Yuba Sathi

‘যুবসাথী’তে নগদ অর্থ বিলির পরিসর আরও বড় করে নিলেন মমতা, ভাতা দিয়ে বোনেদের মতো ভাইদেরও সঙ্গে চান দিদি

উচ্চশিক্ষার জন্য যাঁরা রাজ্য সরকার বা অন্য কোনও সংস্থার বৃত্তি পান, তাঁরাও এই প্রকল্পের বাইরে থাকবেন না। অর্থাৎ, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ না পাওয়া যুবক-যুবতীদের জন্যও এই ভাতা চালু থাকবে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৮
Mamata Banerjee widened the  ground of cash distribution through the Yuvasathi scheme before the WB Assembly polls

যুবসাথী প্রকল্পে ভিড় বাড়ছে। অনলাইন পোর্টাল শুরু করতে হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারকে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

দৃশ্য ১: হুগলির শ্রীরামপুর। রবিবার সকাল সাড়ে ৮টা। রাস্তা-কাঁপানো দামি মোটর সাইকেল থেকে নামলেন যুবক। পিছনে সওয়ার স্ত্রী। কোলে মাস চারেকের কন্যাসন্তান। দু’জনে সটান গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন যুবসাথীর শিবিরের লাইনে। দরজা খুলতে তখনও বাকি দেড় ঘণ্টা!

Advertisement

দৃশ্য ২: বহরমপুর স্টেশনে নেমে বাড়ি না-গিয়ে যুবসাথীর লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন কেরল থেকে ফেরা পরিযায়ী শ্রমিক। নাম লিখিয়ে তার পরেই ফিরেছেন গ্রামে।

দৃশ্য ৩: সোমবার হলদিয়ায় যুবসাথীর শিবিরে লাইন দিয়ে নাম লেখাতে গিয়েছেন বছর আঠাশের যুবক। আদতে তিনি চন্দননগরের মাছের আড়তে কাজ করেন। এক দিন কাজ কামাই পুষিয়ে যাবে, যদি প্রতি মাসে অ্যাকাউন্টে দেড় হাজার টাকা চলে আসে।

কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ, বান্দোয়ান থেকে বিনপুর— রবি এবং সোমবার রাজ্য সরকারের যুবসাথী প্রকল্প ঘিরে সাড়া পড়ে গিয়েছে। দীর্ঘায়িত হয়েছে প্রত্যাশীদের লাইন। যাকে বিরোধীরা পশ্চিমবঙ্গের কর্সংস্থানের ‘করুণ ছবি’ হিসাবে দেখাতে চাইলেও তৃণমূল এই লাইনের মধ্যেই বুথের লাইন দেখতে চাইছে। লক্ষ্মীর ভান্ডারের মৌখিক প্রতিশ্রুতি দিয়েই ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে খেলা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০২৬ সালের নির্বাচন যখন আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা ‘কঠিন’ হয়ে তৃণমূলের সামনে আবির্ভূত হয়েছে, তখন ভোটের আগেই যুবসাথী কার্যকর করতে ময়দানে নেমেছে তাঁর প্রশাসন।

আপনি কি মাধ্যমিক পাশ এবং কর্মহীন? আপনার বয়স কি ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে? তা হলে আপনি যুবসাথীর ভাতার জন্য আবেদন করতে পারেন। আপনি কি অন্য কোনও সরকারি ভাতা পান? তা হলে আপনি যুবসাথীর ভাতার আবেদন করতে পারবেন না। কিন্তু আপনি যদি সরকারি কোনও ‘বৃত্তিমূলক’ ভাতা (ঐক্যশ্রী, স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপ, কন্যাশ্রী) পান, তা হলে আপনি যুবসাথী ভাতা পাওয়ার আবেদন করতে পারেন।

কী ভাবে আবেদন করবেন?

সরকার আয়োজিত শিবিরে বা অনলাইনে আপনাকে বেশ কিছু তথ্য জানাতে হবে। দিতে হবে নথিও। তাতে প্রধান নথি মাধ্যমিকের মার্কশিট। এ ছাড়াও আধার কার্ড এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্যও ফর্মে পূরণ করতে হবে। যদি কোনও আবেদনকারীর তফসিলি জাতি বা উপজাতিভুক্ত হওয়ার শংসাপত্র থাকে, তা-ও তাঁকে দাখিল করতে হবে। এ ছাড়াও পরিবারের সদস্যদের তথ্যপঞ্জি, ঠিকানা ইত্যাদি পূরণ করতে হবে।

