কলকাতা হাই কোর্টে আইপ্যাক সংক্রান্ত জোড়া মামলার শুনানি। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
সল্টলেক সেক্টর ফাইভে রাজ্য সরকার এবং তৃণমূলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের দফতর এবং লাউডন স্ট্রিটে সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে বেআইনি কয়লা পাচার মামলায় গত ৮ জানুয়ারি তল্লাশি অভিযান চালিয়েছিল ইডি। তল্লাশি চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ঘটনাস্থলে যান এবং একাধিক নথিপত্র বার করে নিয়ে যান। এই ঘটনায় ইডি এবং তৃণমূল পৃথক ভাবে কলকাতা হাই কোর্টে মামলা করেছিল। ইডির বক্তব্য ছিল, সাংবিধানিক ক্ষমতায় অপব্যবহার করে মুখ্যমন্ত্রী নথি কেড়ে নিয়ে গিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে করা মামলায় তৃণমূলের বক্তব্য ছিল, ভোটের আগে ইডির অভিযান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাদের দলের সংবেদনশীল নথি, নির্বাচনী কৌশল চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে গত শুক্রবার জোড়া মামলার শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদালতকক্ষে বিশৃঙ্খলার কারণে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত শুনানি মুলতুবি করে দেওয়া হয়। পরে ইডি এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে। বুধবার হাই কোর্টে ফের মামলা দু’টির শুনানি ছিল। ইডির আইনজীবী দাবি করেন, তৃণমূলের করা মামলাটির কোনও গ্রহণযোগ্যতা নেই। যিনি হলফনামা দিয়েছেন, তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মামলায় যুক্ত করা উচিত বলেও জানান ইডির আইনজীবী। তাঁর সওয়াল, নির্বাচনের সঙ্গে তল্লাশি অভিযানের কোনও সম্পর্ক নেই। ইডি কোনও নথি বাজেয়াপ্তই করেনি। বরং নথি বাজেয়াপ্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তৃণমূলের উচিত তাঁর বিরুদ্ধেই মামলা করা।
তৃণমূলের আইনজীবী পাল্টা জানান, কোনও নথি যে ইডি বাজেয়াপ্ত করেনি, এই বক্তব্য রেকর্ড করা প্রয়োজন। গত ছ’বছরে ইডি কোনও পদক্ষেপ না করে কেন ভোটের কয়েক মাস আগে তৎপর হয়ে উঠল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে আদালতে কিছু বলার আগে শিষ্টাচার মেনে চলা উচিত।
উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে বিচারপতি ঘোষ তৃণমূলের মামলাটির নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন। ইডি যে হেতু জানিয়েছে যে, তারা কিছু বাজেয়াপ্ত করেনি, তাই রাজ্যের শাসকদলের করা মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অন্য দিকে, ইডি এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে। সেখানে এই মামলার অগ্রগতি দেখে ফের হাই কোর্ট মামলাটি শুনবে বলে জানান বিচারপতি ঘোষ। আপাতত তাই কেন্দ্রীয় সংস্থার মামলা মুলতুবি।
আইপ্যাক নিয়ে ইডি যে মামলাটি করেছে, আপাতত তার শুনানি মুলতুবি করল কলকাতা হাই কোর্ট। বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে এই মামলার শুনানি হয়েছে বুধবার। যে হেতু আইপ্যাক নিয়ে ইডি সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে, সেখানে কী হয়, তা দেখার পর আবার হাই কোর্ট ইডির মামলা শুনবে। তত দিন কেন্দ্রীয় সংস্থার করা মামলা মুলতুবি থাকবে বলে জানিয়েছেন বিচারপতি ঘোষ।
আইপ্যাক নিয়ে তৃণমূলের করা মামলাটির নিষ্পত্তি করে দিল হাই কোর্ট। তৃণমূলের দাবি ছিল, ইডি তাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ, সংবেদনশীল নথি বাজেয়াপ্ত করেছে। কিন্তু বুধবার শুনানিতে ইডির আইনজীবী দাবি করেন, কেন্দ্রীয় সংস্থা কোনও নথি বাজেয়াপ্তই করেনি। তাই তৃণমূলের মামলাটির নিষ্পত্তি করা হল।
তৃণমূলের আইনজীবী পাল্টা বলেন, ইডি কোনও কিছু বাজেয়াপ্ত করেনি, এই অংশটি রেকর্ড করা দরকার। গত ছ’বছর ধরে ইডি কিছু করেনি। ভোটের কয়েক মাস আগে তারা এই ধরনের অভিযান শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর নামে কিছু বলার সময় শিষ্টাচার মেনে চলা উচিত, দাবি তৃণমূলের আইনজীবীর। তাঁর কথায়, ‘‘একজন মুখ্যমন্ত্রীর নামে বলছেন। তিনি কয়েক বারের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর নামে আদালতে বলার আগে কিছু শিষ্টাচার মেনে চলা উচিত।’’
ইডির আইনজীবী দাবি করেন, আইপ্যাক নিয়ে তৃণমূলের করা মামলাটির কোনও গ্রহণযোগ্যতাই নেই। মামলায় বলা হয়েছে, ইডি তথ্য বাজেয়াপ্ত করেছে। একে ‘মিথ্যা অভিযোগ’ বলে দাবি করেছে ইডি। তাদের আইনজীবীর দাবি, কেন্দ্রীয় সংস্থা কিছু বাজেয়াপ্ত করেনি। নথি বাজেয়াপ্ত করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই তৃণমূলের উচিত তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা। যদি তৃণমূল এমন আবেদন জানায়, তবে ইডি তাদের সমর্থন করবে, দাবি তাদের আইনজীবীর।
