ডিএ মামলার রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের পুরনো বকেয়া মহার্ঘভাতা (ডিএ)-র ২৫ শতাংশ অবিলম্বে মিটিয়ে দিতেই হবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চ জানিয়ে দিল, ডিএ সরকারি কর্মচারীদের আইনি অধিকার! ২৫ শতাংশ দ্রুত মেটানোর পর বাকি ৭৫ শতাংশ কী ভাবে দেওয়া হবে, তার একটা রূপরেখাও তৈরি করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ২০০৯ সালের অগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যে ডিএ বকেয়া রয়েছে, এই রায় তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই মুহূর্তে কেন্দ্র এবং রাজ্যের ডিএ-র মধ্যে যে ফারাক রয়েছে (৪০ শতাংশ, যা এপ্রিল থেকে কমে ৩৬ শতাংশ হবে) তার ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়। রাজ্যের ‘আর্থিক বোঝা’র বিষয়টিও বৃহস্পতিবারের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বহাল পুরনো নির্দেশই
গত বছর ১৬ মে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি করোল এবং বিচারপতি মিশ্রের এই বেঞ্চই রাজ্যকে বকেয়া পুরনো ডিএ-র ২৫ শতাংশ মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। ছ’সপ্তাহের মধ্যে ওই নির্দেশ মানতে বলেছিল সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু ওই সময়সীমার মধ্যে কর্মচারীদের ডিএ দিতে পারেনি রাজ্য সরকার। আদালতের কাছ থেকে আরও ছ’মাস সময় চাওয়া হয়। সেই আবেদনের ভিত্তিতে আবার শুনানি শুরু হয় সুপ্রিম কোর্টে। গত ৮ সেপ্টেম্বর সেই শুনানিপর্ব শেষ হয়। রায়দান স্থগিত রেখেছিল দুই বিচারপতির বেঞ্চ। বৃহস্পতিবার সেই রায় দিল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালত জানাল, গত বছর ১৬ মে ২৫ শতাংশ ডিএ দেওয়ার যে অন্তর্বর্তী নির্দেশ তারা দিয়েছিল, সেই নির্দেশটি অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে।
বাকি ৭৫ শতাংশের জন্য নতুন কমিটি
শুনানি চলাকালীন রাজ্য বার বার দাবি করেছে, রাজ্যের অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই। সব কর্মচারীকে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দিলে রাজ্য দেউলিয়া হয়ে যাবে। বৃহস্পতিবারের রায়ে সেই বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, রাজ্যের উপর আর্থিক চাপের বিষয়টি বিবেচনা করে এবং রাজ্যের কোষাগারে অযথা চাপ না-দেওয়ার জন্য আদালত একটি পদ্ধতি তৈরি করছে। চার সদস্যের কমিটি তৈরির কথা জানায় বিচারপতি করোল এবং বিচারপতি মিশ্রের বেঞ্চ। কমিটি গঠনের কথা জানিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বলে, ‘‘সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য প্রাপ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি বকেয়া যাতে ঠিক ভাবে দেওয়া যায়, তা দেখার জন্যই এই নতুন কমিটি।’’
কমিটিতে কারা, কাজ কী
সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ইন্দু মলহোত্রের নেতৃত্বে ওই কমিটি তৈরি হবে। থাকবেন ঝাড়খণ্ড হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি তরলোক সিংহ চৌহান এবং ছত্তীসগঢ় হাই কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি গৌতম ভাদুড়ি। এ ছাড়াও ওই কমিটিতে রাখা হবে কেন্দ্রের ‘কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল’-এর এক জন উচ্চপদস্থ আধিকারিককে। কমিটির কী দায়িত্ব হবে, তা-ও জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেছে, কমিটির মূলত দায়িত্ব হবে তিনটি। ১) মোট কত টাকা কত খেপে দেওয়া হবে তা স্থির করা, ২) কত দিনের মধ্যে, কত কিস্তিতে দেওয়া হবে তা স্থির করা, ৩) নির্দিষ্ট সময় অন্তর নির্ধারিত টাকা ছাড়া হচ্ছে কি না তা যাচাই করা। রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করেই সব কিছু নির্ধারণ করবে ওই কমিটি। আর এই পুরোটাই বকেয়া ডিএ-র ৭৫ শতাংশের জন্য প্রযোজ্য।
আদালত জানিয়েছে, কত টাকা করে দেওয়া হবে এবং কী ভাবে, তা আগামী ৬ মার্চের মধ্যে জানাতে হবে কমিটিকে। কমিটির বিবেচনা অনুযায়ী প্রথম কিস্তির অর্থ ৩১ মার্চের মধ্যে দিতে হবে। অর্থাৎ, বকেয়া ডিএ-র ৭৫ শতাংশের মধ্যে কমিটির নির্ধারণ করা প্রথম কিস্তির টাকাও মার্চের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে রাজ্য সরকারকে। প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধের পর রাজ্যকে একটি স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিতে হবে আদালতে। কমিটি কী কী নির্ধারণ করেছে, টাকা দেওয়ার সময়সূচি এবং প্রথম কিস্তির দেওয়া হয়েছে কি না— ওই রিপোর্টে সব তথ্য জানাতে হবে। আগামী ১৫ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী শুনানি। আদালত আরও জানিয়েছে, কমিটির খরচও বহন করতে হবে রাজ্য সরকারকে।
