Government Hospitals Of West Bengal

বিভাগ আছে, নেই ডাক্তার, বদলির গেরোয় চিকিৎসা

রেফার রোগ আছেই। সঙ্গে কর্কট রোগের মতো ছড়িয়েছে দুর্নীতি। স্বাস্থ্যে অস্বাস্থ্য, লিখছেন শান্তনু ঘোষ।

শান্তনু ঘোষ
শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:০৮

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

চিত্র-১: কার্ডিয়ো থোরাসিক অ্যান্ড ভাস্কুলার সার্জারি বিভাগ রয়েছে। বছর তিনেক আগে এক জন শিক্ষক চিকিৎসকের পোস্টিংও হয়েছিল। কিন্তু দিন কয়েক পর থেকে তিনি আর সেখানে যাননি। তার পর নতুন করে আর কারও পোস্টিংও হয়নি। বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজে খাতায়-কলমে পড়ে রয়েছে ওই সুপার স্পেশ্যালিটি বিভাগটি।

চিত্র-২: নেফ্রোলজি বিভাগ আছে, সেখানে রয়েছেন এক জন শিক্ষক-চিকিৎসক এবং এক জন পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজিস্ট। কিন্তু নেই কোনও নেফ্রোলজি ওয়ার্ড। অগত্যা উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে কিডনির সমস্যা নিয়ে আসা প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের মেডিসিন এবং বাচ্চাদের শিশু রোগ বিভাগে ভর্তি হতে হয়। সেখানে গিয়েই রেফার রোগী দেখেন ওই দুই চিকিৎসক। কিন্তু কোনও রেসিডেন্ট ডক্টর না থাকার ফলে প্রতিনিয়ত রাউন্ড দেওয়া সম্ভব হয় না।

চিত্র-৩: দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের কাছে সিঙ্গুরে চালু হয়েছিল লেভল-থ্রি স্তরের ট্রমা কেয়ার সেন্টার। কোভিডের সময় বন্ধ থাকলেও ২০২৩ থেকে সেটিকে নতুন ভাবে চালুর সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য দফতর। ঠিক হয়েছিল, যে সমস্ত অস্ত্রোপচার পরে করানোর (কোল্ড ওটি) জন্য দুর্ঘটনাগ্রস্তেরা এসএসকেএমে যান, তাঁদের সুবিধার জন্য সিঙ্গুরে এসে অস্ত্রোপচার করবেন এসএসকেএমের চিকিৎসকেরা। কিন্তু এখনও ওই ট্রমা কেয়ার সেন্টারে কোনও চিকিৎসাই মেলে না।

চিত্র-৪: খাস কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে নেফ্রোলজি বিভাগ চলছে সিনিয়র রেসিডেন্ট ও চুক্তিভিত্তিক কনসালট্যান্ট দিয়ে। তিন বছর আগে এক শিক্ষক চিকিৎসককে অন্যত্র বদলি করার পরে আর কোনও চিকিৎসক মেলেনি। অগত্যা ডিএম কোর্স চালুরও উপায় নেই।

রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এমন অব্যবস্থা ও অভিযোগের খণ্ড চিত্র অসংখ্য। যদিও গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর অনেক উন্নয়ন করা হয়েছে বলে দাবি রাজ্য সরকারের। নতুন বিল্ডিং, নতুন বিভাগ তৈরি, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার মতো পরিকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিভিন্ন প্রকল্পের কথা মানছে শাসক-বিরোধী গোষ্ঠীর চিকিৎসক সংগঠনগুলিও। কিন্তু সেই পরিকাঠামো ব্যবহার বা কাজে লাগানোর সদিচ্ছা কতটা? খোদ স্বাস্থ্য শিবিরের অন্দরের আক্ষেপ, হাসপাতাল স্তর থেকে স্বাস্থ্যভবন, সর্বত্রই একাংশের ঢিলেঢালা মনোভাবে বার বার ধাক্কা খাচ্ছে গোটা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। তাতে ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

আসন্ন বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্য সরকারের প্রকাশিত উন্নয়নের খতিয়ানে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, ২০১১ সালের তুলনায় জনস্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় ছ’গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আবার বৃহস্পতিবার রাজ্যের অন্তর্বর্তিকালীন (কার্যত পূর্ণাঙ্গ) বাজেটে দাবি করা হয়েছে, ২০১০-’১১ সালের তুলনায় ২০২৬-’২৭ অর্থবর্ষে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ ২৪.৫ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসাথী থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে ঢালাও উন্নয়নের খতিয়ান প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু এত টাকা যেখানে খরচ করা হচ্ছে, এত উন্নয়নের দাবি করার পরেও রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে এত প্রশ্ন কেন? খোদ শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বকেই বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে শুনতে হচ্ছে, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই। কোথাও আবার অভিযোগ, সমস্ত পরীক্ষা ঠিক মতো হয় না!

