Taratala Godown Roof Collapse

৫ মৃত্যু, আটক ৩! তারাতলায় লোহার বিমের নীচে শ্রমিকেরা বন্দি এখনও, চলছে উদ্ধারকাজ, শহরের সব নির্মাণে স্থগিতাদেশ

যে জমিতে গুদাম তৈরির কাজ চলছিল, সেটি বন্দর কর্তৃপক্ষের। ২০২৪ সালের অগস্টে তাঁরা বেহরা ব্রাদার্স নামের একটি সংস্থাকে জমিটি ৩০ বছরের জন্য লিজ় দিয়েছিলেন। তাঁদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ ২৩:১৪
তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে বিপর্যয়, উদ্ধারকাজে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। বুধবার রাতে।

তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে বিপর্যয়, উদ্ধারকাজে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী। বুধবার রাতে। ছবি: সারমিন বেগম।

তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ ভেঙে পড়ে এখনও পর্যন্ত পাঁচ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে আরও ২০ জনের। তাঁদের মধ্যে অন্তত দু’জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ ছাড়া, ঘটনাস্থলে অনেকে এখনও আটকে রয়েছেন। উদ্ধারকাজ চলছে। কলকাতা পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, যে জমিতে গুদাম তৈরির কাজ চলছিল, সেটি বন্দর কর্তৃপক্ষের। ২০২৪ সালের অগস্টে তাঁরা বেহরা ব্রাদার্স নামের একটি সংস্থাকে জমিটি ৩০ বছরের জন্য লিজ় দিয়েছিলেন। এই সংস্থা মূলত চা-পাতা গুদামজাত এবং প্যাকেজিংয়ের কাজ করে। বেহরা ব্রাদার্সের মালিকের নাম শম্ভুনাথ বেহরা। জমি লিজ় নিয়ে তিনিই নির্মাণের কাজ করাচ্ছিলেন।

Advertisement

বুধবার বেলা ১২টা ৭ মিনিটে তারাতলায় আচমকাই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে নির্মীয়মাণ গুদামের ছাদ। লোহার কাঠামো, কংক্রিটের স্তূপের নীচে চাপা পড়ে যান অন্তত ৪০ জন শ্রমিক। পুলিশ, দমকলের সঙ্গে রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যেরা উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছিলেন। পরে রাজ্য সরকারের অনুরোধে ভারতীয় সেনা এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী তাতে যোগ দেয়। একাধিক ক্রেন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ঘটনাস্থলে। হাইড্রোলিক ক্রেন দিয়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ শুরু হয়। ভারী ভারী লোহার বিম ওই ক্রেনের সাহায্যে তুলে নীচে আটকে থাকা ব্যক্তিদের বার করার চেষ্টা চলেছে। এ ছাড়া, বিভিন্ন দিক থেকে গ্যাস কাটার দিয়ে লোহা কেটে ফাঁকা অংশ তৈরি করে উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়েছে। কাউকে কাউকে সেখান দিয়ে বার করা গিয়েছে। লোহার বিমের গায়ে লেগে ছিল রক্ত ও মাংসপিণ্ড। বুধবার রাত পর্যন্ত খবর, তারাতলার ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। গুদামের সুপারভাইজ়ার-সহ তিন জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।

চলছে উদ্ধারকাজ।

চলছে উদ্ধারকাজ। —নিজস্ব চিত্র।

কোথায় গলদ

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর মুখ্যমন্ত্রীই জানিয়ে দেন, প্রাথমিক ভাবে ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলে গুদামের নকশায় ত্রুটির কথা জানতে পেরেছেন তিনি। বৃষ্টির কারণে মাটি বসে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেনি বলেই তাঁর মত। শুভেন্দু বলেন, ‘‘আমি ইঞ্জিনিয়ার নই। তবে ঘটনাস্থল দেখে আমার মনে হয়েছে, বৃষ্টিতে মাটি বসে এই দুর্ঘটনা নয়। তাহলে লোহার বিম এই ভাবে বেঁকে যেত না। লোহার কাঠামোর নাট খুলে স্লিপ করে বেরিয়ে গিয়েছে।’’ ইমারত বিশেষজ্ঞ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, নির্মাণের নকশা ‘ভয়ঙ্কর রকম ভুল’ ছিল। না বলে এ ভাবে কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে না। গত ১৭ জানুয়ারি এই গুদামের নকশায় অনুমোদন দেয় পুরসভা। বন্দর কর্তৃপক্ষও নির্মাণে আপত্তি করেননি। কেন ত্রুটিপূর্ণ নকশায় পুরসভা সবুজসঙ্কেত দিয়ে দিল? প্রশ্ন উঠেছে।