রাজ্য বাজেটেই যুবসাথী প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছিল। এই খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৫,০০০ কোটি টাকা! মাধ্যমিক পাশ করা পশ্চিমবঙ্গের কর্মহীন যুবক-যুবতীরা এই প্রকল্পের আওতায় থাকছেন। বয়ঃসীমা ২১ থেকে ৪০ বছর। চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে এই প্রকল্প কার্যকর হবে। অর্থাৎ, ভোটের আগেই। কিন্তু লাইন পড়েছে রবিবার থেকেই। এবং সে লাইন এতটাই সর্পিল এবং ভিড়ে ঠাসা যে, রবিবার রাতেই বাধ্য হয়ে নবান্নকে অনলাইন খুলতে হয়েছে। যা আদতে খোলার কথা ছিল সপ্তাহখানেক পর। প্রসঙ্গত, একটানা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত এই ভাতা পাওয়া যাবে। তবে এই সময়ের মধ্যে কেউ চাকরি পেয়ে গেলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রকল্পের সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, উচ্চশিক্ষার জন্য যাঁরা রাজ্য সরকার বা অন্য কোনও সংস্থার স্কলারশিপ পান, তাঁরাও এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন। অর্থাৎ, পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ না পাওয়া যুবক-যুবতীদের জন্যও এই ভাতা চালু থাকছে। ধরা যাক, বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রী কন্যাশ্রী-৩ পান, তিনিও যুবসাথীতে আবেদন করতে পারবেন। কিন্তু লক্ষ্মীর ভান্ডার যাঁরা পান, তাঁরা পাবেন না এই প্রকল্পের সুবিধা। এই প্রকল্প যে ভোটের দিকে তাকিয়েই, তা সরকারের প্রথম ঘোষণা এবং তার পর তাতে সংশোধনের সিদ্ধান্তেই স্পষ্ট। প্রথমে ঘোষণা করা হয়েছিল, আগামী ১৫ অগস্ট থেকে এই প্রকল্প চালু হবে। কিন্তু তার পরে নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করে স্বয়ং মমতা জানিয়ে দেন, অগস্ট নয়। ফেব্রুয়ারিতেই হবে শিবির। এপ্রিল থেকেই অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকা শুরু হয়ে যাবে।

পশ্চিমবঙ্গে গত কতগুলি ভোটের হিসাবে স্পষ্ট, লক্ষ্মীর ভান্ডারের দৌলতে মহিলা ভোট মমতার দিকেই রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের অনেকের বক্তব্য, বোনেদের পরে এ বার ভাতার মাধ্যমে ভাইদেরও ছুঁতে চাইছেন দিদি। সাধারণ ভাবে যুবসাথী পুরুষ-মহিলা সকলের জন্য হলেও লাইনে প্রথম দু’দিনে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। বয়সের মানদণ্ড বলে দিচ্ছে, মূলত তরুণ প্রজন্মের জন্যই এই প্রকল্প। যে বয়সের মধ্যে সাধারণ ভাবে স্থিতাবস্থা বিরোধিতার ঝোঁক থাকে সর্বোচ্চ। এ-ও প্রণিধানযোগ্য যে, এ বারের ভোটে তৃণমূলকে লড়াই করতে হবে ১৫ বছর সরকার চালানোর পরে স্বাভাবিক ভাবে তৈরি হওয়া স্থিতাবস্থা বিরোধিতা মোকাবিলা করেই। অর্থাৎ, স্থিতাবস্থার ‘বোঝা’ ঘাড়ে নিয়েই মমতা তথা তৃণমূলকে ভোটের ময়দানে নামতে হবে।

আরও একটি বিষয় প্রশাসনিক মহলের আলোচনার মধ্যে রয়েছে। তা হল এসআইআর। কেন? আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে যুবসাথী প্রকল্পে আবেদন নেওয়ার শিবির। আর ২৮ ফেব্রুয়ারি এসআইআরের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ হবে। নবান্ন এবং নব মহাকরণের অনেকের বক্তব্য, সরকার এমন একটা প্রক্রিয়া বার করতে চাইছে, যার ফলে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যাঁদের নাম থাকবে, তাঁদের অ্যাকাউন্টেই যাতে যুবসাথীর অর্থ যায়। না হলে ‘উদ্দেশ্য’ সাধিত হবে না।

তৃণমূলের অনেকে আরও একটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি দেখছেন। তাঁদের বক্তব্য, একই পরিবারে দু’জন যদি এই ভাতা পান, তা হলে সেই পরিবারে মাসে ৩,০০০ টাকা পৌঁছে যাবে। এরই সঙ্গে অনেকে জুড়ে দিচ্ছেন ২০ লক্ষ মানুষের জন্য আবাস প্রকল্পে বাড়ি তৈরির জন্য প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা পৌঁছে যাওয়াও।

ভোটের আগে এ হেন প্রকল্পকে প্রত্যাশিত ভাবেই কটাক্ষ করেছে বিজেপি। পদ্মশিবিরের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালের কথায়, ‘‘ভাতার জন্য এই বিশাল লাইন দেখিয়ে দিচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গকে কোন অবস্থায় নিয়ে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী! ভাবলেও বাঙালি হিসাবে লজ্জা হচ্ছে।’’ সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী তো প্রায়ই বলেন, ডবল-ডবল চাকরি হয়েছে। ২ কোটি নাকি চাকরি দিয়েছেন উনি! যুবসাথীর লাইনে তা হলে কারা?’’ পাল্টা তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলছেন, ‘‘বিজেপি মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়েছিল নোটবন্দির নামে। বিজেপি মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়েছে এসআইআরের নামে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকল্পে যুবক-যুবতীরা স্বপ্ন দেখে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।’’ কিন্তু কর্মসংস্থানের সঙ্কট? কুণালের জবাব, ‘‘বিজেপির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১২ বছরে দেশে ২৪ কোটি চাকরি হওয়ার কথা ছিল। হয়েছে কি? বাংলার পরিস্থিতি সেই নিরিখে অনেক এগিয়ে।’’

Advertisement
আরও পড়ুন