বিধায়কদের জন্য প্রশিক্ষণ শিবিরে রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারপার্সন হরিবংশ নারায়ণ সিংহ ও লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার (ডান দিকে) সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিউ টাউনের কনভেনশন সেন্টারে। —নিজস্ব চিত্র।
বিধায়কদের ‘ভাল শ্রোতা’ হওয়ার বিষয়ে জোর দিলেন লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা থেকে শুরু করে কেন্দ্রের সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদ্যনির্বাচিত বিধায়কদের প্রশিক্ষণ শিবিরে পরিষদীয় রীতির বিষয়ে স্মরণ করিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও।
লোকসভার সচিবালয়, গণতন্ত্রের জন্য সংসদীয় গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের (প্রাইড) যৌথ উদ্যোগে শুক্র ও শনিবার নিউ টাউন কনভেনশন সেন্টারে দু’দিনের প্রশিক্ষণ শিবির আয়োজন করেছে রাজ্য বিধানসভা। সেই শিবিরে লোকসভা এর পরেই নিজেদের কর্তব্য মনে করিয়ে বিড়লা বলেন, ‘‘বিধানসভায় আপনি যত সময় থাকবেন, ততই শিখতে পারবেন। অন্যের আলোচনা, অন্যের বক্তব্য, সমস্যা সমাধান আপনি জানতে পারবেন।’’র স্পিকার বিধায়কদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘‘ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাজ করতে আপনাদের ভূমিকা অনেক। আমাদের লক্ষ্য, বাংলার সেই লোকটির জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যিনি একেবারে অন্তিম স্থানে আছেন। জনমানসের আশা-আকাঙ্ক্ষার পূরণে ইতিহাস আপনাকে যেন স্মরণীয় করে রাখে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘জনগণ আপনাকে নির্বাচিত করে পাঠিয়েছে। মানুষের আস্থা আপনি, প্রতিকূলতায় সমাধানও আপনিই করবেন।’’
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রিজিজুর বক্তব্য, ‘‘নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসা সহজ কিন্তু নির্বাচিত হয়ে ৫ বছর কাজ করা অত্যন্ত কঠিন।’’ তাঁর মতে, ‘‘গণতন্ত্রে অন্যের কথাও শোনা প্রয়োজন। শুধু নিজের ভাষণ পাঠ করে চলে যান অনেকেই কিন্তু যিনি অন্য সদস্যদের কথাও শোনেন, তিনি সমৃদ্ধ হন।’’
শাসক ও বিরোধী বিধায়কদের উপস্থিতিতে প্রশিক্ষণ শিবিরের প্রথম দিন মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘‘আজ বিরোধিতা কিংবা নিন্দার দিন নয়। বিরোধী দলনেতা আছেন। একসঙ্গে এই কর্মসূচিকে সফল করে তুলতে হবে। কিন্তু আমি একটা চলে আসা পরিস্থিতির কথা বলতে চাই।’’ এই সূত্রেই তাঁর বক্তব্য, ‘‘৩৪ বছর বামফ্রন্ট আমলে দলীয় দফতর থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হত। বিধানসভার গুরুত্ব ছিল না। আর গত ১৫ বছর কী হয়েছে, সবাই দেখেছে। এক জন বিরোধী বিধায়কও কোনও প্রশাসনিক বৈঠকে ডাক পাননি। বিরোধী দলনেতাকে একটাও প্রশাসনিক বৈঠকে ডাকা হয়নি। মোট ৬০ মাসের মধ্যে সাড়ে ১১ মাস নিলম্বিত (সাসপেন্ড) করে বাইরে রাখা হয়েছিল। কোনও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। এটা রীতি নয়। এই ভাবে চলতে পারে না।’’ তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘‘আগের চেয়ে পরিস্থিতির বদল হয়েছে। এখন আর বিভাজন নেই। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে পাঁচটি প্রশাসনিক পর্যালোচনা বৈঠক হয়েছে, সব জায়গাতে বিরোধীরা ডাক পেয়েছেন। প্রয়োজনীয় মতামত দিয়েছেন। বাজেটে বিরোধীদের কাজের উল্লেখ করা হয়েছে। এখন একসঙ্গে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’’
এই কর্মশালায় কালীঘাটপন্থী তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিদ্রোহী তথা বিধানসভায় স্বীকৃত বিরোধী দলের বিধায়কেরাও ছিলেন। কিন্তু প্রাথমিক পর্বের পরেই বেরিয়ে যান বেলেঘটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ। তিনি বলেন, ‘‘স্পিকার ও মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারকে সম্মান করি। তাই এসেছিলাম। জাতীয় গীত, জাতীয় সঙ্গীত, প্রদীপ প্রজ্জ্বলন পর্যন্ত ছিলাম। কিন্তু যাঁরা অনৈতিক ভাবে দল ভাঙায় উৎসাহ দিচ্ছেন, আমি তাঁদের কথা শুনব না। এক জন স্পিকার তো পছন্দ মতো বিরোধী দলনেতা বেছে নিয়েছেন। আমি রাজ্যসভার সাংসদ ছিলাম। এই নিয়ম-কানুন অনেকটাই জানি। আর আমার শিখতে হলে আগের স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে শিখব!’’
পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের পাল্টা কটাক্ষ, ‘‘যোগ্য ছাত্র যোগ্য শিক্ষককে বেছে নিয়েছেন! যাঁর আমলে বিধানসভার ভিতরে বিরোধীদের উপরে শারীরিক আক্রমণ থেকে শুরু করে বিরোধী দলনেতা, বিরোধী দলের সচেতককে অসংখ্য বার নিলম্বিত করা হয়েছে, যিনি পুরো সময়টা ডান দিকে তাকিয়ে আজ্ঞা পালন করে গেলেন, কুণালবাবু তো তাঁর থেকেই শিখতে চাইবেন। বর্তমান স্পিকার সংসদীয় রীতি মেনে বিধানসভা চালাচ্ছেন, এটা তাঁর পছন্দ হবে কেন?’’
প্রথম দিনে একাধিক বিষয়ে বিধায়কদের রীতি-নীতির পাঠ দিয়েছেন রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারপার্সন হরিবংশ নারায়ণ সিংহ এবং মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, ওড়িশা, রাজস্থান ও সিকিম বিধানসভার স্পিকারেরা। আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া ও প্রাইভেট মেম্বার বিল বিষয়ক আলোচনায় ছিলেন কেরলে ইউডিএফের শরিক আরএসপি-র সাংসদ এন কে প্রেমচন্দ্রন।