—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
নিট-এর প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে বিক্ষোভের মধ্যেই সিবিএসই বোর্ডের নতুন একাধিক সিদ্ধান্তে ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি শিক্ষক-অভিভাবক মহলে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এক দিকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বোর্ড জানিয়েছে, এ বছর জুলাই থেকে নবম শ্রেণিতে তৃতীয় ভাষা বাধ্যতামূলক ভাবে চালু করা হবে। পাশাপাশি চলতি বছরে সিবিএসই বোর্ডের দ্বাদশ শ্রেণির খাতা মূল্যায়নে ভুল হয়েছে বলে বহু অভিযোগের মধ্যেই কর্তৃপক্ষের দাবি, এই ডিজিটাল মূল্যায়ন পদ্ধতি বা ‘অন-স্ক্রিন মার্কিং’ কোনও নতুন ব্যবস্থা নয়।
রবিবার সাংবাদিক বৈঠকে স্কুল শিক্ষা ও সাক্ষরতা বিভাগের সচিব সঞ্জয় কুমার বলেন, “কিছু পড়ুয়ার মনে হয়েছে, তাঁরা যে নম্বর পেয়েছেন, তার চেয়ে বেশি পাওয়া উচিত ছিল। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, অন-স্ক্রিন মার্কিং কোনও নতুন ধারণা নয় এবং এই প্রথমও তা চালু করা হয়নি।” কুমারের দাবি, এ বছরের পরীক্ষায় প্রায় ৯৮ লক্ষ পড়ুয়ার উত্তরপত্র স্ক্যান করা হয়েছে। স্ক্যান করার পর প্রায় ১৩ হাজার উত্তরপত্র ঠিক ভাবে পড়া যাচ্ছিল না। কারণ অনেক পরীক্ষার্থী খুব হালকা রঙের কালি ব্যবহার করেছিলেন। পরে ওই উত্তরপত্রগুলি শিক্ষকদের মাধ্যমে হাতে পরীক্ষা করা হয় এবং প্রাপ্ত নম্বর সিস্টেমে আপলোড করা হয়।
সঞ্জয় কুমার জানান, এর আগে ২০১৪ সালে সিবিএসই এই পদ্ধতি চালু করেছিল। তবে সে সময় প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে তা দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এ বছর দ্বাদশ শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষায় সফল ভাবে ফের এই ডিজিটাল মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। স্ক্যানিং প্রক্রিয়ার সময় তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তাঁর দাবি, “আগে অনেক সময় নম্বর যোগ করার ক্ষেত্রে ভুল হত। এই ব্যবস্থায় সেই ধরনের ভুল সম্পূর্ণ ভাবেবন্ধ হয়েছে।”
ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের অনেকেরই অভিজ্ঞতা অবশ্য তেমন সন্তোষজনক নয়। অসমের এক পড়ুয়ার যেমন অভিযোগ, সে জেইই মেন-এ ৯৯ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে। অথচ দ্বাদশের নম্বর ৭৫ শতাংশেরও কম। এমনিতেই এ বারে সামগ্রিক পাশের হার ৮৫.২ শতাংশে নেমেছে। পড়ুয়া-অভিভাবক-শিক্ষকদের একাংশ এর জন্য ডিজিটাল নম্বর দেওয়ার পদ্ধতিই দায়ী বলে মনে করছেন। নবম-দশমে তৃতীয় ভাষা নিয়েও সিবিএসই বোর্ডের নয়া সিদ্ধান্তে একাধিক স্কুলের শিক্ষক এবং অভিভাবকেরা উদ্বিগ্ন। তাঁদের অভিযোগ, এ সব করে পড়ুয়াদের কার্যত গিনিপিগ বানানো হচ্ছে।
তৃতীয় ভাষার সিদ্ধান্তের ফলে স্কুলগুলোকে মাঝপথেই পাঠ্যক্রম, সময়সূচি এবং ভাষা শিক্ষার কাঠামো বদলাতে হচ্ছে। একাধিক স্কুলের বক্তব্য, এই পরিবর্তনের ফলে ছাত্রদের বিদেশি ভাষা ছেড়ে হঠাৎ নতুন করে একটি ভারতীয় ভাষা শেখা শুরু করতে হবে, যা শিক্ষাবর্ষের মাঝখানে বড় সমস্যা তৈরি করবে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা বোর্ডের ১৫ মে জারি করা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, তিনটি ভাষার মধ্যে অন্তত দু’টি ভারতীয় ভাষা হতে হবে। বাস্তবে উপযুক্ত শিক্ষক এবং পরিকাঠামোর অভাবে বেশির ভাগ স্কুলেই হিন্দি, ইংরেজির পাশাপাশি সংস্কৃতকে প্রধানভাষা হিসেবে বেছে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত দিল্লির এক শিক্ষিকার কথায়, “আমাদের সংবিধান, আদালত সবই ইংরেজিতে চলে। এখন বলা হচ্ছে দু’টি ভাষা ভারতীয় হতে হবে। বাস্তবে এর অর্থ কী?’’ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দ্বারকার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার অভিযোগ, এর ফলে বিদেশি ভাষাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, পড়ুয়া বিনিময়ের মতো বিষয়গুলি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ক্ষতি।
রোহিণী এলাকার এক স্কুলের অধ্যক্ষারও বক্তব্য, বহু স্কুলেই ফরাসি বা স্প্যানিশের মতো বিদেশি ভাষা পড়ানো হত, এখন সেগুলো হঠাৎ করে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। দিল্লি অভিভাবক সংগঠনের সভাপতি অপরাজিতা গৌতম তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, “শিশুদের যেন পরীক্ষার গিনিপিগ বানানো হচ্ছে!”
দ্বাদশের পরীক্ষার ক্ষেত্রে পুনর্মূল্যায়ন ও নম্বর যাচাই সংক্রান্ত কিছু নতুন নিয়ম আজ ঘোষণা করেন সঞ্জয়। তিনি জানিয়েছেন, কোনও পড়ুয়া নিজের উত্তরপত্র দেখতে চাইলে তাঁকে ১০০ টাকা ফি দিতে হবে। উত্তরপত্র যাচাইয়ের জন্যও আলাদা করে ১০০ টাকা লাগবে। এ ছাড়া কোনও নির্দিষ্ট প্রশ্নের নম্বর পুনরায় পরীক্ষা করাতে চাইলে প্রতি প্রশ্নে ২৫ টাকা করে দিতে হবে। তবে পুনর্মূল্যায়ন বা যাচাইয়ের পর যদি কোনও পড়ুয়ার নম্বর বেড়ে যায়, তা হলে তাঁর জমা দেওয়া সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।