সরকারি চিকিৎসকদেরই একাংশ জানাচ্ছেন, পরিকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে জেলা থেকে মেডিক্যাল কলেজ স্তরে প্রচুর অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে। কিন্তু রোগী স্বার্থে সেগুলি ব্যবহার করার জন্য বহু জায়গাতেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক বা টেকনোলজিস্ট নেই। আর, যেখানে তা আছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে গয়ংগচ্ছ মনোভাব। ফলে বহু মেডিক্যাল কলেজেই দামি যন্ত্রপাতি দিনের পর দিন স্রেফ পড়ে রয়েছে। এখানেই বড়সড় প্রশ্নের মুখে স্বাস্থ্য দফতর। শুধু যন্ত্রপাতি কিনে তা হাসপাতালে পাঠিয়েই কি দায়িত্ব শেষ স্বাস্থ্যভবনের?

খোদ চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, মেডিক্যাল কলেজ বা হাসপাতালে থাকা যন্ত্রপাতি আদৌ কতটা ব্যবহার করা হচ্ছে, তা দিয়ে দৈনিক বা সাপ্তাহিক কত জন রোগী পরিষেবা পেলেন, তার কোনও হিসাব কখনও জানতে চায় না স্বাস্থ্যভবন। এক সিনিয়র শিক্ষক-চিকিৎসকের কথায়, “অন্যান্য বিষয়ের মতো যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অডিট করা প্রয়োজন। তা হলেই বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হবে।”

তবে যত দিন যাচ্ছে, সরকারি হাসপাতালে যুক্ত চিকিৎসকদের কাজের প্রতি আগ্রহ কমছে বলেও জানাচ্ছেন খোদ চিকিৎসকদেরই বড় অংশ। কারণ হিসেবে তাঁরা তুলে ধরছেন সরকারি উদাসীনতা ও স্বজনপোষণকে। শাসক ঘনিষ্ঠ বা বিরোধী, উভয় শিবিরের চিকিৎসকেরাই দাবি করছেন, আগে বছরে অন্তত দু’বার পদোন্নতির ইন্টারভিউ হত। কিন্তু সেটাই এখন চূড়ান্ত অনিয়মিত হয়ে গিয়েছে। ফলে কোনও কোনও চিকিৎসক ১২ বছর ধরে আরএমও পদে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে একাধিক মেডিক্যাল কলেজে স্থায়ী অধ্যক্ষ নেই।

বদলি নীতিতেও অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলছেন চিকিৎসকেরা। বছরের পর বছর ধরে একই জায়গায় পোস্টিং। জেলার এক মেডিক্যাল কলেজের এক শিক্ষক চিকিৎসকের কথায়, “প্রায় সাত বছর ধরে একই জায়গায় রয়েছি। বহু বার আবেদন করেও লাভ হয়নি। এ দিকে বাড়িতে অসুস্থ বাবা-মা রয়েছেন।” বহু চিকিৎসকই আবার জানাচ্ছেন, বার বার বলেও ফল না মেলায় এখন তাঁরা বদলির আবেদন করা বন্ধ করে দিয়েছেন।

স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম বলেন, “স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর প্রচুর উন্নয়ন করা হয়েছে। তবে এটা ঠিক, সুপার স্পেশালিটি বিষয়ে চিকিৎসকের সংখ্যা কম রয়েছে। তাই সব জায়গায় সমান ভাবে পরিষেবায় সমস্যা রয়েছে।” তবে তিনি জানান, প্রায় দু’-তিন বছর পরে আবারও চিকিৎসক নিয়োগ শুরু হয়েছে। তেমনই স্বাস্থ্য-শিক্ষায় আসন সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে, যাতে আগামী দিনে সুপার স্পেশালিটি বিষয়ে চিকিৎসক না থাকার সমস্যা পুরোপুরি মিটে যায়। স্বাস্থ্যসচিবের দাবি, “যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে না— এটা ঠিক নয়। এখন অনলাইনের মাধ্যমে সব হিসাব রাখা হচ্ছে।” বদলি নীতিতেও অস্বচ্ছতা নেই বলেই দাবি স্বাস্থ্য-কর্তাদের।

স্বাস্থ্য প্রশাসনের দাবি মতো বাইরে থেকে ঝাঁ চকচকে মনে হলেও স্বাস্থ্য প্রশাসনের অন্দরের বিভিন্ন জটিলতায় ক্ষুব্ধ সরকারপন্থী চিকিৎসকদের একাংশও। তাঁদের অনেকেই বলছেন, “প্রথম ১০ বছর স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সরকারের যে মনোভাব ও ভূমিকা ছিল, তাতে আমরাই বলতাম, এই কাজেই পরের ভোট জিতে যাবে। কিন্তু এখন সেই কথা আর জোর দিয়ে বলতে পারি না।”

(চলবে)

আরও পড়ুন