বুধবার সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলায় সওয়াল করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
অতীতের বিভিন্ন ভোটে তৃণমূলের ‘খেলা হবে’ স্লোগানের সম্প্রতি উত্তরণ ঘটিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেছিলেন, ‘‘এ বার শুধু খেলা হবে না। ফাটাফাটি খেলা হবে।’’ এসআইআর মামলায় সুপ্রিম কোর্টে দেশের প্রধান বিচারপতির এজলাসে বুধবার যে ভাবে সওয়াল করলেন তিনি, নির্বাচন কমিশনের আইনজীবীর যুক্তির পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করলেন, তা দেখে তৃণমূল মনে করছে, এসআইআরের ময়দানে একাই খেলা ঘুরিয়ে দিলেন মমতা।
দলের সর্বময় নেত্রীর এ হেন ভূমিকার পরে কার্যত টগবগ করছে ভোটমুখী তৃণমূল। সাংসদ, মন্ত্রী, বিধায়কদের গলায় কার্যত বিজয়োৎসবের উচ্ছ্বাস। শাসকদলের প্রথম সারির নেতৃত্ব মনে করছেন, ভোটের আগে গোটা সংগঠনকে চাগিয়ে দিল শীর্ষ আদালতে মমতার সওয়াল। নেতারা একান্ত আলোচনায় এমনও বলছেন যে, এসআইআর শুরুর পর্বে শুভেন্দু অধিকারীরা যে ধরনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছিলেন, তাতে নিচুতলার অনেকে খানিকটা গুটিয়ে গিয়েছিলেন। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাওয়াইয়ে সাংগঠনিক কাজে সেই জড়তা অনেকটা কাটলেও পুরোপুরি যে কেটে গিয়েছিল, তা নয়। কিন্তু বুধবার দুপুরের পর থেকে সে সব কার্যত কর্পূরের মতো উবে গিয়েছে!
মমতার সুপ্রিম-সওয়ালকে পাঁচটি দিক থেকে দেখতে চাইছে তৃণমূল। প্রথম সারির নেতাদের বক্তব্য, এক সওয়ালে পাঁচটি উদ্দেশ্যের সাধন করে দিয়েছেন মমতা। প্রথমত, বিজেপির বিরুদ্ধে তিনিই যে এক এবং একমাত্র ‘মুখ’, সেটি তুলে ধরেছেন। দ্বিতীয়ত, এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বিরোধী বাড়তি ভোটও মমতা তাঁর দিকে টেনে আনতে পারবেন। যার ফলে আরও বিপন্ন হবে সিপিএম এবং কংগ্রেস। মতাদর্শগত ভাবে বিজেপির বিরোধী বামেদের মধ্যেও দোদুল্যমানতা তৈরি হবে।
তৃণমূলের যে ব্যাখ্যার উদাহরণ মিলেছে সুপ্রিম কোর্টে মমতার সওয়াল শেষের পরেই। আদালতে মমতার সওয়াল করতে চলে যাওয়া প্রসঙ্গে বুধবার সকালে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী কটাক্ষের সুরে বলেছিলেন, ‘‘এ সব নাটক!’’ সওয়াল শেষের পরে সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য মমতার পদক্ষেপকে ‘ইতিবাচক’ উল্লেখ করে বলেছেন, ‘‘নাটক বলতে যাব কেন? অনেকে অনেক কিছুকেই নাটক বলেন। ওরা (সিপিএম) মনে হয় সব সময় নাটক দেখেন!’’ দীপঙ্করের বক্তব্য এই কারণে ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ যে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘নো ভোট টু বিজেপি’ স্লোগানের নেপথ্যে লিবারেশনের বড় ভূমিকা ছিল। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে যা নিয়ে সরব হয়েছিল বিজেপি-ও। আবার সেই লিবারেশনই কয়েক মাস আগে নৈহাটি উপনির্বাচনে সিপিএমের সমর্থন নিয়ে প্রার্থী দিয়েছিল। কিন্তু মমতার সওয়াল সেই সাম্প্রতিক ঐক্যেও চিড় ধরিয়ে দিয়েছে। অন্তত বুধবার বিকাল পর্যন্ত সেটাই চিত্র। অনেকের এ-ও বক্তব্য, এসআইআর শুরুর পর্বে যে ‘হিন্দু মধ্যবিত্ত’ অংশ বিজেপির ভাষ্যে কথা বলছিল, নিয়মিত হয়রানির চোটে তারাও বিরক্ত। মমতার সওয়াল সেই অংশের সমর্থন টানতেও সহায়ক ভূমিকা নেবে। প্রভাব তৈরি করবে মহিলাদের মধ্যেও।
