—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
দোকানের হাঁকডাক, লাগাতার গাড়ির হর্নে গমগমে জলপাইগুড়ি শহরের দিনবাজার পুরোনো মসজিদ লাগোয়া এলাকা। রাস্তার আশেপাশে অসংখ্য ছোট চায়ের দোকান। ভিড় ঠেলে এক আদিবাসী দম্পতিকে পেল্লায় ভবিষ্যনিধি ভবনের দিকে এগোতে দেখেই চায়ের দোকানের বেঞ্চ থেকে ধোপদুরস্ত পোশাকের এক ব্যক্তি হাসিমুখে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আগুন্তুক পরিবারকে সটান প্রশ্ন, “পিএফ নিকালনা হ্যাঁ?” অর্থাৎ পিএফের টাকা তুলতে এসেছেন? সম্মতি দিল পরিবারটির। অফিসের পরিবর্তে তাঁদের বসানো হল চায়ের দোকানের বেঞ্চে। জরুরি কাগজপত্রের ছবি মোবাইলে তুলে ওই ব্যক্তি চলে গেলেন অফিসে। আধ ঘণ্টা বাদে ফিরে জানালেন, সাড়ে চার হাজার টাকা দিলেই এক সপ্তাহের আগে পিএফের টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকে যাবে। ডুয়ার্সের রাঙামাটি এলাকার চা বাগান থেকে আসা দম্পতি রাজি হয়ে অফিসে না ঢুকেই ফিরে গেলেন। সোমবার বা মঙ্গলবার নয়, জলপাইগুড়ির আঞ্চলিক পিএফ অফিসের এটাই রোজকারচেনা ছবি।
দম্পতি যদি চায়ের দোকানে ওত পেতে থাকা ‘দালাল’কে টাকা দিতে রাজি না হতেন?
তাহলে কী পরিণতি হয় জানেন জলপাইগুড়ি-আলিপুরদুয়ারের চা শ্রমিকেরা। সেই অভিজ্ঞতাই শোনালেন আলিপুরদুয়ারের চা শ্রমিক কিসনা বরাইক। তিনি বললেন, “গত তিন মাস ধরে পিএফ অফিসে আসছি। কখনও বলা হয় আধার কার্ডে আঙুলের ছাপ মেলে না, কখনও বলে নথিতে বাগানের সই নেই, খালি ঘুরেই যাচ্ছি।” ওই অফিসেই আসা সূরয ওঁরাই বললেন, “আজকে নিয়ে দেড় মাস হয়ে গেল ঘুরছি, টাকা পেলাম না।” ধরণীপুর চা বাগানের শ্রমিক সুশীলা মুর্মু পিএফ অফিসে নথি জমা দিতে এসেছিলেন। নথি জমা দেবেন কী, উনি জানতে পারেন তাঁর পিএফের সব টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। টাকা তোলা হয়েছে তাঁরই মৃত্যুর শংসাপত্র জমা দিয়ে। জলজ্যান্ত সুশীলা মুর্মু বিলক্ষণ টের পেয়েছিলেন পিএফ অফিসের ‘ভুতুড়ে কাণ্ডে’র। একই অভিজ্ঞতা ফুলো মুন্ডারও। বলেন, ‘‘কে আমার পিএফের টাকা তুলে নিল, জানলামও না।’’
কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকা পিএফ অফিসে ‘দালালরাজের’ কথা বলেছেন খোদ বিজেপি সাংসদ মনোজ টিগ্গা। সাংসদের বিস্মিত বক্তব্য, “সব কাগজপত্র ঠিক, তবু শ্রমিকদের বারবার ঘুরতে হয়। কিন্তু দালাল ধরলে জাদুমন্ত্রে টাকা পেয়ে যান। যেখানে জানানোর জানিয়েছি।” তৃণমূল চা বাগান শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি সঞ্জয় কুজুরের অভিযোগ, “দালাল ছাড়া পিএফ অফিসে কোনও কাজই হয় না। অফিসের ভিতরেই দালাল চক্র রয়েছে।” পিএফের জলপাইগুড়ি আঞ্চলিক কমিশনার পবন বনশল বলেন, “অফিসে বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। অফিসে অভিযোগ বাক্স বসানো হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলিকে নিয়ে সচেতনতা শিবির করা হয়েছে। তেমন অভিযোগ এখন নেই।”