Book Fair

র‌্যাম্পে গলদ, এ বারও সকলের জন্য সুগম হল না বইমেলা

কয়েকটি র‌্যাম্প চোখে পড়েছে বটে, কিন্তু বইমেলার ছবিটা পাল্টায়নি। প্রতিবন্ধী বা হুইলচেয়ার আসীনদের ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার অপর্যাপ্ত। বড় দোকানগুলিতে র‌্যাম্প থাকলেও কোল্যাপসিবল গেটে ঠেকে যেতে হচ্ছে।

ঋজু বসু
শেষ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৪৭
বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে নেই কোনও র‌্যাম্প।

বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়নে নেই কোনও র‌্যাম্প। — নিজস্ব চিত্র।

কোথায় সমস্যা? কী করণীয়? বার বার এবং বছর-বছর তা চিহ্নিত করা হয়েছে। বহু বার বিষয়গুলি খেয়াল রাখার আর্জি জানিয়েও নিট ফল লবডঙ্কা। তথাকথিত আন্তর্জাতিক তকমাধারী কলকাতা বইমেলা আছে সেই বইমেলাতেই। চলাফেরায় সমস্যা যাঁদের, সেই বিশেষ ভাবে সক্ষম বা অশক্ত, প্রবীণ, কারও জন্যই বইমেলা সফর মসৃণ দূরে থাক, সুগমও বলা যাবে না। এই ৪৯তম বছরেও প্রতিবন্ধী পাঠকেরা ও তাঁদের সুহৃদবর্গের চরম ক্ষোভের মুখে পড়েছে বইমেলা।

কয়েকটি র‌্যাম্প চোখে পড়েছে বটে, কিন্তু বইমেলার ছবিটা পাল্টায়নি। প্রতিবন্ধী বা হুইলচেয়ার আসীনদের ব্যবহারযোগ্য শৌচাগার অপর্যাপ্ত। বড় দোকানগুলিতে র‌্যাম্প থাকলেও কোল্যাপসিবল গেটে ঠেকে যেতে হচ্ছে। ছোট স্টলগুলিতে হুইলচেয়ার নিয়ে ঘোরাই মুশকিল। লিটল ম্যাগাজ়িন প্যাভিলিয়ন তল্লাট প্রশস্ত হলেও তা উঠতে হচ্ছে তিন-চার ধাপ সিঁড়ি ভেঙে। অর্থাৎ হুইলচেয়ারে আসীন দুর্ভাগারা সেখানে কার্যত ব্রাত্য।

সাম্প্রতিক অতীতেও পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের উদ্যোগে বইমেলায় মসৃণ গতিবিধির দিকটা জরিপ (অ্যাকসেসিবিলিটি অডিট) করা হয়। তাতে এই সমস্যার দিকগুলি উঠে আসে। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের সংগঠনের তরফে কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় কর্তৃপক্ষের। এর ফলে উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসকের দফতর থেকেও বইমেলা কর্তৃপক্ষকে খুঁটিয়ে জানানো হয়, কী ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি।

পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের সভাপতি সুধাংশুশেখর দে বলেন, ‘‘একেবারে ছোট স্টলে র‌্যাম্প করতে পারিনি। বাকিগুলিতে র‌্যাম্প রয়েছে। তবে কোল্যাপসিবল গেটের সমস্যাটা বুঝিনি।’’ হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের সংগঠনের প্রেসিডেন্ট, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের শিক্ষিকা প্রিয়াঙ্কা দে বলছেন, ‘‘কোল্যাপসিবল গেটের সমস্যা নিয়ে আমরা আগে বহু বার বইমেলা কর্তৃপক্ষকে সজাগ করেছি। কিন্তু ওঁরা শুনেও কিছু শোনেন না।’’

র‌্যাম্প থাকলেও স্টলের কোল্যাপসিবল গেটে ঠেকে যাচ্ছে হুইলচেয়ার। আবার কোনও কোনও স্টলে র‌্যাম্পের পাটাতন নড়বড় করছে। খাড়াই ঢাল বেয়ে উঠতে গিয়ে অনেকেই ধরাশায়ী হচ্ছেন। ৭ নম্বর গেটের দিকে মাঝারি মাপের কয়েকটি স্টল এই পরিস্থিতিতে কাঠের বাটাম এঁটে র‌্যাম্পের পাটাতনে আটকে দিয়েছে। তাতেও হুইলচেয়ারে ওঠা অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

তিন বছর আগে জেলা প্রশাসন মারফত গিল্ডকে জানানো হয়, প্রতিবন্ধীদের উপযোগী শৌচাগার চাই। স্টলে কোল্যাপসিবল ফটক সরাতে হবে। গেটে গেটে হুইলচেয়ার রেখে ওয়েবসাইটে, ব্যানারে লিখতে হবে। ব্যাটারিচালিত গাড়ি রাখতে হবে। প্রতিবন্ধীদের জন্য সুগম পার্কিং লট চাই। ৮০ শতাংশ সেরিব্রাল পলসির শিকার প্রিয়ঙ্কা বলছেন, একটি সুগম শৌচাগার ছাড়া, ইতিবাচক প্রায় কিছু নেই বইমেলায়। পশ্চিমবঙ্গ প্যাভিলিয়নটিতে অবশ্য র‌্যাম্প বেয়ে মসৃণ ওঠা যাচ্ছে।

মনটা খারাপই হয়েছে হুইলচেয়ার নির্ভর, সদ্য স্নাতক তরুণী মালিশা দত্তের। বইমেলার মূল সভাঘরে তাঁর প্রিয় সাহিত্যিক অমিতাভ ঘোষকে দেখলেও বইয়ে সই করাতে হুইলচেয়ার টেনে সাহিত্যিকদের নির্দিষ্ট পরিসর অথর্স লাউঞ্জে ঢুকতে পারেননি। মালিশার মা গিয়ে সই নিয়ে এলেন। বছর দুয়েক আগে মেরুদণ্ডের রোগে চলচ্ছক্তি হারিয়েছেন ওই তরুণী। মালিশার কথায়, ‘‘বইমেলায় গিয়ে পদে-পদেই বাধা পেতে হয়েছে। আগে ইংরেজি বইগুলি আলাদা হলের মধ্যে থাকত। এ বার সাকুল্যে চারটি দোকানে র‌্যাম্প বেয়ে বহু কষ্টে ঢুকেছি। কিন্তু একার চেষ্টা নয়। ভিতরে ঢুকেও নড়াচড়ার জো ছিল না।’’

ডিজ়এবিলিটি অ্যাক্টিভিস্টস ফোরামের তরফে সমাজকর্মী কুহু দাসও বলেন, ‘‘ঠিকঠাক র‌্যাম্পের অভাব ছাড়াও দৃষ্টিহীনদের ব্রেলে নির্দেশিকা বা সভাঘরের অনুষ্ঠানে বধিরদের বোঝার সাঙ্কেতিক ভাষা প্রয়োগ— অনেক কিছুর অভাব। ২০১৬ সালের প্রতিবন্ধী আইন বা ভারতের স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক সনদ— মেনে চলার চেষ্টাই নেই বইমেলা কর্তৃপক্ষের।’’

আরও পড়ুন