পার্ক সার্কাস ময়দানে জমায়েত। —নিজস্ব চিত্র।
পার্ক সার্কাসের ধর্না মঞ্চের প্রতিবাদীরা অনেকেই ইদে কাছের, দূরের জেলায় বাড়ি গিয়েছেন। তা বলে প্রতিবাদ স্তব্ধ হল না! এসআইআর-বিভ্রাটের প্রতিবাদে ১৮ দিন ধরে চলা ধর্না-অবস্থানে কয়েক জন অ-মুসলিম সহযোগী শুক্রবার, চাঁদ-রাতে মাঠে ছিলেন। শনিবার ইদের নমাজ শেষে এলাকার ফরিদুল, জাহিদরা তাঁদের জন্য ঘরোয়া সিমুই, টিকিয়া, ফিরনি নিয়ে এলেন। ‘হ্যাপি ইদ ২০২৬, নো এসআইআর’ লেখা কেক নিয়েও কে কোত্থেকে হাজির! ইদের মিষ্টিমুখ অন্য মাত্রা পেল পার্ক সার্কাসেরময়দানে।
মালদহের চাঁচলে বা বর্ধমানের মেমারির কেন্দ্রীয় ইদ্গাহের জমায়েতেও এসআইআর-আঁচ সুস্পষ্ট। চাঁচলে নমাজ শেষে প্রচারপত্র বিলি হয়েছে। কোথাও বা পাটভাঙা কুর্তা, নতুন টুপিধারীদের মিছিলে স্লোগান, ‘দলদাস কমিশন / এই এসআইআর প্রহসন / মানছি না, মানব না’ কিংবা ‘সবাই মিলে বাঁধজোট / আগে ভোটার, পরে ভোট’! ইদ্গাহে বেলুনওয়ালার কাছে সদ্য কেনা বেলুন হাতে ছোট ছেলেমেয়েরাও চিকন স্বরে স্লোগানে গলা মিলিয়েছে।
উচ্চ মাধ্যমিক সংসদের অধীনে মেমারি হাইস্কুলের সদ্যঅবসরপ্রাপ্ত মাস্টারমশাই কাজি ইয়াসিন সুবিশাল জমায়েতকে প্রাক্-নমাজ বক্তৃতায় ধর্মীয় অধিকারের মতো রাষ্ট্রীয় জীবনের অধিকারের কথা বলছিলেন। তিনি বললেন, “ধর্মের কাছ থেকে পাওয়ানৈতিকতার অধিকারের মতো রাষ্ট্রও আমাদের মত প্রকাশেরঅধিকার, ভোটাধিকার দিয়েছে। নাম বাদ বা বিবেচনার কথা বলে সেই ভোটাধিকার কাড়ার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা সকলের কর্তব্য। হিটলারের জমানার মতো ধাপে ধাপে কিছু লোককে নিশানা করা হচ্ছে। কিন্তু অনেকেই নিরাপদ নন।” অন্য সম্প্রদায়ের পাশে মুসলিম পরিবারগুলির কার্যত ঘরে ঘরেই কারও না কারও অন্যায় ভাবে ভোটাধিকার হারানোর শঙ্কা। মুর্শিদাবাদের লালবাগের তরুণ সাজিদুর রহমান বিষণ্ণ গলায় বললেন, ‘‘নাম অনিশ্চিত বলে মা কান্নাকাটি করছেন।’’
পার্ক সার্কাসের মাঠে মানবাধিকার সংগঠনের কর্মী, যাদবপুরেরপ্রাক্তনী, গবেষক ঝিলম রায় বলছিলেন, ‘‘এত বন্ধুর ভোটাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তায় ইদের খুশি কমে গিয়েছে।’’ সাপ্লিমেন্টারি তালিকা বেরোনো পর্যন্ত অনেকেই দুশ্চিন্তায় রাত জাগছেন!মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি ব্লকে ফরিদপুরের মাঠে পাঁচ-ছ’টি গ্রামের হাজারপনেরো বাসিন্দা নমাজে আসেন। ‘অল বেঙ্গল ইমাম মুয়াজ্জিন অ্যাসোসিয়েশন’-এর রাজ্য সম্পাদক নিজামুদ্দিন বিশ্বাস এসআইআর নিয়ে জনতার উৎকণ্ঠা প্রশমনের চেষ্টা করলেন। বললেন, “রমজানের উপবাসের ধৈর্যের ব্রত রক্ষারমতো শান্তিপূর্ণ ভাবে আইন মেনে প্রতিবাদে থাকুন।”
কলকাতায় সকালের বৃষ্টিতে নমাজের ছন্দপতন হয়েছিল একটু। নিউ টাউনে সেকুলার ফোরামের জমায়েতে পুরুষ ও মহিলারা পাশাপাশি ঘেরাটোপে নমাজ পড়লেন। জনৈক উদ্যোক্তা আব্দুল গফফার বললেন,“এখানে একটাও মসজিদ নেই। এ বারও পাঁচ কিলোমিটার দূরে গিয়ে রমজানের তারাবির নমাজ পড়তে হল। রাজ্য সরকার জৈন, মতুয়া সকলের ধর্ম, সংস্কৃতি চর্চায় জমিদিল। ভোটের আগে আমাদের অনুরোধেরই নিষ্পত্তি হল না।”
উত্তর থেকে দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টিতে জমির আলু নষ্ট হওয়া থেকে চেনা, অচেনা দুঃখও ভাগবসিয়েছে ইদের খুশিতে। পার্ক সার্কাস থেকে মুর্শিদাবাদ, মালদহে ইদের মেলার জৌলুসেও তার ছাপ। প্রতিবাদ ও সংহতির ইদউপলক্ষে সন্ধ্যায় পার্ক সার্কাসে জনগণমন দলের পথনাটক হল। ইদ উপলক্ষে কোথাও প্রিয়জনআসার আনন্দ, কেউ ট্রেনের অভাবে আসতে পারেননি। মেমারির ইয়াসিনের ভাই বিলেতে, ভাইঝি মুম্বইয়ে চাকরিরতা। তাঁরা আবার ভোটের সময়ে আসবেন ঠিক করেছেন। ভোট ঘোষণাহওয়াতেও কেউ কেউ ইদের বদলে এক মাস বাদে ভোটে ছুটি নিয়ে আসবেন বলে ঠিক করেছেন।