীদের মাথায় ঘুরছে অনেক প্রশ্ন। ঘটনার সময় লিফ্টম্যানেরা কোথায় ছিলেন? নিরাপত্তারক্ষীদের ভূমিকা কী ছিল? কার গাফিলতির জেরে এই দুর্ঘটনা ঘটল, তা খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে পুলিশ। দুর্ঘটনার সময় কে কোথায় ছিলেন, তার রূপরেখা তৈরির চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানার চেষ্টা করছে যাবতীয় অধরা প্রশ্নের উত্তর। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনার সময় লিফ্টম্যান বা উপস্থিত সকলে চিৎকার শুনতে পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই চিৎকার কোথা থেকে আসছিল, তা ঠাহর করা তাৎক্ষণিক ভাবে সম্ভব হয়নি। অরূপ লিফ্টে আটকে ছিলেন, না কি নীচে পড়ে গিয়েছিলেন— তা জানার চেষ্টা করেছিলেন লিফ্টম্যানেরা!
ট্রমা কেয়ারের দুর্ঘটনায় পড়া সেই লিফ্টের পাশের লিফ্টে রয়েছেন লিফ্টম্যান। ছবি: সারমিন বেগম।
পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতদের জেরা করে জানা গিয়েছে, এক জন লিফ্টম্যান চিৎকার শুনে অন্য লিফ্টে চেপে বেসমেন্টেও গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই লিফ্টের সামনেও লোহার গ্রিলের দরজা ছিল। সেই দরজা তালাবন্ধ থাকার কারণে বার হতে পারেননি ওই লিফ্টম্যান। যে লিফ্টে আটকা পড়ে অরূপের মৃত্যু হয়, বেসমেন্টে তার সামনেও ছিল লোহার গ্রিলের দরজা। জানা গিয়েছে, ট্রমা কেয়ারের বেসমেন্টে থাকে অনেক মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি। তাই বেসমেন্টে লিফ্টের সামনে লোহার গ্রিলের দরজার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই দরজাগুলির তালার চাবি থাকে নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে।
ট্রমা কেয়ারের সেই লিফ্টের পাশ থেকে বেসমেন্টে যাওয়ার সিঁড়িতে তালা দেওয়া। সেই তালা জং ধরে গিয়েছে। ছবি: সারমিন বেগম।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, দুর্ঘটনার সময় কোনও এক জন ট্রমা কেয়ারের ছাদেও ছুটেছিলেন। সেই ছাদে রয়েছে ‘মেশিন রুম’। সেই ঘরে রয়েছে লিফ্টের ‘কন্ট্রোল প্যানেল’। লিফ্টে যান্ত্রিক কোনও ত্রুটি হলে সেখান লিফ্ট নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দুর্ঘটনার দিন ওই ‘মেশিন রুম’-এ গিয়েছিলেন এক জন। চেষ্টা করেছিলেন লিফ্টটি চালানোর! প্রশ্ন উঠছে, সেই সময় কি কোনও ভাবে চালু হয়েছিল লিফ্টটি? আরও এক সূত্রে জানা গিয়েছে, পাওয়ার অফও করা হয়েছিল। তবে তার পরেও আটকে থাকা অরূপকে বার করা সম্ভব হয়নি। লিফ্টের ত্রুটি ধরা পড়লে, তখন নিরাপত্তার নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মানতে হয়। লিফ্টম্যানদের বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতির জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে রাখতে হয়। সেই নিয়মবিধি মানা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে নানাবিধ প্রশ্ন প্রকাশ্যে আসছে। গাফিলতির অভিযোগ যেমন উঠছে, তেমনই লিফ্টের রক্ষণাবেক্ষণ বা হাসপাতালের পরিকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। হাসপাতালের লিফ্টগুলির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে নির্দিষ্ট একটি সংস্থা। দুর্ঘটনার পর লিফ্টটি নির্দিষ্ট ‘টেস্ট টুল’ দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। এ ছাড়াও, নথি ঘেঁটে জানা গিয়েছে, চলতি মাসের শুরুতেই দুর্ঘটনার কবলে পড়া লিফ্টির স্বাস্থ্যপরীক্ষা করা হয়েছিল। পুলিশ সূত্রে খবর, এখনও পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত কোনও গাফিলতির বিষয় প্রকাশ্যে আসেনি। অভিযোগ, লিফ্টটি এক বার উপরে উঠে নিজে থেকেই নীচে নামতে শুরু করে। নামতে নামতে পৌঁছে যায় অন্ধকার বেসমেন্টে। প্রশ্ন উঠছে, যদি গাফিলতি না-থাকে তবে কেন আচমকা লিফ্টটি উপরে উঠে নীচে নামতে শুরু করল? দুর্ঘটনার সময় ডিউটি থাকা লিফ্টম্যানেরা কে কোথায় ছিলেন, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
ইমার্জেন্সি বিল্ডিংয়ের লিফ্টে কখনও লিফ্টম্যান থাকছেন, আবার কখনও থাকছেন না। ছবি: সারমিন বেগম।
শুক্রবারের দুর্ঘটনার পর থেকে বন্ধ ছিল আরজি করের আউটডোর। সোমবার আউটডোর খুলেছে। কিন্তু লিফ্টের মধ্যে লিফ্টম্যানকে দেখতে পাওয়া যায়নি। তবে বাইরে এক জন বসে আছেন অবশ্য। তিনি বললেন, ‘‘আমি ভিতরে ঢুকলে রোগীর ট্রলি ঢোকাব কী করে। আর লিফ্ট আটকে গেলে ভিতর থেকে খুলতে পারব না। বাইরে থেকেই ব্যবস্থা করতে হবে।’’