মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
এক জনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেলে দিল্লিতে আন্দোলন নিয়ে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে তৃণমূল। সেই আবহেই সোমবার সাধারণতন্ত্র দিবসে রাজভবনের অনুষ্ঠানে ঘনিষ্ঠবৃত্তে মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দিলেন, তিনি দিল্লি যাচ্ছেন।
আগামী ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে বাজেট পেশ করবেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন। তার আগে মঙ্গলবার কেন্দ্রের তরফে সর্বদল বৈঠক ডাকা হয়েছে। মমতা কবে দিল্লি যাবেন, তার দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কারও কারও বক্তব্য, সংসদের অধিবেশন চলাকালীনই মমতা দিল্লি সফরে যেতে পারেন। তাতে বিজেপি-বিরোধী দলগুলির নেতাদের সঙ্গেও সংসদে তাঁর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। আবার কারও কারও বক্তব্য, এসআইআর সম্পন্ন হওয়ার পরে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পরেই দিল্লি যেতে পারেন মমতা।
যখনই যান, মমতার মূল উদ্দেশ্য থাকবে একটাই— এসআইআর নিয়ে রাজ্যে যা চলছে, তাকে সর্বভারতীয় স্তরে তুলে ধরা। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রমণ আরও ধারালো করা। পশ্চিমবাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ৪ নভেম্বর। ওই দিনই কলকাতার রাস্তায় মিছিলে হেঁটেছিলেন মমতা এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মিছিল শেষে জোড়়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সামনের সভা থেকে অভিষেকই প্রথম বলেছিলেন, ‘‘নেত্রীর অনুমতি নিয়ে বলছি, একজনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেলে দিল্লিতে এক লক্ষ মানুষকে নিয়ে যাব।’’ তার পরেও একাধিক বার অভিষেক ওই কথা বলেছেন। সোমবার ঘনিষ্ঠবৃত্তের আলোচনায় নিজের যাওয়ার কথা জানিয়ে দিলেন মমতা স্বয়ং।
২০২৩ সালের অক্টোবরে অভিষেকের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলিতে ‘বঞ্চনার’ প্রতিবাদে দিল্লিতে তৃণমূলের কর্মসূচিতে বেপরোয়া ধরপাকড় চলেছিল। সন্দেহ নেই, মমতা কোনও আন্দোলনে নিজে দিল্লি গেলে তার ওজন এমনিতেই বেড়ে যাবে। বিক্ষোভ তথা প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণ করতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ কী ভাবে হবে, তা-ও ভাবতে হবে অমিত শাহের মন্ত্রককে। কারণ, দিল্লির পুলিশি ব্যবস্থা শাহের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীনে।
তৃণমূলের তরফে একটি কথা ধারাবাহিক ভাবে বলা হচ্ছে। তা হল, বিহার, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, দিল্লির ভোটের সময়ে নির্বাচন কমিশনের ‘কারচুপি’ ধরতে পারলে বিজেপি জিততে পারত না। সেখানে বিরোধীরা ‘কারচুপি’ ধরতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গে সেটাই করেছে তৃণমূল। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া বা ভুয়ো নাম যুক্ত করার ‘খেলা’ ধরে ফেলেছে তারা। অভিষেকের ঘনিষ্ঠ নেতারা একান্ত আলোচনায় এ-ও বলছেন, বিরোধী নেতাদের ডেকে রাহুল গান্ধী প্রোজেক্টরে ভোটচুরির বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। আর তৃণমূল বুথে বুথে সেটা বাস্তবায়িত করেছে। এটাই কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের ফারাক। অনেকের ধারণা, দিল্লি গিয়ে সেটিকেই আরও জোরদার প্রতিষ্ঠা করতে চায় তৃণমূল। তাতে সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপি বিরোধী পরিসরে তৃণমূলের উচ্চতা এবং গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে বলেই অনুমান তাঁদের। সেখানে মমতা সশরীরে গেলে গোটা দেশের নজর যে সে দিকে গিয়েই পড়বে।
এসআইআর নিয়ে মমতা যে লড়াই চালিয়ে যাবেন, তা তিনি একাধিক বার প্রকাশ্যে এবং নিজের ঘনিষ্ঠমহলে বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, তিনি ভোটার তালিকা থেকে ‘বৈধ’ ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া রুখবেন এবং একইসঙ্গে শানিনর নামে জনতার বৃহদাংশের যে ‘হয়রানি’ হচ্ছে, তারও প্রতিবাদ করবেন। মমতার এক ঘনিষ্ঠ নেতার কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের জন্য বিজেপি তাড়াহুড়ো করে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে! ওরা জানে না যে, এর ফলে হিতে বিপরীত হচ্ছে। মানুষ হয়রান হচ্ছেন। তাঁরা অসন্তুষ্ট হচ্ছেন। নাম বা পদবির সামান্যতম এদিক-ওদিক হলে তাঁদের শুনানিতে ডেকে পাঠানো হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হচ্ছে। আমরা সেই অসহায় মানুষের পাশে আছি। আমাদের নেত্রী সেই অসহায় মানুষের পাশে আছেন।’’