সুপ্রিম কোর্টে শুরু হল আই-প্যাক মামলার শুনানি। — ফাইল চিত্র।
রাজ্যের আইনজীবী মেনকা বলেন, ‘‘এখানে কেন্দ্র যা করতে চাইছে, তা হল প্রতিষ্ঠিত ধারণাটাকেই বদলে দেওয়া। এটা শুধু আমাদের প্রায় ৭৫ বছরের সাংবিধানিক আইনগত বোঝাপড়ার বিরোধী নয়, বরং সারা বিশ্বে স্বীকৃত নীতিরও বিরুদ্ধে, বিশেষ করে সেই সব দেশগুলিতে, যেখানে ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। নাগরিকদের সব সময় রাষ্ট্রের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। সেই কারণেই ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে।’’
বিরতির পরে দুপুর ২টো আবার শুনানি।
মেনকার সওয়াল, ‘‘দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পরে বিশ্বজুড়ে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে প্রত্যেক দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রাষ্ট্র দ্বারা লঙ্ঘিত বা পদদলিত করা যাবে না। অর্থাৎ, এই অধিকারগুলোর মূল উদ্দেশ্য হল নাগরিকদের রাষ্ট্রের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া।’’
মেনকা বলেন, ‘‘৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য তৈরি, রাষ্ট্রের নিজের জন্য নয়।’’ মেনকা আরও বলেন, ‘‘কেন্দ্র এবং রাজ্যের বিরোধ হলে ১৩১ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করতে হবে।৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ নয়। তা ছাড়া এই মামলায় বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন রয়েছে, তাই সাংবিধানিক বেঞ্চে যাওয়া দরকার।’’
মেনকা সওয়াল করে বলেন, ‘‘সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য। ইডি অফিসারেরা যদি অফিসার হিসেবে ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করেন, তা হলে সরকার নিজেই নিজের বিরুদ্ধে এই ধারা ব্যবহার করছে। এর ফলে ওই অনুচ্ছেদের আসল উদ্দেশ্য নষ্ট হবে। নাগরিকদের জন্য এই অধিকার দুর্বল হয়ে যাবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘সরকার নিজেই যদি ভিক্টিম সেজে এই অধিকার ব্যবহার করে তবে তা হবে সংবিধানের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।’’
কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার সওয়াল, ‘‘এটা থেকে স্পষ্ট যে ঘটনাটি তাদের পক্ষে যাচ্ছে না। তাই অতীতের বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে মামলা খারিজ করতে চাইছে। তারা ওই দিনের ঘটনাটি নিয়ে কিছু বলছেন না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘স্বাধীনতার আগের বিষয়ে সওয়াল করবেন, বলছেন। অথচ ঘটনাটি নিয়ে কোনও সওয়াল নেই।’’
মামলাটি গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয় বলে সওয়াল করেন আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। তাঁর বক্তব্য, ‘‘১৯৪৮ সালে সংবিধান প্রণয়ন সভার বিতর্ক দিয়ে সওয়াল শুরু করতে চাই।’’
সিঙ্ঘভির সওয়াল, ‘‘তদন্তের সময় একজন ইডি অফিসার হিসাবে তিনি এমন কোনও আলাদা অধিকার দাবি করতে পারেন না, যা তাঁর দফতরের নিজেরই নেই। ইডি নিজে রাষ্ট্রের শক্তিশালী সংস্থা। তাই ইডি বলতে পারে না, তার রাষ্ট্রের সুরক্ষা চাই। ইডির মতো সংস্থা কোনও মৌলিক অধিকারের ভিত্তিতে আদালতের কাছে সিবিআই তদন্তের অনুরোধ করলে এবং আদালত তাতে অনুমতি দিলে সেটা অত্যন্ত অবাস্তব বিষয় হবে।’’
সিঙ্ঘভির সওয়াল, ‘‘ইডির তদন্ত করার কোনও মৌলিক অধিকার নেই। আদালতও কখনও বলেনি এটা তাদের মৌলিক অধিকার। এমনকি, অফিসারদেরও তদন্ত করার কোনও মৌলিক অধিকার নেই। ইডির শুধু আইনের দেওয়া ক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু অধিকার নয়।’’
সিঙ্ঘভি সওয়াল করে জানান, ইডি অফিসারেরা শুধু নিজের দফতরের হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪, ২১ এবং ২২ কোনওটি লঙ্ঘনই দাঁড়ায় না।
সিঙ্ঘভি শীর্ষ আদালতে বলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসাবে ইডির সেই ক্ষমতা নেই। আবার অন্য একটি পিটিশনে ইডির একজন অফিসার। ফলে আপনি যা সরাসরি করতে পারেন না, তা ঘুরপথেও করতে পারবেন না। ইডির অফিসারের নিজস্ব কোনও অস্তিত্ব নেই, কোনও পরিচয় নেই। তিনি শুধু আইনের অধীনে দায়িত্ব পালনকারী এক জন ব্যক্তি মাত্র। তিনি কেবলমাত্র আইনি দায়িত্ব পালন করছেন।’’
অভিষেক: কিছু অধিকার শুধু ব্যক্তির জন্য, কোনও কোম্পানি বা সংস্থার জন্য নয়।
সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যবসা করার স্বাধীনতা এ সব শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নাগরিকদের জন্য, কোম্পানির জন্য নয়।
সুপ্রিম কোর্টে বুধবার আইপ্যাক মামলার শুনানি শুরু হল। রাজ্য পুলিশের তৎকালীন ডিজির হয়ে সওয়াল করছেন আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধানের ৩২ নম্বর ধারায় (সাংবিধানিক প্রতিবিধান সংক্রান্ত মৌলিক অধিকার) অভিযোগ এনেছিল ইডি। রাজ্যের বিরুদ্ধে ‘বেআইনি হস্তক্ষেপের’ অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয় তারা। হলফনামায় রাজ্য পাল্টা দাবি করে, আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং দফতরে ইডির অভিযান সংবিধানের ২১ নম্বর ধারার (জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার) পরিপন্থী।
গত ৮ জানুয়ারি কয়লা পাচার সংক্রান্ত একটি মামলায় আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং দফতরে হানা দিয়েছিল ইডি। ওই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তল্লাশি অভিযান চলাকালীন সেখানে উপস্থিত হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তদন্তে বাধা এবং নথি কেড়ে নেওয়ার অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করে ইডি। ইডির বিরুদ্ধে আদালতে যায় রাজ্যও। গত ১৫ জানুয়ারির শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, ইডির বিরুদ্ধে মামলাকারী পক্ষকে হলফনামা দিতে হবে।