রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল চিত্র।
আট দিন পেরিয়ে গেল, এখনও কার্যত শুরুই হল না রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর তদন্ত। যে ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে রাহুলের এই পরিণতি, তার প্রযোজনা সংস্থার কারও সঙ্গেই ওড়িশার তালসারি মেরিন পুলিশ সোমবার রাত পর্যন্ত কথা বলে উঠতে পারেনি। রাহুলের স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারের দায়ের করা অভিযোগপত্রের ভিত্তিতে যে পাঁচ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে, তাঁদেরও কাউকেই এখনও ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি পুলিশ। ঘটনার সময়ে ড্রোন উড়িয়ে শুটিং চলছিল বলে জানা গেলেও, সেই ড্রোনের ফুটেজও পুলিশ উদ্ধার করতে পারেনি। ওড়িশা পুলিশ সূত্রে শুধু দাবি করা হয়েছে, পাঁচ জনকেই ডাকার ভাবনাচিন্তা চলছে। কিন্তু কবে ডাকা হবে, সে নিয়ে স্পষ্ট উত্তর নেই। এ নিয়ে দিঘা পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করার কথা থাকলেও তা রয়ে গিয়েছে ভাবনাচিন্তার পর্যায়েই।
এই পরিস্থিতিতে এমন ‘হাই-প্রোফাইল’ মামলার তদন্ত করার জন্য তালসারি মেরিন পুলিশের পর্যাপ্ত পরিকাঠামো রয়েছে কি না, সেই নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। সেখানকার পুলিশ অফিসারেরাই জানান, উদয়পুর, তালসারির সমুদ্র সৈকতের বিস্তীর্ণ এলাকায় কাজ করার জন্য তাঁদের কাছে রয়েছে মাত্র দু’টি গাড়ি। অফিসার হাতেগোনা। বড় কিছু ঘটলে এই তল্লাটে নির্ভর করতে হয় দিঘার পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের উপর। সমুদ্র সৈকতে সর্বক্ষণ নজরদারি চালানোর মতো পরিকাঠামোও তাঁদের কাছে অপ্রতুল বলে দাবি তালসারি মেরিন পুলিশ থানার কর্মীদের। সেখানকারই এক অফিসার বললেন, ‘‘সমুদ্রে নজরদারি করা কার্যত বালি হাতড়ানোর সমান। লোকবল নেই, তদন্ত করবে কে? এই মামলার তদন্ত ভার ওড়িশা রাজ্যের গোয়েন্দা পুলিশ নিয়ে নিতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে ভোট না মেটা পর্যন্ত হবে কি না, জানা নেই।’’
রবিবার রাতে তালসারি মেরিন থানায় পৌঁছে দেখা গিয়েছিল, চার দিক অন্ধকার। থানার সিঁড়িতে পড়ে রয়েছে লোহার বিরাট গেট। সদ্য রং করে নতুন সেই গেট থানায় লাগানোর কথা। অভিযোগ নেওয়ার জায়গা থানা ভবনের সিঁড়ির কাছে টেবিলে। সেখানে বসা পুলিশ কর্মী, মোবাইলে ভিডিয়ো দেখতে ব্যস্ত। রাহুলের মৃত্যুর তদন্ত নিয়ে কথা বলতে আসা হয়েছে জানানোর পরেও মাথা তোলেন না তিনি। এক এএসআই এই সময়ে উপস্থিত হয়ে বলেন, ‘‘রাত-দিন ডিউটি করতে হয় তো, তাই মেজাজ গরম। মধ্যরাত পর্যন্ত বাংলার অভিনেতারা ছিলেন। তার পর অভিনেতার মৃত্যু নিয়ে যা চলছে আমরা হাঁপিয়ে উঠছি। মৃত্যুর তদন্ত করব কী, আমাদের থানায় তো টহল দেওয়ারও ঠিকঠাকলোক নেই।’’
কথা চলার মধ্যেই আলো জ্বলে ওঠে থানার ভবনে। এএসআই বলেন, ‘‘মাঝে মধ্যেই বিদ্যুৎ থাকে না।’’ থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার সোমবার সকালে বললেন, ‘‘এফআইআর তো দায়ের করা হয়েই গিয়েছে। এরপর কোন দিকে কী হয়, বড় কর্তারা দেখবেন বলেছেন।’’ কিন্তু আট দিন তো পেরিয়ে গেল? আর উত্তর দিতে চান না তিনি।
এফআইআরে প্রিয়াঙ্কা তথ্য গোপন করা হয়েছে এবং বিভ্রান্তিমূলক বিবৃতি ছড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেছেন। দাবি করা হয়েছে, কোনও রকম নিরাপত্তার বন্দোবস্ত ছাড়াই প্রশাসনের থেকে অনুমতি না নিয়ে শুটিং চলছিল। তাতেই তাঁর স্বামী রাহুলের এই পরিণতি। তালসারি থানার পুলিশ অফিসার রতিকান্ত বেহারা বলছেন, ‘‘সাব-কালেক্টরের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার কথা। এ ছাড়া মেরিন থানাকেও চিঠি দিয়ে জানানোর কথা। কিছুই করা হয়নি।’’ কিন্তু তিনদিন ধরে তালসারির নানা অঞ্চলে রাহুলদের ধারাবাহিকের শুটিং চলল, অথচ পুলিশের নজর পড়ল না? ওই পুলিশ অফিসারের মন্তব্য, ‘‘সীমান্ত এলাকায় সব এ ভাবেই চলেছে। এটা ওড়িশা আর পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত হওয়ায় ভাল ভাবে কোনও পক্ষই নজর দেয় না। তাছাড়া এত বড় এলাকায় সব ঘুরে দেখার মতো লোকবল আরগাড়ি কোথায়?’’
তালসারি মেরিন থানা বালেশ্বর পুলিশ জেলার অন্তর্গত। সেখানকার পুলিশ সুপার প্রত্যুষ দিবাকরের দাবি, ‘‘এফআইআরে যাঁদের নাম আছে সকলকে ডাকা হবে। দিঘা পুলিশের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করা হবে। অনুমতি না নিয়েই শুটিং করার ব্যাপারটি আলাদা করে দেখা হচ্ছে। উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের ভাবনাচিন্তা চলছে।’’
ভাবনা-চিন্তার পর্ব পেরিয়ে কাজ হবে কবে? বালেশ্বরের এসডিপিও সুব্রত বেহারার দাবি, ‘‘বাংলার সঙ্গে ওড়িয়া সিনেমার দীর্ঘদিনের যোগ। রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচুর ছবিতে অভিনয় করেছেন, এক সময় ওড়িশা তাঁর শ্বশুর বাড়ি ছিল। ফলেবাংলার কোনও অভিনেতার এই ভাবে মৃত্যু হলে ওড়িশা পুলিশ বসেথাকবে না।’’