(বাঁ দিকে) তাপস রায়। (মাঝে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। — ফাইল চিত্র।
তৃণমূল ভেঙে ‘চুরমার’ হয়ে গিয়েছে। বিধানসভায় ৫০ জন তৃণমূল বিধায়ককে নিয়ে হাজির হচ্ছেন বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। মঙ্গলবার সমাজমাধ্যম পোস্ট দেন বিজেপি বিধায়ক তাপস রায়। তার কিছু ক্ষণ পর বিধানসভায় পৌঁছে যদিও ঋতব্রত দাবি করেন, সবই ‘জল্পনা’। নিজের এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা ছাড়া তিনি কারও দায়িত্ব নেবেন না। তার পরেই আবার তৃণমূলের দিকে আঙুল তোলেন ঋতব্রত। দুর্নীতি নিয়ে কটাক্ষ করেন। তার পরে এ-ও জানিয়ে দেন, তৃণমূল তাঁকে বহিষ্কার করলেও নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি যে সম্মান ছিল, তা-ই থাকবে।
অন্য দিকে, তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ জানান, মঙ্গলবার বিধানসভায় স্পিকারের কাছে একটি চিঠি জমা করতে গিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের আর এক বিধায়ক অসীমা পাত্র। স্পিকারের সচিব জানিয়েছেন, স্পিকারের অনুমতি ছাড়া বিরোধীদের কোনও চিঠি গ্রহণ করা যাবে না। কুণালদের চিঠি গ্রহণ করা হয়নি। তাঁরা স্পিকারের টেবিলে চিঠি রেখে চলে আসেন বলে জানান কুণাল। তবে চিঠি কী বিষয়ে লেখা, তা জানাননি তিনি। এই বিষয়ে তাপস বলেন, ‘‘যেহেতু তদন্ত চলছে, তাই হয়তো চিঠি নেওয়া হয়নি।’’
মঙ্গলবার ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বিজেপি বিধায়ক তাপস লেখেন, ‘‘তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে চুরমার। মহারাষ্ট্রের মতো অবস্থা হল তৃণমূলের। বিধানসভার স্পিকারের কাছে প্রায় ৫০ জন তৃণমূল বিধায়ক নিয়ে পৌঁছে গিয়েছেন ঋতব্রত। খেলা হবে।’’
যদিও ঋতব্রত বিজেপি বিধায়কের এই পোস্টের বিষয়বস্তু অস্বীকার করেছেন। তিনি বিধানসভায় প্রবেশের সময় বলেন, ‘‘বিধানসভায় কাজে এসেছি। সবই জল্পনা।’’ তিনি এ-ও দাবি করেন, এর আগে যে বিধানসভায় গিয়েছিলেন, তা নেহাতই আড্ডা দিতে। ৫০ জন বিধায়ক কি তাঁর পাশে রয়েছেন? সেই প্রশ্নের জবাবে ঋতব্রত বলেন, ‘‘আমি আমার এবং সন্দীপন ছাড়া কারও দায়িত্ব নিতে পারব না।’’ ঋতব্রত বিধানসভায় পৌঁছোনোর পরেই সেখানে যান তাপসও। বিজেপির একটি সূত্র বলছে, তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত ঋতব্রতের সঙ্গে কথা হতে পারে প্রাক্তন তৃণমূল নেতা তাপসের।
সোমবারই ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল। নবাগত দুই বিধায়কের দাবি, গত ৬ মে-র বৈঠকে বিরোধী দলনেতা বাছার কোনও রেজ়োলিউশন (প্রস্তাব) হয়নি। স্রেফ একটি উপস্থিতির খাতায় করানো সইকে জালিয়াতি করে সেটা রেজ়োলিউশনে বদলে দিয়েছেন নেতৃত্ব। বিধানসভার সই জাল-কাণ্ডে সোমবার দুপুরে নবান্ন থেকে সাংবাদিক বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। তখন তিনি জানান, তৃণমূলের দুই বিধায়ক ঋতব্রত এবং সন্দীপনই লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন স্পিকারের কাছে। এখানে বিজেপির কোনও ভূমিকা নেই। তৃণমূলের দুই বিধায়কের অভিযোগের ভিত্তিতেই বিধানসভার সচিবালয় হেয়ার স্ট্রিট থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে। আর পুলিশমন্ত্রী হিসাবে বিষয়টি তাঁর কানে যাওয়ার পর সিআইডি-কে তদন্তে যুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। শুভেন্দুর এই ঘোষণার পরেই জানা যায়, দুই বিধায়ককে বহিষ্কার করেছে তৃণমূল।
