বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণনা কেন্দ্রের বাইরে সুব্রত দত্ত। নিজস্ব চিত্র ।
তাঁদের দাপটে এলাকায় টুঁ শব্দ করার সাহস পেতেন না বিরোধী দলের কর্মীরা। সাধারণ মানুষও সমঝে চলতেন। তবে ভোটের ফল বেরনোর পরে রাতারাতি বদলে গিয়েছে পরিস্থিতি। তৃণমূলের সেই সব দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতাদের এখন আর পাত্তা নেই। দলের কর্মীদের একাংশ জানাচ্ছেন, ফোনেও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এই দুর্দিনে আচমকা মাথার ‘ছাতা’ হারিয়ে বিপাকে কর্মীরা।
২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পরেই পাত্রসায়রে দাপট শুরু তৃণমূল নেতা সুব্রত দত্ত ওরফে গোপে-র। বিরোধী রাজনৈতিক দলের কর্মীদের মারধর, তাঁদের দলীয় অফিসে হামলা, দলেরই এক ছাত্র নেতাকে ঘরছাড়া করার মতো একাধিক অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে তৃণমূলের বিষ্ণুপুর সাংগঠনিক জেলার সভাপতি হন সুব্রত। পরে ওন্দা কেন্দ্রে দল তাঁকে প্রার্থীও করে। তাঁর হয়ে ভোট প্রচারে এসেই গণনার দিন রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে ডিজে বাজানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।
তবে ভোট-বাক্সের ফল বিরুদ্ধে যেতেই এলাকায় সুব্রতের আর দেখা মিলছে না বলে জানাচ্ছেন কর্মীরা। পাত্রসায়রে সুব্রতের এক ঘনিষ্ঠের দাবি, “দাদা এখন গাঢাকা দিয়ে রয়েছেন। পরিস্থিতি শান্ত হলে এলাকায় ফিরবেন।” এ দিকে, বিষ্ণুপুরের এক তৃণমূল কর্মীর আক্ষেপ, “হঠাৎ করেই দল ক্ষমতা হারাল। বিজেপির লোকজন নানা হুজ্জুতি করছে। জেলা সভাপতিকে ফোনে পাচ্ছি না। কার কাছে যে সাহায্য চাইব, বুঝতে পারছি না।”
বাঁকুড়া শহরের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল পুর-প্রতিনিধি পিঙ্কি চক্রবর্তীর স্বামী পীযূষ চক্রবর্তী ওরফে বাপির বিরুদ্ধেও অতীতে নানা গা-জোয়ারির অভিযোগ উঠেছে। গত লোকসভা নির্বাচনে এলাকায় দল হেরে যাওয়ায় ওয়ার্ডে জল, আলো পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। যদিও পীযূষ তা মানেননি। এ বারে ভোট গণনার দিন থেকে তাঁকেও এলাকায় দেখা যাচ্ছে না বলে জানাচ্ছেন কর্মীরা। স্থানীয় এক কর্মীর কথায়, “গণনার পরে থেকে দাদাকে ফোনে পাচ্ছি না। শুনছি অন্য রাজ্যে গাঢাকা দিয়েছেন। আমাদের যে কী হবে!”
একই পরিস্থিতি ইঁদপুরেও। সেখানকার ব্লক তৃণমূল সভাপতি রেজাউল খানের দাপটে এলাকার মানুষজন মুখ খুলতে সাহস পেতেন না বলে অভিযোগ ছিল। প্রায়ই প্রকাশ্য সভা থেকে উস্কানিমূলক মন্তব্য করার পাশাপাশি বিরোধীদের হুমকিও দিতেন। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, রেজাউল গণনার দিন সকালে খাতড়া আদিবাসী মহাবিদ্যালয়ের স্ট্রংরুমে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেননি। তিনিও গাঢাকা দিয়েছেন বলে দাবি। বৃহস্পতিবার রাতে ফোনে দাবি করেন, ‘‘বাড়িতেই আছি।’’ খোঁজ নেই ‘ভোটের পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হিসাব নেওয়া’-র হুমকি দেওয়া তালড্যাংরা ব্লক তৃণমূল সভাপতি পার্থসারথি মাকুড়ের। বিজেপির প্রচার-সভায় যাওয়া কর্মীদের গাড়ি ভাঙচুরেও নাম জড়িয়েছিল তাঁর। ফল ঘোষণার পরে থেকে পার্থসারথিও এলাকা থেকে হাওয়া। যদিও ফোনে জানালেন, দলের কর্মীদের সঙ্গে আপাতত দূরভাষেই যোগাযোগ রাখছেন।
যদিও বাঁকুড়ার তৃণমূল সাংসদ অরূপ চক্রবর্তীর আশ্বাস, “নিচুতলার কর্মীদের চিন্তার কারণ নেই। দল তাঁদের পাশে রয়েছে। এই মুহূর্তে একটা অরাজক পরিস্থিতি চলছে। আমরা রাজনৈতিক ভাবে এর মোকাবিলা করব।” পাল্টা বিজেপির বাঁকুড়া সাংগঠনিক জেলা সভাপতি প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় বলেন, “তৃণমূলের যে সব নেতারা এত দিন অত্যাচার চালিয়েছেন, তোলাবাজি করেছেন, সাধারণ মানুষের অধিকার কেড়েছেন, তাঁরাই ভয়ে পালিয়েছেন। এর পিছনে দলের কোনও হাত নেই।”
সহ প্রতিবেদন: তারাশঙ্কর গুপ্ত ও শুভেন্দু তন্তুবায়