—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়ার ফলে আতঙ্কে মৃত্যুর অভিযোগ অব্যাহত। বিএলও-সহ তিন জনের মৃত্যুর নেপথ্যে শুক্রবার তেমনই আঙুল উঠেছে। আতঙ্কে আত্মহত্যার চেষ্টা, শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থতা, জনতার ভোগান্তির কথা উল্লেখ করে এক অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলেক্টরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের (এইআরও) পদত্যাগপত্র পাঠানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। এই আবহে বিজেপি, নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মৃত, রোহিঙ্গাদের নাম রাখার চেষ্টা হচ্ছে বলে পাল্টা সরব হয়েছে বিজেপি।
শুনানির লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন হাওড়ার ডোমজুড়ের মদন ঘোষ (৬৫)। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁকে মৃত জানানো হয়। বড় ছেলে সুশান্তের দাবি, এসআইআর-এর জন্য নথি নিয়ে বাবা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। ২০০২-এর ভোটার তালিকার ‘হার্ড কপি’-তে উত্তর ২৪ পরগনার হাসনাবাদের ফিরোজ মোল্লার (৩৮) বাবা-মায়ের নাম থাকলেও, নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে তা ছিল না। তাঁর স্ত্রী সেরিনা মোল্লার দাবি, “শুনানিতে উনি প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে পারেননি। সেই আতঙ্কে এ দিন হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন।” কোচবিহারের পুণ্ডিবাড়িতে ধুবুড়ি-শিলিগুড়ি ইন্টারসিটি ট্রেনের ধাক্কায় মাধবী রায় (৫৮) নামে এক বিএলও-র মৃত্যু হয়েছে। তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, নতুন করে ৪০০ ভোটারের শুনানি সংক্রাম্ত কাজের কারণে ওই বিএলও-কে চাপ দেওয়া হয়েছিল। উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁয় কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করা বলাই দাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর বক্তব্য, “ভোটার তালিকায় নাম না-থাকলে কী হবে, এই আতঙ্কে মাথা কাজ করছিল না।” শিলিগুড়িতে শুনানি-কেন্দ্রেই অসুস্থ হয়ে মাটিতে পড়ে যান অশীতিপর দুলিচাঁদ মুরারকা।
এই অবস্থায় জনতার ভোগান্তি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও অভিষেক ফের সরব হয়েছেন। হাজরা মোড়ে দলীয় সভা থেকে মমতা বলেছেন, “৯০ বছরের বৃদ্ধা, নাকে নল দেওয়া অসুস্থ, অন্তঃসত্ত্বাদের ডেকে পাঠাচ্ছে (শুনানিতে)।” জাতীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর তোপ, “দু’কোটি লোকের নাম কাটছে। নাগরিক অধিকার কাড়লে তোমার অধিকারও কেড়ে নেব। গণ-আদালতে বিচার হবে। দিল্লি থেকে নাম কাটা হচ্ছে।” বিজেপিকে মমতার তোপ, “ওয়াশিং মেশিন এখন ভ্যানিশিং মেশিন!” নদিয়ার তাহেরপুরের সভা থেকে অভিষেকও বলেছেন, “এসআইআর করে সাধারণ মানুষকে হেনস্থার চেষ্টা করছে বিজেপি।” সভা-মঞ্চে তিন প্রবীণ নাগরিককে তুলে অভিষেকের দাবি, “কমিশন এঁদের ‘মৃত’ ঘোষণা করেছে। এমন একশোর বেশি ‘কেস’ আছে।”
পাল্টা সরব হয়েছে বিজেপি-ও। কোচবিহার উত্তর বিধানসভায় দলীয় সভা থেকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, “মৃতের নাম রাখার চেষ্টা হচ্ছে। বাংলাদেশের রোহিঙ্গার নাম ঢুকছে। নাম-বদলও চলছে।” দলের প্রধান মুখপাত্র দেবজিত সরকারের বক্তব্য, “বিহার-সহ দেশের যেখানে যেখানে এসআইআর হচ্ছে, কোথাও এই সব অভিযোগ ওঠেনি। তৃণমূলের বিএলএ-রা অভিযোগ করেননি কেন?”
প্রবীণ ও বিশেষ ভাবে সক্ষমদের শুনানিতে ডাক, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র তালিকায় অস্পষ্টতা, দলের নথিভুক্ত অভিযোগ উপেক্ষা করা, মূলত দক্ষিণ ২৪ পরগনায় মৃত ও ভুয়ো ভোটারের নাম তালিকায় থাকার মতো বিভিন্ন অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) কাছে চিঠি দিয়েছে সিপিএম। ডায়মন্ড হারবার, ফলতার মতো কয়েকটি বিধানসভায় ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতার অভিযোগ তুলে বিশেষ অডিটের দাবিও তুলেছে তারা। পাশাপাশি, যাদবপুরের এক জন মৃতের মৃত্যু শংসাপত্র দেওয়া সত্ত্বেও, তাঁর নাম খসড়া তালিকায় রয়েছে— এমন একটি উদাহরণ ও প্রয়োজনীয় নথি দিয়ে কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে কংগ্রেস। খসড়া ভোটার তালিকায় এমন কত জন মৃত ভোটারের নাম আছে, সে বিষয়ে খোঁজখবর করার জন্যও আর্জি জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব।
এরই মধ্যে ই-মেলে বৃহস্পতিবার পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন হাওড়ার বাগনান ২-এর এইআরও মৌসম সরকার। ইআরও অচিন্ত্যকুমার মণ্ডল জানান, তিনি ওই চিঠি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়েছেন। মৌসম জানিয়েছেন, ব্লকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র শুনানি হবে প্রায় ২৪ হাজার জনের। তাঁর আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় নথি না-থাকায় তাতে বহু গরিব ও প্রান্তিক মানুষের নাম বাদ পড়বে। তাঁর কথায়, ‘‘দেশের মানুষের সঙ্গে এই বেইমানির ভাগিদার হতে চাই না। শুনানি ছাড়া, নির্বাচন কমিশনের সব কাজ করতে প্রস্তুত।”