মঙ্গলবার বিধানসভায় প্রবেশের সময় ঋতব্রত স্পষ্ট জানান, দল বহিষ্কার করলেও মমতার প্রতি তাঁর সম্মান একই রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘মমতা সকলের নেত্রী। পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হতে পারি। মমতার প্রতি যে সম্মান ছিল, তাই থাকবে। তিনিই আমার নেত্রী।’’ এর পরেই তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে আঙুল তোলেন ঋতব্রত। তিনি বলেন, ‘‘মমতা যে পার্টি করেছিলেন, ঘটনাচক্রে কর্পোরেট রীতিতে চলতে গিয়ে সেই তৃণমূল বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। (ভোটের ফলঘোষণার) ২৬ দিন পরে বেরিয়ে গণপিটুনি বা চোরপিটুনি অভিষেক খেলেন। গতকাল থেকে আমি গদ্দার, বেইমান শুনছি, কিন্তু চোর-চোর শুনছি না। রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে নিরাপত্তাও চাইনি।’’
এর পরেই ঋতব্রত বলেন, ‘‘ভোটের আগে থেকেই উলুবেড়িয়ার সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হই। আই-প্যাককে বলেছি। এজেন্টরা বসতে পারছে না। ভোটের দিন সাবোতাজ (অন্তর্ঘাত) হয়। প্রশাসনের কাছে এক ধরনের সই জমা পড়েছে। পোল প্যাকেটে আর এক রকম।’’ ঋতব্রতের দাবি, তিনি উলুবেড়িয়ায় ভোটের দিন দুপুরে সাংবাদিক বৈঠক করতে চেয়েছিলেন। দলের তরফে তা করতে দেওয়া হয়নি। ‘উলুবেড়িয়ার সরকার’ বলতে তিনি কাদের বুঝিয়েছেন, তা-ও জানান। ঋতব্রত বলেন, ‘‘উলুবেড়িয়া পুরসভার চেয়ারম্যান অভয় দাস দুর্নীতির শিরোমণি। বলা হয়েছিল, তাঁর এবং আকবর শেখের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আমাকে বলা হয়, ‘পুলক রায়কে (রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী) নিয়ে কিছু বলবেন না।’ আমরা বাকিটা দেখব।’’ পুলকের দিকে আঙুল তুলে তিনি ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে। ঋতব্রতের কথায়, ‘‘সরকারকে অনুরোধ করব, পুলকের দফতরের অধীনে যে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ছিল, তার এমডি ক্যামাক স্ট্রিটে (অভিষেকের দফতরে) কখন, কবে যেতেন, সুমিত রায়ের সঙ্গে কী যোগাযোগ ছিল, সব জানানো হোক। চক্র ছিল।’’
ঋতব্রত যখন এ সব বলছেন, তখন বিধানসভায় উপস্থিত ছিলেন কুণাল। তিনি জানান, বিধানসভায় একটি চিঠি দিতে গিয়ে তাঁর মজাদার অভিজ্ঞতা হয়েছে। কী অভিজ্ঞতা, তা-ও জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘‘স্পিকার সাহেব নেই। অধ্যক্ষের সচিবালয়ে গিয়েছিলাম তাঁর সচিবের কাছে। তিনি যা জানালেন, তাতে হাসব না কাঁদব জানি না। সোমবার একটি চিঠি এখানে জমা করা হয়েছে। তারা সেটি গ্রহণ করেছেন। চিঠি গ্রহণের পরে স্পিকার (সচিবকে) নির্দেশ দিয়েছেন, বিরোধীদের কোনও চিঠি গ্রহণ করা যাবে না। তিনি অনুমতি না দিলে কারও চিঠি গ্রহণ করা যাবে না।’’
কুণাল জানান, স্পিকারের সচিব চিঠি গ্রহণ করেননি। তিনি বিধানসভার প্রিন্সিপাল সচিবকে ফোন করেন। তিনি নির্দেশ দেন, কারও চিঠি গ্রহণ করা যাবে না। ফোনও ধরা হবে না। কুণাল বলেন, ‘‘আমরা চিঠিটি স্পিকারের সচিবের টেবিলে পেপারওয়েট চাপা দিয়ে রেখে ভিডিয়ো করে বেরিয়ে এলাম।’’ কুণাল আরও বলেন, ‘‘চিঠি স্পিকারের দফতর গ্রহণ করে, এটাই দস্তুর। আজ নির্দেশনামা জারি হয়েছে। সচিবের অধিকার খর্ব করা হয়েছে।’’ কুণালের আরও দাবি, ‘‘সোমবার নিয়েছিলেন চিঠি, সত্যি কি না জানি না, বুধবার থেকে অন্য দফতরে বদলি হয়েছেন (সচিব)। সেটা চিঠি গ্রহণ করার পরে হয়েছে কি না, বলতে পারব না।’’ এর পরেই কুণালের প্রশ্ন, ‘‘বিরোধীরা একটা চিঠি জমা দেব। স্পিকার নেই বলে কি চিঠি জমা পড়বে না? দেখা করবেন না, চিঠিও জমা পড়বে না? এটা কি ছেলেখেলা! আমরা হাসিম আবদুল হালিম, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখেছি।’’