প্রণামের সদস্যদের সঙ্গে নগরপাল সুপ্রতিম সরকার। শনিবার, সুভাষ সরোবরে। —নিজস্ব চিত্র।
কেউ জানালেন, সাইবার জালিয়াতের খপ্পরে পড়ে ৫৪ হাজার টাকা খুইয়েও দ্রুত পুলিশে যোগাযোগ করায় এক সপ্তাহের মধ্যে টাকা ফেরত পাওয়ার কথা। কেউ আবার ১৩০০ টাকা প্রতারকদের দিয়ে দেওয়ার পরে নিজের বোকামির কথা ভেবে পুলিশে না যাওয়ার কথা জানালেন। কেউ কেউ বললেন, ‘‘এখনও খপ্পরে পড়িনি, কিন্তু কবে পড়তে হয়, ভেবে ভয়ে ভয়ে আছি!’’ শনিবার সকালে কলকাতা পুলিশের ‘প্রণামের আড্ডা’য় শহরের প্রবীণ নাগরিকদের মধ্যে থেকে উঠে এল এমনই নানা অভিজ্ঞতার কথা। এ দিনই প্রথম বেলেঘাটার সুভাষ সরোবর চত্বরে কলকাতা পুলিশ রোয়িং অ্যাকাডেমিতে ‘প্রণাম’ প্রকল্পের সদস্য প্রবীণদের নিয়ে আড্ডার আয়োজন করেছিল কলকাতা পুলিশ। আগামী দিনে এমন একাধিক আড্ডা শহরের নানা অংশে করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
এ দিন সকাল সওয়া ১০টা নাগাদ এই আড্ডায় উপস্থিত হন নগরপাল সুপ্রতিম সরকার। সেখানে তাঁর অপেক্ষায় ছিলেন ইস্টার্ন সাবার্বান ডিভিশনের (ইএসডি) বিভিন্ন থানা এলাকার প্রবীণেরা। ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ গানটি সমস্বরে গেয়ে আড্ডা শুরু হয়। এর পরে নগরপাল বলেন, ‘‘পুলিশের সঙ্গে যাতে শুধু জরুরি প্রয়োজনে নয়, একটা আত্মিক সম্পর্কও গড়ে ওঠে, সেই কারণেই এই আড্ডার পরিকল্পনা। এটা অস্বীকার করে লাভ নেই, পুলিশের সঙ্গে সাধারণ ভাবে মেলামেশার ক্ষেত্রে সব স্তরের মানুষের মধ্যেই একটা সঙ্কোচ থাকে। সম্পর্কটা যাতে আর একটু আত্মিক করা যায়, সকলে মিলে যদি মাসে এক দিন বা দু’দিন বসে গল্প করা যায়, তা হলে ভাল হয়। আমি বিশ্বাস করি, শুধু সিসি ক্যামেরা বা নজরদারি বাড়ালেই নিরাপত্তা হয় না। নিরাপত্তার বোধ আসে পারস্পরিক সংযোগ এবং পুলিশের উপরে বিশ্বাস থেকে। পুলিশের প্রতি এই বিশ্বাসটা যাতে আরও মজবুত হয়, তাই এই উদ্যোগ।’’
এর পরে সাইবার অপরাধের প্রসঙ্গ তুলে সুপ্রতিম জানান, ২০০৯ সালে তিনি যখন দক্ষিণ কলকাতার ডিসি, সে সময়ে বালিগঞ্জ থানায় ‘প্রণাম’ প্রকল্পের সূচনা হয়। বর্তমানে শহরের প্রায় ২৫ হাজার প্রবীণ প্রণামের সদস্য। এ দিন সাইবার জালিয়াতির প্রসঙ্গে সুপ্রতিম জানান, গত বৃহস্পতিবারই বেহালা থানা এলাকার বাসিন্দা, এক মহিলা জালিয়াতদের ফোন পান। তাঁকে ডিজিটাল গ্রেফতারির হুমকি দেওয়া হয়। বলা হয়, তাঁর মুম্বই নিবাসী ছেলে অস্ত্র নিয়ে ধরা পড়েছেন। বিশ্বাস করে নেওয়ার মতো একাধিক কাগজ দেখিয়ে তাঁকে টাকা পাঠাতে বলা হয়। পুলিশে ফোন করে মহিলা তৎক্ষণাৎ সাহায্য পান। সুপ্রতিমের কথায়, ‘‘নানা ফন্দিফিকির করে মানুষকে ফাঁদে ফেলা হয়। বিশ্বাস নিয়ে খেলা হয়। ডিজিটাল গ্রেফতারি বলে কিছু হয় না। কোনও দিন ছিলও না।’’ পুলিশের তরফে সদ্য প্রকাশিত সাইবার সচেতনতা পত্রিকা ‘সাইবার পাস’ তুলে দেওয়া হয় উপস্থিত প্রবীণদের হাতে। প্রবীণেরা নগরপালের সঙ্গে ছবিও তোলেন।
বেরিয়ে যাওয়ার মুখে সুপ্রতিম বলেন, ‘‘আমাদের মনে হয়েছে, নিয়মিত জনসংযোগ বাড়ানো দরকার। প্রণাম প্রকল্পের পরিসর আরও বাড়ানো উচিত। সন্তানেরা বাইরে, অনেকেই একা থাকেন। যদি তাঁরা সমমনস্ক কিছু মানুষের সঙ্গে একসঙ্গে বসতে পারেন, তা হলে একাকিত্ব কিছুটা কমবে, মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি হবে। ভাষণ বা লেকচার দিয়ে, লিফলেট বিলি করার থেকে গল্পের মাধ্যমে আড্ডার ছলে কিছু বললে সেটা বেশি করে মনে থাকে। আজ সাইবার অপরাধ নিয়ে গল্প হল, পরের দিন হয়তো প্রবীণদের সঙ্গে হওয়া অন্য কোনও অপরাধ নিয়ে কথা বলব।’’