ED-Mamata Banerjee

আমলাদের উপস্থিতি ঘিরে প্রশ্ন প্রশাসনেই

শুক্রবার দলীয় রাজনৈতিক সভা থেকে মমতা বলেছেন, “আমি যা করেছি, তৃণমূলের চেয়ারম্যান হিসাবে।”

নিজস্ব সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৫৬
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। — ফাইল চিত্র।

এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) অভিযানে সময়ে মুখ‍্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পৌঁছে গিয়েছিলেন তৃণমূলের ভোট কুশলী সংস্থা আইপ‍্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাসভবন এবং অফিসে। তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়েছে ইতিমধ্যেই। কিন্তু ওই বেসরকারি সংস্থার অফিসে রাজ্য সরকারেরই শীর্ষ আমলাদের একাংশের উপস্থিতি প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক মহলে তৈরি করেছে আরও নতুন একটি বিতর্ক। এ নিয়ে একযোগে সরব হয়েছেন সব বিরোধী। প্রশ্ন উঠছে, রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে প্রশাসন জুড়ে যাচ্ছে কী ভাবে! সরাসরি এমন ঘটনার উদাহরণ অতীতে তেমন একটা দেখা যায়নি।

ঘটনাচক্রে, শুক্রবার দলীয় রাজনৈতিক সভা থেকে মমতা বলেছেন, “আমি যা করেছি, তৃণমূলের চেয়ারম্যান হিসাবে।”

বৃহস্পতিবারের ওই ঘটনায় সল্টলেক সেক্টর ফাইভে আইপ‍্যাকের অফিসে দেখা গিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর প্রধানসচিব গৌতম সান‍্যালকে। সঙ্গে দেখা গিয়েছিল রাজ্যের নতুন মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকেও। এখানেই প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা। অভিজ্ঞ আমলাদের অনেকেই জানাচ্ছেন, সর্বভারতীয় স্তরে কর্মরত এক জন আইএএস অফিসারকে কিছু বিধি-নিয়ম মেনে চলতে হয়। তিনি সরকারের যে কোনও অনুষ্ঠানে থাকতে পারেন অবশ্যই। তবে শাসক দলের রাজনৈতিক কোনও কর্মসূচিতে তাঁদের থাকা বিধিসম্মত নয়। আবার কেন্দ্রীয় সংস্থা হিসেবে ইডি-র অভিযান ছিল বেসরকারি ওই সংস্থার অফিসে। সেখানেও এমন পদাধিকারীর পৌঁছে যাওয়া তাঁদের পেশার শর্তের সঙ্গে মানানসই নয়। অতীতে রাজীব কুমারের (বর্তমানে রাজ্য পুলিশের ডিজি) বাড়িতে যখন সিবিআই-হানা হয়েছিল, তখনও ধর্মতলায় ধর্না দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। সেই কর্মসূচিতে কয়েক জন পুলিশকর্তাকে দেখা গেলেও, দেখা যায়নি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব বা মুখ্যসচিবকে।

এক আমলার কথায়, “পুলিশ সাধারণত আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে তাঁরা বলতেই পারেন, সেই উপস্থিতি আইনশৃঙ্খলা সামলানোর স্বার্থে। তাকে যুক্তিযুক্ত হিসেবে ধরে নেওয়া যায় তখনও। আবার অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের ক্ষেত্রেও বিধি ততটা কড়া না থাকলেও, উপস্থিতি মানানসই হয় না। কিন্তু, সিভিল প্রশাসনের কর্মরত শীর্ষ কোনও আধিকারিকের কাছে সেই যুক্তি নেই।”

অবশ্য, আধিকারিকদের কেউ কেউ এ কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে বৃহস্পতিবারই মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, আইপ‍্যাক তাঁর দলের সঙ্গে যেমন কাজ করছে, তেমনই সরকারেরও অনেক কাজ করে। ফলে ওই ঘটনায় আইপ‍্যাকের উপরে প্রশাসনিক সমর্থনও প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন তিনি। তাই গৌতম, নন্দিনীকে সেখানে থাকতে হয়েছিল। প্রতিক্রিয়া জানার জন্য এ দিন দু’জনকে ফোন করা হলেও তাঁরা ফোন ধরেননি। উত্তর দেননি মোবাইলে পাঠানো বার্তারও।

তবে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে সব বিরোধী দলই। তাদের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থে পদক্ষেপ করলেও সরকারি আমলারা কেন তাতে শামিল হবেন! বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের মতে, ‘‘এটা ‘গ্রেট ভায়োলেশন অব সার্ভিস রুল’ এবং সাংবিধানিক নিয়ম, রীতি, কাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করবে কি না, সেটা আমরা বলতে পারব না। কারণ, আমাদের দল এবং সরকার আলাদা।’’ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “পুলিশ কর্তব্যরত অবস্থায় থাকার নিয়মমাফিক পোশাক পরে ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী বিধাননগর পুলিশের অপব্যবহার করেছেন। এটা এক ধরনের গুন্ডামি।”

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘ঘটনাটি গোটা প্রশাসনকে কলুষিত করেছেন। প্রশাসনের কর্তারা নিয়মকানুন, নীতি-শিষ্টাচার কোনও কিছুর বালাই রাখবেন না? মুখ্যমন্ত্রী নিজে ডুবছেন, প্রশাসনকেও ডোবাচ্ছেন!’’ প্রদেশ কংগ্রেসের সম্পাদক ও মুখপাত্র সুমন রায়চৌধুরীর মন্তব্য, ‘‘আজকাল কি প্রশাসকেরা পুলিশের নিরাপত্তায় বিশ্বাস রাখতে পারছেন না? মুখ্যমন্ত্রীকে আমলাদের নিয়ে যেতে হচ্ছে কেন? কোনও কাজই তো আইনি নয়!’’

তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ পাল্টা বলেন, “এটা দলের ঘোষিত কর্মসূচি তো ছিল না। আগে থেকে কিছু ঠিক ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী দলনেত্রী হিসেবে দলের তথ্যভান্ডার আগলাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু শীর্ষ আমলারা তো আর সেটা জানবেন না। তাঁরা শুনেছেন মুখ্যমন্ত্রী বেরিয়েছেন, ফলে স্বাভাবিক ভাবে তাঁরাও ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু তাঁরা এই প্রক্রিয়ার মধ্যে কখনও ছিলেন না।”

আরও পড়ুন