ইডির আইনজীবী দাবি করেন, তল্লাশি অভিযানের সময় কোনও সংবেদনশীল তথ্য বাজেয়াপ্ত করা হয়নি। তৃণমূলের তরফে এই সংক্রান্ত যে দাবি করা হয়েছে, তা ইডি উড়িয়ে দিয়েছে।
আইপ্যাক নিয়ে তৃণমূলের মামলাটি খারিজ করা হোক, আদালতে আবেদন জানাল ইডি। তাদের আইনজীবীর সওয়াল, তৃণমূলের হয়ে হলফনামা যিনি দিয়েছেন, তিনি ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। ফলে ওই তল্লাশি অভিযান সম্পর্কে তাঁর বিশেষ কিছু জানা নেই। কোন নথি নেওয়া হয়েছে, সেখানে কী হয়েছে, তা তাঁর জানার কথাই নয়। শুধুমাত্র কিছু তথ্য শুনে এই মামলার হলফনামা দেওয়া হয়েছে। তাই এই মামলা খারিজ করা হোক।
কেন্দ্রের আইনজীবী বলেন, ‘‘কারও তথ্য অন্য কারও কাছ থেকে উদ্ধার হলে, যার কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে, তার তো আদালতে আসা উচিত। তৃণমূলের ঠিকানা ৩০বি, হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন)।’’ এ ছাড়া, কোনও রাজনৈতিক দলের তথ্য ব্যক্তিবিশেষের কাছে রাখলে, এই মামলায় আইনি এবং মৌলিক অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কেন্দ্রের আইনজীবী।
হাই কোর্টের মামলার সওয়ালে কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করে, ইডির তল্লাশি অভিযানের সঙ্গে ভোটের কোনও সম্পর্ক নেই। কেন্দ্রের আইনজীবী বলেন, ‘‘তৃণমূলের মামলায় ২০২৬ সালের ভোটের কথা বলা হয়েছে। ভোটের আগে তথ্য নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এখনও তো ভোটের নির্ঘণ্টই প্রকাশিত হয়নি। তাহলে তো নির্বাচন কমিশনকেও মামলায় যুক্ত করতে হবে।’’ এ ছাড়া তিনি আরও বলেন, ‘‘মামলায় এসআইআরের কথা বলা হয়েছে। আইপ্যাক এসআইআর নিয়ে কাজ করছে। কোনও রাজনৈতিক দলের অফিসে তো যাওয়া হয়নি। তৃণমূলের মামলার ছত্রে ছত্রে ভোটের কথা বলা হয়েছে। এর সঙ্গে ভোটের কী সম্পর্ক?’’
ইডির আইনজীবী জানান, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নথি বাজেয়াপ্ত করেছেন। তাঁকে মামলায় যুক্ত করা না-হলে তৃণমূলের মামলা গ্রহণযোগ্যই হতে পারে না। তৃণমূলের হয়ে মামলাটি করেছেন শুভাশিস চক্রবর্তী। তাঁর মামলা করার যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ইডির আইনজীবী। তিনি আদৌ ঘটনাস্থলে ছিলেন কি না, প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
হাই কোর্টে আইপ্যাক মামলার শুনানির সরাসরি সম্প্রচার চলছে। যাঁরা চান, নির্দিষ্ট ইউটিউব লিঙ্কে গিয়ে তাঁরা এই শুনানি শুনতে পারছেন।
তৃণমূলের তরফে মামলা লড়ছেন আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। তিনি হাই কোর্টে শুনানির পক্ষেই সওয়াল করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমি আশ্চর্য যে ইডি নিজেদের মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তৃণমূল কোনও ক্যাভিয়েট দাখিল করেনি সুপ্রিম কোর্টে। ইডির এই দাবি সম্পূর্ণ ভুল। আমরা সুপ্রিম কোর্টের মামলায় যুক্ত নই।’’
কলকাতা হাই কোর্টে আইপ্যাক মামলা আপাতত মুলতুবি রাখা হোক, আবেদন জানিয়েছে ইডি। সুপ্রিম কোর্টে এই সংক্রান্ত মামলা দায়ের হয়েছে, সেই কারণ দেখিয়ে মামলা মুলতুবির আবেদন জানানো হল। ইডির আইনজীবী বলেন, ‘‘এক সপ্তাহের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হবে দু’টি মামলার। আপাতত এখানে মামলার শুনানি মুলতবি করা হোক। মামলা এখন না শুনলে আকাশ ভেঙে পড়বে না।’’
কলকাতা হাই কোর্টে আইপ্যাক-কাণ্ডের জোড়া মামলার শুনানি চলছে। দিল্লি থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে শুনানিতে রয়েছেন ইডির আইনজীবী এসভি রাজু।
কলকাতা হাই কোর্টে আইপ্যাক মামলার শুনানির সরাসরি সম্প্রচার হবে বুধবার। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এই মর্মে প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তি জারি করেন কলকাতা হাই কোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল। হাই কোর্টের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মামলাকারী এবং মামলায় যুক্ত পক্ষ ছাড়া আর যাঁরা শুনানি পর্যবেক্ষণ করতে চান, তাঁরা ভার্চুয়ালি অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং অফিসে ইডির তল্লাশি অভিযানের ঘটনায় কলকাতা হাই কোর্টে জোড়া জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। প্রথম মামলাটি করেছে তৃণমূল। তাদের বক্তব্য, ইডি বেআইনি ভাবে ওই তল্লাশি চালিয়েছে। ভোট সংক্রান্ত নথি এবং কৌশল চুরি করতেই ইডির ওই তল্লাশি। উল্টো দিকে, সরকারি কাজে বাধার অভিযোগ তুলে মামলা করেছে ইডি। ওই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য, কয়লা পাচার মামলার তথ্য ও নথি ‘চুরি’ করা হয়েছে। ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে।