Krishnanagar

মায়ের কর্নিয়া দান অপরাধ? সমাজকর্মী পুত্রের গ্রেফতারির জবাব দিল পুলিশ, অঙ্গ রক্ষিত বহরমপুর মেডিক্যাল কলেজে

বিতর্কের মুখে পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সময় পরিবারটি চক্ষুদানের বৈধ কোনও নথি দেখাতে পারেনি। আদালতেও পরিবারের দুই সদস্য ভিন্ন কথা বলেছেন।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:৫১
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

পুত্রের দাবি, ‘রক্ষণশীলতার অন্ধকার’ কাটাতে চেয়েছিলেন মা। মায়ের ইচ্ছাপূরণ করতেই মৃত্যুর পর কর্নিয়া দান করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবেশীদের একাংশের অভিযোগ, মৃত মায়ের অঙ্গ বিক্রি করতে গিয়েছিলেন সমাজকর্মী এবং শিক্ষক আমির চাঁদ। গত ২৪ ঘণ্টায় এ নিয়ে শোরগোল নদিয়ার কৃষ্ণনগরের কোতোয়ালি থানার সেনপুরে। মঙ্গলবার পুলিশ জানাল, মৃতার অঙ্গদান সম্পর্কিত নথি দিতে পারেননি পুত্র বা তাঁর পরিবার! এর মধ্যে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতরও।

Advertisement

গত রবিবার আমিরের মা রাবেয়া বিবি প্রয়াত হন। তার পর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে মায়ের কর্নিয়া দানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন পুত্র। কিন্তু অভিযোগ ওঠে কোনও রকম নথিপত্র ছাড়া গোপনে ওই ‘মহৎ কাজ’ করেছেন আমির। নেপথ্যে আর্থিক লেনদেন রয়েছে। প্রতিবেশীদের অনেকে বলেছেন, ‘‘মৃত মায়ের চোখ চুরি করেছেন শিক্ষক।’’ এই বিতর্কের আবহে আমির-সহ পরিবারের পাঁচ সদস্য গ্রেফতার হয়েছেন। সোমবার তাঁদের কৃষ্ণনগর আদালতে হাজির করানো হলে বিচারক তিন দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন। তার পর কার্যত আড়াআড়ি বিভক্ত এলাকা। আমিরের ঘনিষ্ঠদের দাবি, ষাটোর্ধ্ব রাবেয়া গত বছরের অক্টোবরে ‘গণদর্পণ’-এর মাধ্যমে মরণোত্তর অঙ্গদানের অঙ্গীকার করেছিলেন। তাঁর প্রয়াণের পর নিয়ম মেনে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধি ও চিকিৎসকেরা গিয়ে কর্নিয়া সংগ্রহ করেন। কর্নিয়া সংগ্রহের যাবতীয় নথি তুলে দেওয়া হয় পরিবারের হাতে। কিন্তু কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে পড়শিদের একাংশ অভিযোগ করছেন, আমির তাঁর মায়ের চোখ বিক্রি করে দিয়েছেন। উন্মত্ত জনতা সমাজকর্মী-শিক্ষকের বাড়িতে ভাঙচুর চালায় বলেও অভিযোগ। পাশাপাশি ওই পক্ষ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

আমিরের পরিবারের দাবি, অশান্তি এড়াতে পুলিশ নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে তাদের থানায় নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পরে আমির-সহ বাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে অঙ্গ চুরি বা বিক্রির চেষ্টার মতো মারাত্মক অভিযোগ করেছে। উল্লেখ্য, ধৃতদের মধ্যে আমিরের কন্যা ও পুত্রবধূও রয়েছেন। ধৃতদের আইনজীবী অরূপ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “আদালতে গণদর্পণের সমস্ত বৈধ নথিপত্র এবং রাবেয়া বিবির অঙ্গীকারপত্র পেশ করা সত্ত্বেও জামিন মেলেনি। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।”

এই গ্রেফতারি ঘিরে সমাজমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সরব হয়েছেন মানবাধিকার কর্মীরা। এপিডিআর-এর পক্ষ থেকে তাপস চক্রবর্তী বলেন, “পুলিশ তদন্ত না করেই সপরিবারে সমাজকর্মীকে কেন জেলে পাঠাল? নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও এই গ্রেফতারি কি কোনো রাজনৈতিক নির্দেশে?” একই সুর কংগ্রেস নেতা পার্থ মুখোপাধ্যায়ের গলায়। তাঁর অভিযোগ, আমির সক্রিয় কংগ্রেসকর্মী বলেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে।

তবে পুলিশের দাবি ভিন্ন। তারা জানাচ্ছে, ওই পরিবার চক্ষুদানের বৈধ নথি দেখাতে পারেনি। স্থানীয়দের প্রবল বিক্ষোভ সামাল দিতে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে পদক্ষেপ করা হয়েছে।

বিতর্কের মুখে পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, ঘটনার সময় পরিবারটি চক্ষুদানের বৈধ কোনও নথি দেখাতে পারেনি। স্থানীয়দের প্রবল বিক্ষোভ সামাল দিতে এবং আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এই পদক্ষেপ। কৃষ্ণনগরকাণ্ডে পুলিশের তরফে থেকে ডিএসপি শিল্পী পাল বলেন, ‘‘মৃত রাবেয়া বিবির চক্ষুদান নিয়ে তাঁর পরিবার বৈধ নথিপত্র দেখাতে পারেননি। এমনকি, আদালতে মৃতার স্বামী এবং এক ছেলে বয়ান দিয়েছেন, চক্ষুদানের বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানতেন না।’’ তিনি আরও বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী, মরণোত্তর অঙ্গদান করতে গেলে দাতার সম্মতিপত্র অথবা পরিবারের সকল সদস্যের সম্মতির কাগজ থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ঘটনাস্থলে এই ধরণের কোনও কাগজ দেখাতে পারেনি অভিযুক্তেরা।’’

পুলিশ সূত্রে খবর, এখন কর্নিয়া সংরক্ষিত রয়েছে বহরমপুর মেডিক্যাল কলেজে।

Advertisement
আরও পড়ুন