—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৫০ অনুযায়ী যে-নির্দেশিকা রাজ্য সরকার জারি করেছে, বকরি ইদের আগে তা ঘিরে কড়াকড়ির জেরে ক্ষতিগ্রস্ত শুধু গরু ব্যবসায়ীরা নন, ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু-মুসলিম দু’সম্প্রদায়েরই মানুষ। প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও।
জবাইয়ের ‘উপযুক্ত’ শংসাপত্র ছাড়া পশু জবাই করা যাবে না— ১৩ মে এমন বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল রাজ্য সরকার। কয়েকটি জনস্বার্থ মামলার পরে একই কথা জানিয়ে দিয়েছে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চও। সরকারি নির্দেশিকার পরেই জেলার বিভিন্ন পশু হাটে গরু- মহিষ কেনাবেচা বন্ধ। বড় হাটগুলিতে ছাগল-ভেড়া ক্রয়-বিক্রয় চললেও, ছোটখাটো হাটগুলিতে পুরোপুরি বন্ধ।
অনুমোদিত কসাইখানা না থাকা, আইনগত জটিলতা, প্রকাশ্যে পশু জবাই নিষিদ্ধ থাকায় বকরি ইদের কুরবানিতে গরু জবাই এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মুসলিম সম্প্রদায়কভুক্তরা। সঙ্কট তৈরি হয়েছে সেখানেই। গরু-মহিষের কারবার করেন মুরারই দাঁতুরা গ্রামের বাসিন্দা মুশারফ শেখ। জেলা ও জেলার বাইরে বিভিন্ন হাট থেকে গরু কেনাবেচা করেন তিনি। মুশারফ বলেন, “ইদের জন্য কেনা দু’টি গরু বিক্রি করতে পারিনি, বিপুল ক্ষতি হল।”
বোলপুরের রূপপুরের গরু ব্যবসায়ী শেখ সাদেক বলেন, “বিভিন্ন হাট থেকে গরু কেনাবেচা করি। ইদের জন্য বেশ কিছু গরু কিনে পালন করছিলাম সেই কার্তিক মাস থেকে। কিন্তু এবার বিক্রি হল না, যেগুলি বিক্রি করেছি, তাও ফেরত আসবে।”
জেলার গরু ব্যবসায়ীদের একাংশের মতে, কাজটা ঠিক হল কি। পাচার বন্ধ হোক, কারও যেন সমস্যা না হয় সেটি দেখা হোক। কিন্তু এ ভাবে কারবার পুরো বন্ধ করলে ক্ষতি তো সকলেরই। শুধু মুসলিম নন, হিন্দুরাও সমস্যায় পড়েছেন। গরু হিন্দু ও আদিবাসীরা প্রতিপালন করেন। এই চাষের মরসুমে বলদ কেনাবেচা হয়, বন্ধ সেটিও।
কীর্ণাহার দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা হরি মেটে, মেলেপাড়ার সামু মেটে, নাগডিহিপাড়ার নিখিল মেটে গরু পোষেন। প্রতিবার ইদে অতিরিক্ত লাভ হলেও এবার সে সুযোগ হয়নি। তাঁরা জানান, এ বার ইদে কোনও চাহিদাই নেই। ইদের সময় পোষা গরু বিক্রি করবেন বলে স্থির করেছিলেন রাজনগরের ভবানীপুর এলাকার বাসিন্দা এক আদিবাসী মহিলা পুষ্প হাঁসদা। বেশ কিছুদিন চেষ্টা করেও গরু বিক্রি করতে না পেরে হতাশ তিনি।
ইলামবাজারের সুখবাজারের পশুহাটের ব্যবসায়ী শেখ জসিমউদ্দিন, সাদ্দাম শেখ, মুজিবুর রহমান জানান, কুরবানির সময় বাজার যথেষ্ট ভাল থাকে। কিন্তু সরকারের কড়াকড়িতে গত দু’সপ্তাহে গরুর ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ। হিন্দুদের অনেকেরই কারও মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসা, দেনার কারণে এ সময় হাটে আসেন গরু বিক্রি করতে। সকলেরই ক্ষতি।
মুরারই ২ ব্লকের গরু ব্যবসায়ী আনন্দ মাল বলেন, “পাইকর, হিয়াতনগর হাটে বসতাম। বংশ পরম্পরায় এই ব্যবসা। এক বছরের ইদ চলে যাওয়ার পরে হাট থেকে কম দামে গরু কিনে পুষে পরের বছরে বিক্রি করতাম। এ বার তা হল না। সংসার চালানো কঠিন হচ্ছে।” মুরারইয়ের বর্ষাপুকুরের বাসিন্দা কেতাবুল শেখ বলেন, “গত দশ বছর গরুর ব্যবসা করছি। এই অবস্থা চললে ভিন্ন পেশা নিতে হবে।”