Suvendu on CM Residence

মুখ্যমন্ত্রীর জন্য ‘দুর্গ’ চাই না, বার্তা প্রশাসনকে

বাম জমানায় প্রথমে হিন্দুস্তান পার্কের বাড়ি ও পরে রাজভবনের ঘর ছেড়ে আসার পরে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বেশ অনেক বছর থাকতেন ইন্দিরা ভবনে।

সন্দীপন চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ১১ মে ২০২৬ ০৮:৪৮
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। নিজস্ব চিত্র।

সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এল সেই পুরনো প্রশ্ন! নতুন মুখ্যমন্ত্রীর ঠিকানা কী হবে?

শপথ নেওয়ার পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রাথমিক ভাবে ঠিক করেছেন, সপ্তাহে পাঁচ দিন তিনি কলকাতায় থাকতে চান। অফিস করতে চান, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে অভাব-অভিযোগ শুনতে চান। বিবাদী বাগের মহাকরণ আবার কাজের উপযুক্ত হয়ে ওঠার আগে আপাতত গঙ্গা পারের নবান্নেই থাকছে রাজ্য সরকারের মূল সচিবালয়। আর থাকার জায়গা যেখানেই হোক, পুলিশ-প্রশাসনের প্রতি নতুন মুখ্যমন্ত্রীর প্রথম নির্দেশ— নিরাপত্তার দুর্গ বানিয়ে সাধারণ মানুষের অসুবিধা ও বিরক্তি তৈরির করার প্রয়োজন নেই। সূত্রের খবর, কলকাতা ও কাঁথি, দুই জায়গার জন্যই একই নীতি মেনে চলতে বলা হয়েছে প্রশাসনকে।

অন্য অনেক রাজ্যের মতো এই রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীর জন্য কোনও নির্দিষ্ট সরকারি আবাস নেই। বাম জমানায় প্রথমে হিন্দুস্তান পার্কের বাড়ি ও পরে রাজভবনের ঘর ছেড়ে আসার পরে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বেশ অনেক বছর থাকতেন ইন্দিরা ভবনে। বিধাননগরের সেই সরকারি ভবন আপাতত তালাবন্ধ। মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য প্রশাসনের আধিকারিকদের বারংবার অনুরোধের পরেও পাম অ্যাভিনিউয়ের আবাসন ছেড়ে অন্যত্র যেতে রাজি হননি। রাজ্যে ১৫ বছর আগে পরিবর্তন ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও থেকে গিয়েছিলেন কালীঘাটের বাড়িতেই। তবে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটে তাঁর বাড়ির রাস্তা নিরাপত্তার বজ্র আঁটুনিতে মোড়া ছিল। যা সদ্য খুলে ফেলা হয়েছে তিনি প্রাক্তন হওয়ার পরে। এই দীর্ঘ সময়ে কয়েক বার ভাবনা-চিন্তা হলেও মুখ্যমন্ত্রী বা বিরোধী নেতা, কারও জন্যই সরকারি আবাস গড়ে ওঠেনি। শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে আবার তৎপর হতে হচ্ছে পুলিশ-প্রশাসনকে।

আগে রাজ্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বা পরে পাঁচ বছর বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন কাঁথির বাড়ি থেকেই সচরাচর যাতায়াত করেছেন শুভেন্দু। সরকারি বা দলীয় কাজে প্রয়োজন হলে থেকে গিয়েছেন কলকাতায়। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নাম ঘোষণার পরে রাজারহাটে চিনার পার্কের আবাসনে তাঁর ফ্ল্যাটেই থেকেছেন নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর থেকে নির্বাচিত বিধায়ক। সেখান থেকে বেরিয়েই শনিবার গিয়েছেন ব্রিগেড ময়দানে শপথ নিতে। সব কাজ সেরে মধ্যরাতে পৌঁছেছেন কাঁথির ‘শাম্তিকুঞ্জে’। আবার রবিবার সন্ধ্যায় সেখান থেকে ফিরেছেন কলকাতায়। মুখ্যমন্ত্রীর ‘জ়েড’ ক্যাটিগরির নিরাপত্তার প্রেক্ষিতে এই দীর্ঘ পথে প্রতিদিন সব রকমের বন্দোবস্ত রাখা কঠিন। কাজের পক্ষে অসুবিধাজনকও বটে। পরিস্থিতি বিচার করেই মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকেরা।

মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘থাকার জন্য কোনও একটা জায়গা হলেই চলবে। এক কামরার একটা ফ্ল্যাট রয়েছে, তাতেও চলে যেতে পারে। আমি মানুষের ভোটে নির্বাচিত এক জনপ্রতিনিধি। আমার জন্য হায়দরাবাদ হাউজ়ের মতো কোনও বিশাল ব্যবস্থা লাগবে না! সরকার যেখানে ঠিক মনে করবে বা ব্যবস্থা করবে, সেখানেই চলবে।’’ মুখ্যমন্ত্রীর মতে, থাকার জায়গার সঙ্গে তাঁর একটা নির্দিষ্ট দফতর থাকা উচিত, যেখানে মানুষ যোগাযোগ করতে পারবেন। সরকারি সূত্রের খবর, আলিপুরের ‘সৌজন্য’ ভবনে মুখ্যমন্ত্রীর থাকার ব্যবস্থা তৈরি রাখা হচ্ছে। পুলিশ-কর্তারা বন্দোবস্ত খতিয়ে দেখেছেন। ‘সৌজন্য’ তৈরি হয়ে গেলে সেখানে চলে যেতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী। আর রাজভবনেও ঘরের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, ‘‘কাজের জন্য থাকতে হবে। তার পরে যখনই মনে হবে বা দরকার হবে, বেরিয়ে বাড়ি (কাঁথি) চলে যাব!’’ তবে শুভেন্দুর সংযোজন, ‘‘মানুষ ভোট দিয়ে জিতিয়েছেন, ভয়ের কি আছে! নিরাপত্তার নামে দুর্গ বানিয়ে মানুষের অসুবিধা বা বিরক্তি ঘটানোর কিছু নেই।’’

মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তায় অবশ্য ঝুঁকি নিচ্ছে না পুলিশ-প্রশাসন। এত দিন কেন্দ্রীয় বাহিনীর যে নিরাপত্তারক্ষীরা থাকতেন, তাঁদের পাশাপাশিই দায়িত্ব থাকছে রাজ্য পুলিশের। মুখ্যমন্ত্রীর যাতায়াতের পথেও বিশেষ নজরদারি চলবে। কয়েক দিন আগে শুভেন্দুর ব্যক্তিগত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথ খুন হওয়ার পরে প্রশাসন বাড়তি সতর্ক থাকতে চাইছে।

দায়িত্ব নেওয়ার পরে প্রথম কাজের দিনে মুখ্যমন্ত্রী নবান্নেই যাবেন বলে ঠিক হয়েছে। সেখানে যে হেতু সচিবালয় রয়েছে, সেখান থেকেই প্রশাসনের কাজ চলবে। পাশাপাশি, প্রয়োজনমাফিক যাবেন বিধানসভায়। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, ‘‘মানুষ ভরসা রেখেছেন। এ বার কাজ করতে হবে।’’

আরও পড়ুন