ভেঙে পড়া গুদামের ছাদ।

ভেঙে পড়া গুদামের ছাদ। —নিজস্ব চিত্র।

নির্মাণে স্থগিতাদেশ

তারাতলার ঘটনার পর কলকাতা পুরসভার এলাকায় সমস্ত নির্মাণকাজে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন শুভেন্দু। জানিয়েছেন, কলকাতা পুর এলাকায় সমস্ত নির্মাণকাজ ৩১ জুলাই পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তৃণমূল জমানায় যে সমস্ত নির্মাণের নকশায় (প্ল্যানে) অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেগুলি আগে খতিয়ে দেখা হবে। খতিয়ে দেখার কাজ করবে একটি বিশেষ প্রতিনিধিদল। তাতে থাকবেন রাজ্যের পূর্ত, অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতর, দমকল, কলকাতা পুলিশ এবং কলকাতা পুরসভার আধিকারিকেরা। তাঁরা বাড়ির নকশা খতিয়ে দেখে রিপোর্ট দেবেন। যাঁরা নিয়ম মেনে কাজ করছেন, তাঁরা ১ অগস্ট থেকে আবার কাজ শুরু করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে জরুরি পরিষেবাকে এই স্থগিতাদেশের বাইরে রাখা হচ্ছে। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘কলকাতার পুর এলাকায় আগের আমলে অনুমোদিত নির্মীয়মাণ বাড়ি বা বহুতল যত আছে, বিশেষ করে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত বা যেখানে জলাশয় বুজিয়ে নির্মাণকাজ হচ্ছে, সেগুলির কাজ ৩১ জুলাই অবধি বন্ধ থাকবে। প্রত্যেকটার অডিট হবে।” তারাতলার ঘটনায় সরকার কী কী আইনি পদক্ষেপ করব‌ে, হতাহতদের পরিবার কতটা ক্ষতিপূরণ পাবে, তা বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার সময় বিধানসভায় জানাবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দ্রুত উদ্ধারকাজে নামার জন্য দমকল, অসামরিক প্রতিরক্ষা দফতর এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলাকারী দল (এনডিআরএফ)-কে ধন্যবাদ জানান শুভেন্দু।

উদ্ধারকাজের মুহূর্ত।

উদ্ধারকাজের মুহূর্ত। —নিজস্ব চিত্র।

নজরে ঠিকাদার আসগর

তারাতলার ঘটনায় উঠে এসেছে জনৈক ঠিকাদার আসগরের নাম। অভিযোগ, তাঁর ভূমিকা খতিয়ে দেখতে এবং তারাতলার এই নির্মাণ নিয়ে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আগেই সক্রিয় হয়েছিল বামেরা। সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম জানান, এই নির্মাণে আইনের তোয়াক্কা যে করা হয়নি, তা জানিয়ে গত ১১ জুন সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন বন্দর কর্মী ইউনিয়নের তরফে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিল। একটি দু’পাতার চিঠিও প্রকাশ্যে আনা হয়েছে সিপিএমের তরফে। তাতে বলা হয়েছে, তারাতলায় বন্দরের জমিতে আসগর যে যে নির্মাণ তৈরি করছেন, তাতে শ্রমিক সুরক্ষার কোনও নিয়মই মানা হচ্ছে না। সেলিমের কথায়, ‘‘নাজিরাবাদের গুদামে তৃণমূলের শাসনে শ্রমিকেরা পুড়ে মারা গিয়েছিলেন। এই সরকারের সময়ে জানানো সত্ত্বেও কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি।’’

আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। —নিজস্ব চিত্র।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

বেলা ১২টা ৭ মিনিটে আচমকাই প্রবল শব্দে কেঁপে ওঠে তারাতলার ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোড। কলকাতা বন্দর এলাকার এই রাস্তার দু’ধারে সার সার গুদাম। তারই একটিতে কর্মরত ছিলেন উজ্জ্বল কুমার। বুধবারের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘‘ভূমিকম্পের মতো প্রবল একটা ঝাঁকুনি হল। তার পরেই বিস্ফোরণের মতো বিকট আওয়াজ।’’ ছুটে গিয়ে তাঁরা দেখেন, গোটা গুদামটাই ভেঙে পড়েছে। আশপাশের গুদামে কর্মরত উজ্জ্বলের মতো শ্রমিকেরা কেউ কেউ নিজেরাই উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। কেউ কেউ পুলিশ ও দমকলকে খবর দেন। স্থানীয় সূত্রে খবর, বেহরা ব্রাদার্সের একটি দফতর রয়েছে মুন্সিগঞ্জে। মালিক থাকেন নিউ আলিপুরে। ঠিকাদার আসগর স্থানীয় কাউন্সিলর আনোয়ার খানের ঘনিষ্ঠ বলেও দাবি করেছেন স্থানীয়েরা।

ঘটনাস্থলে মেডিক্য়াল টিম।

ঘটনাস্থলে মেডিক্য়াল টিম। —নিজস্ব চিত্র।

দুলছিল গুদামের ছাদ

তারাতলার গুদামটির ছাদ সকাল থেকেই দুলছিল বলে স্থানীয়েরা কেউ কেউ দাবি করেছেন। সূত্রের দাবি, গুদাম তৈরির জন্য লোহার কাঠামোর উপর কংক্রিটের স্তর চাপানো হয়েছিল। স্থানীয়েরা অনেকেই জানাচ্ছেন, সকাল থেকে কাঠামোটি নড়ছিল। তা পরখ করতে গিয়েছিলেন কয়েক জন শ্রমিক। তখনই আচমকা ছাদ ধসে পড়ে। তাঁরা সরে যাওয়ার সুযোগও পাননি। গুদামের ভিতরে শ্রমিকদের অনেকের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাই একসঙ্গে অনেকে চাপা পড়ে যান। ছিলেন মহিলারাও।

ভেঙে পড়া ছাদ।

ভেঙে পড়া ছাদ। —নিজস্ব চিত্র।

Advertisement
আরও পড়ুন