—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
এমনটা হতে চলেছে ভাবা যায়নি গত ডিসেম্বরে খসড়া তালিকা প্রকাশের পরেও। এ রাজ্যের সংখ্যালঘুদের মধ্যে বড় অংশই অন্তত বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর আতশ কাচে নিজেদের অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত বলেই ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু ছবিটা পাল্টে গিয়েছে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে। তাতে মুর্শিদাবাদ জেলায় নাম বাদ গিয়েছে ১৪,৯৮৫ জনের। ‘বিবেচনাধীন’ অন্তত ১১,২১,২০৫ জন। সূত্রের খবর, নাম বাদ এবং ‘বিবেচনাধীন’ থাকার নিরিখে সংখ্যালঘু প্রধান জেলা মুর্শিদাবাদ রাজ্যের মধ্যে এগিয়ে।
২০০২-এর তালিকার সঙ্গে যোগসূত্রহীন ভোটারের সংখ্যা গোটা রাজ্যে ৩.৯৯ শতাংশ বলে সামাজিক ন্যায় ও সংখ্যালঘুদের অধিকার বিষয়ক গবেষণা সংস্থা সবর ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণে উঠে আসে। তখন দেখা যায়, রাজ্যের মুসলিম প্রধান বিধানসভা কেন্দ্রগুলির বেশির ভাগেই ২০০২এর সঙ্গে যোগসূত্রহীন ভোটার নগণ্য। অনেক কেন্দ্রে তা এক শতাংশেরও কম। তখন বরং মতুয়া প্রধান উত্তর ২৪ পরগনা, নদিয়ার সীমান্ত ঘেঁষা কিছু কেন্দ্রে ওই যোগসূত্রহীন বা আনম্যাপড ভোটারের শতাংশ অনেক বেশি বলে দেখা যায়। গাইঘাটা, বাগদা, কল্যাণী, বনগাঁয় ১১-১৫ শতাংশের কাছাকাছি ভোটারেরই ২০০২এর তালিকায় যোগসূত্র ছিল না।
শুধু কলকাতার কিছু কেন্দ্র যেখানে ভিন রাজ্যের বাসিন্দারাও অনেকে ভোটার তালিকায় রয়েছেন, যেমন ৫৩ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটারের কলকাতা বন্দর বা ৬৫ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটারের মেটিয়াবুরুজ, ছবিটা খানিকটা অন্য রকম ছিল। যোগসূত্রহীন ভোটারের হার এই দু’টি কেন্দ্রে ছিল যথাক্রমে ১২.০১ শতাংশ এবং ৭.২২ শতাংশ। কোনও জাদুবলে ছবিটা পাল্টে গিয়েছে শনিবারের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরে।
৮০-৯০ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার প্রথম পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্র হল সুজাপুর, সমসেরগঞ্জ, রঘুনাথগঞ্জ, লালগোলা এবং ভগবানগোলা। এই পাঁচটি কেন্দ্রের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পরে যোগসূত্রহীন এবং বিবেচনাধীনের হারে কার্যত উলটপুরাণ ঘটে
গিয়েছে। সবর ইনস্টিটিউটের অশীন চক্রবর্তী, সাবির আহমেদরা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছেন, সুজাপুরের ক্ষেত্রে যোগসূত্রহীন ভোটারের শতাংশ ০.৫৮ থাকলে এখন বিবেচনাধীন ভোটারের হারে তা ৫২.৪৯ শতাংশ। একই ভাবে ৪০-৪৫ শতাংশ বিবেচনাধীন ভোটার রয়েছে সমসেরগঞ্জ, রঘুনাথগঞ্জ, লালগোলা এবং ভগবানগোলায়।
মালদহের সুজাপুর বিধানসভার ‘বিবেচনাধীন’ ভোটার আলমগীর খান বলেন, ‘‘তালিকায় বাবা-মায়ের নাম রয়েছে। শুনানিতে পাসপোর্ট, বিএলওর ডিক্লারেশন, পঞ্চায়েতের হলফনামা দিয়েছি। বিবেকহীন নির্বাচন কমিশন।’’ মালদহ জেলায় ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের সংখ্যা ৮ লক্ষ ২৮ হাজার ৮০ জন। এর মধ্যে বেশিরভাগই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী তজমুল হোসেনের নামও বিবেচনাধীনে।
কলকাতা ঘেঁষা মেটিয়াবুরুজে ৩৪.৬৫% এবং কলকাতা বন্দরে ১৮.০১% ভোটার বিবেচনাধীন তালিকায় রয়েছেন। খিদিরপুরের বাসিন্দা ৭০ ছুঁই ছুঁই মহম্মদ ইশতিয়াক এ শহরেই জন্মেছেন। ২০০২এর ভোটার তালিকায় তাঁর নামের বানানে সামান্য বিভ্রান্তি ছিল। এর পরে শুনানিতে পাসপোর্ট দেখালেও তিনি বিবেচনাধীনই থেকে গিয়েছেন। ইশতিয়াকের স্ত্রী নুসরাতুন নিসার নাম ভোটার তালিকায় ঠিকঠাকই রয়েছে। এই দম্পতির পুত্র আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মহম্মদ রেয়াজ় বললেন, ‘‘আমার ২০০২এ ভোটের বয়স হয়নি। মায়ের নামের সূত্র ধরে আমি এ বার এনুমারেশন ফর্ম ভরি। আমাদের চার ভাই প্রয়োজনীয় নথি দেখালেও সবার নাম বিবেচনাধীন। পুরোটাই অদ্ভুত লাগছে!’’
পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলিমদের বড় অংশই কয়েক পুরুষ ধরে পশ্চিমবঙ্গবাসী। সেই তাঁদের নাম বিবেচনাধীন তকমা পাওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠছে। মুসলিমদের বেশির ভাগ নামে শেখ বা মহম্মদ থাকায় নামের বানানের সামান্য গরমিল ধরে অনেককেই খামোখা হেনস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
তালিকায় ‘বিবেচনাধীন’ বহরমপুরের কর্ণসুবর্ণের ভোটার মতিউর রহমানের ক্ষোভ, ‘‘২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার নাম ছিল। আমার নাম ও পদবির মাঝখানে ‘স্পেস’ ছিল না। তাই শুনানিতে ডাক পড়ে। সমস্ত বৈধ নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও আমার নাম বিবেচনাধীন কেন জানি না।’’
সংখ্যালঘু প্রভাবিত উত্তর দিনাজপুরে জেলায় বিবেচনাধীন ভোটারের সংখ্যা ৪ লক্ষ ৮০ হাজার ২৮০ জন। জেলার মধ্যে সব থেকে বেশি সংখ্যালঘু-প্রবণ গোয়ালপোখর বিধানসভায়। রাজ্যের মন্ত্রী গোলাম রব্বানির নামও তালিকায় বিবেচনাধীন। সেখানে বিবেচনাধীন ভোটারের সংখ্যা ৭৮ হাজার ৪৭১ জন।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় ১ লক্ষ ৩২ হাজারের কিছু বেশি মানুষের নাম বিবেচনাধীন তালিকায়। হরিরামপুর বিধানসভার ‘বিবেচনাধীন’ ভোটার মিরাজ ইসলাম বলেন, ‘‘আমরা চার ভাই-বোন। বাবার নামে নাকি ছ’জন ম্যাপিংয়ের জন্য দেখিয়েছে। এ সব উল্টোপাল্টা যুক্তি দিচ্ছে!”
এই পরিস্থিতির জন্য তৃণমূল, কংগ্রেস এবং সিপিএম কিছুটা এক সুরেই নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপিকে বিঁধছে। তৃণমূলের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সভাপতি সুভাষ ভাওয়াল বলেন, “ইচ্ছে করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেশির ভাগকে বিবেচনাধীন করা হয়েছে।” সোমবার মুর্শিদাবাদের ব্লকে ব্লকে বিক্ষোভে নামছে সিপিএম। সিপিএমের জেলা সম্পাদক জামির মোল্লা বলেন, ‘‘সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম বাদ গেলে বিজেপির সুবিধে হবে ভেবেই এটা করা হয়েছে।” ’’ মালদহ জেলা কংগ্রেস সভাপতি ইশা খান চৌধুরীও এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ। বিজেপির মালদহ উত্তরের সাংসদ খগেন মুর্মু বলেন, ‘‘বৈধ ভোটারদের নাম অবশ্যই চূড়ান্ত তালিকায় থাকবে।” তবে মুর্শিদাবাদের কংগ্রেস সভাপতি মনোজ চক্রবর্তী বলেন, “রাজ্যের শাসক দলও এর জন্য দায়ী।”