কারা পাবেন, কারা নন
২০২০ সালের আগে থেকে কর্মরত রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা ছাড়া, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীরাও এই রায় অনুযায়ী নিজেদের বকেয়া পাবেন। তবে ২০০৯ সালের পর যাঁরা অবসর নিয়েছেন তাঁদের জন্যই এই রায় প্রযোজ্য। অন্য দিকে, ২০১৯ সালের পর যাঁরা কাজে যোগ দিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই রায় প্রযোজ্য নয়। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যাঁরা কাজে যোগ দিয়েছেন, তাঁরা সংশ্লিষ্ট সময়কার বকেয়া ডিএ পাবেন। অর্থাৎ, কেউ যদি ২০১৪ সালে কাজে যোগ দেন, তবে সেই সময় থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত হিসাবে বকেয়া ডিএ পাবেন।
ডিএ আইনি অধিকার
সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে বলেছে, ডিএ পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের আইনি অধিকার। তাঁরা ডিএ পাওয়ার যোগ্য। অল ইন্ডিয়া কনজ়িউমার্স প্রাইস ইনডেক্স (এআইসিপিআই) অনুযায়ী হিসাব করতে হবে ডিএ-র। রাজ্য নিজের মতো করে হিসাব করতে পারবে না। রোপা আইন যেহেতু এআইসিপিআই অন্তর্ভুক্ত, তাই অবশ্যই তার মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।
ডিএ কি মৌলিক অধিকার
কলকাতা হাই কোর্ট নির্দেশ দেওয়ার সময় ডিএ-কে রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের ‘মৌলিক অধিকার’ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, ডিএ মৌলিক অধিকার কি না, সেই প্রশ্ন শীর্ষ আদালতের এই মামলায় কেউ তোলেনি। তাই এ ব্যাপারে আদালত মন্তব্য করবে না। ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে যদি মামলা হয়, তখন আদালত তার পর্যবেক্ষণ জানাবে।
বকেয়া ডিএ বলতে কী বোঝাচ্ছে
বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়লে বেতনের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্যই সরকার তাদের কর্মচারীদের ডিএ দেয়। বাম আমলে রাজ্য সরকার পঞ্চম বেতন কমিশন গঠন করেছিল। ২০০৯ সালে সেই কমিশনের রিপোর্ট সরকার গ্রহণ করে। তার ভিত্তিতেই তৈরি হয় ‘রিভিশন অফ পে অ্যান্ড অ্যালাওয়েন্সেস’ (রোপা, ২০০৯) আইন। সেই আইনের ভিত্তিতে ২০০৯ সালের অগস্ট মাস থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বকেয়া মেটানোর দাবি তোলেন সরকারি কর্মচারীরা।
কী নিয়ে মামলা
কেন্দ্রীয় হারে ডিএ এবং পুরনো বকেয়া ডিএ-র দাবিকে সামনে রেখে আন্দোলন শুরু করেন রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের একাংশ। ২০১৭ সালে স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইবুনালের (স্যাট) দ্বারস্থ হন তাঁরা। সেই সময় স্যাট-এর দেওয়া রায় বিপক্ষে যায় তাঁদের। সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের একাংশ। মামলা করেছিল কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্মেন্ট এমপ্লয়িজ়, সরকারি কর্মচারী পরিষদ এবং ইউনিটি ফোরাম। ২০২২ সালের ২০ মে ওই মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি হরিশ টন্ডন এবং বিচারপতি রবীন্দ্রনাথ সামন্তের ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, ডিএ রাজ্য সরকারের কর্মীদের অধিকার। কর্মীরা কেন্দ্রীয় হারে তা পাওয়ার যোগ্য। পুরনো বকেয়া ডিএ পুরোটাই মিটিয়ে দিতে হবে। সময়ও নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল হাই কোর্ট। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য সরকার। প্রায় চার বছর আইনি লড়াই চলার পর বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট তার রায় দিল।
সুপ্রিম কোর্টের রায় নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভুল প্রমাণিত হলেন। নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বারংবার তিনি বলে এসেছেন যে, ডিএ কর্মচারীদের অধিকার নয়। আজ দেশের সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দিল যে, ডিএ হল কর্মচারীদের আইনসিদ্ধ ন্যায্য অধিকার। কোনও অনুদান নয়।” সুপ্রিম-রায়কে ‘বড় জয়’ হিসাবে দেখছেন আন্দোলনরত সরকারি কর্মচারীরা। তাঁদের মতে, সুপ্রিম কোর্টে ‘বড় ধাক্কা’ খেল রাজ্য সরকার। অন্য দিকে, রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল এটা ‘বড় ধাক্কা’ হিসাবে দেখতে নারাজ। আনুষ্ঠানিক ভাবে না বললেও একান্ত আলোচনায় দলের প্রথম সারির নেতাদের বক্তব্য, হাই কোর্টে বকেয়া ডিএ-র পুরোটাই পরিশোধ করতে বলেছিল সময়সীমা বেঁধে দিয়ে। সেখানে সুপ্রিম কোর্ট আপাতত বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ দিতে বলেছে। বকেয়া ডিএ-র বাকি অংশ বিবেচনা করবে সুপ্রিম কোর্টের তৈরি করা কমিটি। এটা সরকারের কাছে ‘স্বস্তির’ এবং ‘অনেকটাই কম চাপের’ হল।