প্রচারে শ্রীকান্ত। নিজস্ব চিত্র।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের শ্রীকান্ত চরিত্রটির সঙ্গে নাকি মিল রয়েছে তৃণমূল প্রার্থী শ্রীকান্তের। অন্তত তাঁর দলের প্রচারপত্রে সেই রকমই দাবি করা হয়েছে। এই দাবি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের আদান প্রদান শুরু হয়েছে। চলছে নানা উদাহরণে কটাক্ষ।
পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী শ্রীকান্ত মাহাতো। শালবনি কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে চন্দ্রকোনা রোড। এখানকার দলীয় কর্মীরা তাঁকে শরৎ উপন্যাসের নায়ক ‘শ্রীকান্ত’ রূপে তুলে ধরেছেন এক লিফলেটে। প্রচারপত্রটি ১০ হাজার ছাপিয়ে বিলি করছেন তৃণমূল কর্মীরা। প্রচারপত্রে লেখা, ‘শ্রীকান্ত মাহাতো যেনো শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত, ইন্দ্রনাথ সুহৃদ পরোপকারী, মানবদরদী একজন সমাজসেবক’।
তৃণমূলের শ্রীকান্তের চরিত্র কি সাহিত্যের শ্রীকান্তের সঙ্গে মেলে? লিফলেটের লেখক গড়বেতা-৩ ব্লক তৃণমূলের সহ-সভাপতি জ্ঞানাঞ্জন মণ্ডল বলেন ‘‘অনেকটা সেরকমই।’’ তবে যে ব্যাখ্যা দিলেন তা যেন তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে মেলে। জ্ঞানাঞ্জন বলেন, ‘‘শ্রীকান্তদা সহজ সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। তাঁর বাড়িও সাধারণ। গ্রামের মেঠো পরিবেশের মানুষ তিনি। মমতাদির স্নেহভাজন। বলা যায় যেমন দিদি তেমন ভাই।’’
রাজনৈতিক নেতারা জনসেবায় নিয়োজিত। মানবদরদি হওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সাহিত্যের শ্রীকান্তের সঙ্গে তুলনা কেন? চন্দ্রকোনা রোডের এক তৃণমূল কর্মীর কথায়, "দলীয় নেতৃত্ব যা ভাল বুঝেছেন করেছেন। আমরা ব্যক্তির হয়ে তো প্রচার করছি না, আমরা তৃণমূলকে জেতাতে নেমেছি।’’
উপন্যাসের শুরুতেই কথক শ্রীকান্ত নিজেকে ভবঘুরে বলেছেন। তৃণমূলের শ্রীকান্ত রাজনৈতিক ভাবে তা অবশ্যই নন। তিনি টানা চারবার শালবনি কেন্দ্রে তৃণমূলের প্রার্থী শ্রীকান্ত। ২০১১ সালে প্রথমবার জিতে বিধায়ক হন। ২০১৬ ও ২০২১ সালেও তিনি শালবনির বিধায়ক ছিলেন। এবার তিনি টিকিট পাবেন কিনা, তা নিয়ে দলের মধ্যেই জল্পনা ছিল। যদিও দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাঁর উপরই আস্থা রেখেছেন। সাহিত্যের শ্রীকান্তের আক্ষেপ ছিল, আত্মীয়-অনাত্মীয়ের মুখে টানা ‘ছি-ছি’ শুনতে হয়েছে সারা জীবন। রাজনৈতিক শ্রীকান্ত কিন্তু দলের ৪০ জন ‘তারকা’ প্রার্থীর অন্যতম। বিরোধীরা ‘ইন্দ্রনাথ সুহৃদ’এর তুলনায় শ্রীকান্তকে খোঁচা দিচ্ছেন। বিজেপির ঝাড়গ্রাম সাংগঠনিক জেলার সাধারণ সম্পাদক চন্দ্রকোনা রোডের গৌতম কৌড়ির কটাক্ষ, ‘‘ওই উপন্যাসের নায়ক নন, উনি ছিনাথ বহুরূপীর মতো আচরণ করেন। মানুষ চেনেন ওঁকে। আসলে তৃণমূল মানেই নানা রূপের আধার।’’ শালবনির বিজেপি প্রার্থী বিমান মাহাতোর খোঁচা, ‘‘নিজেকে বড় বললেই হয় না, লোকে যারে বড় বলে সেই বড় হয়।’’ এই কেন্দ্রের বাম সমর্থিত আইএসএফ প্রার্থী মোহন টুডু নাম না করে বলেন, ‘‘সাদা জামা পড়লেই সাদা হওয়া যায় না। বহুরূপধারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভেকধারীই হয়।’’
প্রচারপত্রের অন্য একটি দাবি নিয়েও আপত্তি উঠছে। তাতে লেখা, ‘রাজনীতির জীবন শুরু, হার্মাদ মাওবাদী যৌথবাহিনীর বিরুদ্ধে, জনগণের কণ্ঠহিসেবে প্রতিবাদী মুখ’। এ বিষয়ে শালবনির ভারপ্রাপ্ত সিপিএমের জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সৌগত পণ্ডা বলেন, ‘‘জঙ্গলমহলের মানুষ জানেন যাহাই তৃণমূল, তাহাই মাওবাদী। তাঁরা সেইসময় হাতে হাত মিলিয়ে মিটিং-মিছিল করা থেকে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার, সব করেছে। এখন এসব বলে মানুষকে ভুল বোঝাচ্ছে তৃণমূল।’’ তৃণমূলের তারকাপ্রার্থী অবশ্য পায়ে হাওয়াই চটি, সাদা পোশাকে প্রচার করছেন। দোকানে, গৃহস্থের বাড়িতে ঢুকে প্রচার সারছেন। শ্রীকান্ত বলছেন, ‘‘আমি সাদামাটা জীবন কাটাই। বরাবর সাদামাটা ভাবেই প্রচার করি।’’