তৃতীয়ত, তৃণমূল নেতৃত্বের অনেকেই মনে করছেন, নানাবিধ কারণে সংখ্যালঘুদের কিয়দংশে দল এবং সরকার সম্পর্কে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সংশোধিত ওয়াকফ আইন আংশিক কার্যকর করা হোক বা হুমায়ুন কবীরের নতুন দল নির্মাণ— কয়েকটি সূচকে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কিছু এলাকায় তৃণমূলের সম্পর্কে ক্ষোভের আঁচ পাওয়া যাচ্ছে। এসআইআর মামলায় মমতার সওয়াল সেই পরিস্থিতিতে বদল আনবে। বিজেপি-বিরোধিতার প্রশ্নে মমতা তথা তৃণমূলের উপর সংখ্যালঘুদের আস্থার পুনর্নির্মাণ ঘটাবে। যে অংশ গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে মমতা তথা তৃণমূলের জনসমর্থনের অন্যতম ‘পুঁজি’। বিজেপি যখন হিন্দু ভোটের মেরুকরণকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে মরিয়া চেষ্টা করছে, তখন সংখ্যালঘু ভোটে ভাঙন ধরলে যে তৃণমূলকে বিড়ম্বনায় পড়তে হবে, সেই আশঙ্কা রয়েছে শাসকদলের বৃহদাংশে। সেই প্রেক্ষিতেই তাঁদের দাবি, মমতার সুপ্রিম-সওয়ালের পরে সংখ্যালঘু ভোটের ক্ষতে প্রলেপ পড়তে বাধ্য।
চতুর্থত, শাসকদলের অনেকেই মনে করছেন, মমতার সওয়াল জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপি-বিরোধী পরিসরে তৃণমূলের উচ্চতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যে ১২টি রাজ্যে এসআইআর হচ্ছে, তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও কেরল, তামিলনাড়ু অ-বিজেপি দলের শাসিত। তামিলনাড়ুর শাসক ডিএমকে বা কেরলের শাসক সিপিএমের কোনও নেতা বা নেত্রী এসআইআর বিরোধিতায় মমতার মতো দিল্লি পৌঁছে যাননি। সুপ্রিম কোর্টে স্বয়ং সওয়াল করা তো দূরের কথা! গত তিন ধরে রাজধানীতে মমতা সেটাই করেছেন। এর আগে বিহারের এসআইআরের সময়েও কংগ্রেস এবং আরজেডি মিছিল করেছিল। কিন্তু আইনি লড়াইকে এই পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেনি। তৃণমূল দেখাতে চাইল, তারা শুধু বুথ স্তরে শিবির বা রাস্তার মিছিলে সীমাবদ্ধ নয়, দলের সর্বোচ্চ নেত্রী, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করলেন।
পঞ্চমত, তৃণমূল মনে করছে সাংগঠনিক রদবদল-সহ বিভিন্ন কারণে দলের মধ্যে বিবাদ রয়েছে। বহু জায়গায় কার্যকরী নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও দলের অন্দরে আলোচনা রয়েছে। সেই অংশকেও মমতার সওয়াল রাস্তায় নামিয়ে দেবে।
একান্ত আলোচনায় তৃণমূলের নেতারা মমতার সওয়াল এবং তার রাজনৈতিক অভিঘাতকে নানা ভাবে ব্যাখ্যা করছেন। দলের প্রথম সারির এক নেতার কথায়, ‘‘দেড় বছর আগে আরজি কর পর্বের সময়ে আমরা কার্যত ঘরে ঢুকে গিয়েছিলাম। কিন্তু দেড় বছর পর এসআইআরের সৌজন্যে দিদির সওয়াল পুরো উল্টো ছবি তৈরি করে দিল। এখন আমরাই ময়দানে। বাকিরা ঘরে ঢুকে যাবে।’’ যে আরজি কর পর্বে ‘বিদ্রোহী’ হয়ে নানা কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, মমতার সওয়ালের পরে সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে সেই তিনিই ছলছল নয়নে বলেছেন, ‘‘এমন নেত্রী কখনও দেখিনি।’’ আবার কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে নজির গড়লেন মমতাদি। শত শত আইনজীবী আজকে তাঁকে দেখতে ভিড় করেছিলেন। দেশের ইতিহাসে ৪ ফেব্রুয়ারি মাইলফলক হয়ে থাকবে।’’ অভিঘাত এমনই যে, তীব্র মমতা বিরোধী হিসাবে পরিচিত অধীর চৌধুরী ঘনিষ্ঠ এক কংগ্রেস নেতাও বিহ্বল হয়ে বলে ফেলেছেন, ‘‘এই মহিলা (মমতা) ক্ষণজন্মা রাজনীতিক।’’
আগামী সোমবার ফের এসআইআর মামলার শুনানি রয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। মমতা কি যাবেন? লোকসভার বলিয়ে-কইয়ে তৃণমূল সাংসদ বলে দিলেন, ‘‘মনে হচ্ছে সোমবারও দিল্লিতে আসবেন।’’ তবে তা নিয়ে তৃণমূলের মধ্যেও বিভিন্ন মতামত রয়েছে। একপক্ষ যেমন মনে করছে, মমতা আবার সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করতে হাজির হবেন, তেমনই অপরপক্ষের মতে, মমতা যা চেয়েছিলেন, জাতীয় স্তরে যে এসআইআর তথা নির্বাচন কমিশনের বিরোধী ভাষ্য এবং দৃশ্যপট তৈরি করতে চেয়েছিলেন, তা তাঁর তিনদিনের দিল্লি সফরে হয়ে গিয়েছে। ফলে সোমবারের শুনানিতে তাঁর দিল্লি না গেলেও চলবে।
তবে উভয়পক্ষই এ বিষয়ে একমত যে, আগামী সোমবার মমতা দিল্লি যান বা না-যান, তিন দিনের সফরে দিল্লি তাঁর কাছে চলে এসেছে।