—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
৬ দিনে ৩০ লক্ষ উপভোক্তা বাছাইয়ের লক্ষ্যমাত্রা! অর্থাৎ, দৈনিক তা পাঁচ লক্ষ করে! কারণ, সব ঠিক থাকলে ৩ জুন থেকে যোগ্য উপভোক্তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর কাজ শুরু করবে নবান্ন। এত অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল কাজের বোঝা সামলাতে জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের (এনএফএসএ) আওতায় কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত রেশন-গ্রাহকদের তথ্যভান্ডারকে অন্যতম ভিত্তি ধরা হচ্ছে। তবে এত স্বল্প সময়ে একেকটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের যাচাই-ভার আধিকারিকদের চিন্তা বাড়াচ্ছে। চাপ বাড়াচ্ছে ভোটার কার্ড সংযুক্ত করার বিষয়টিও।
লক্ষ্মীর ভান্ডারে উপভোক্তার সংখ্যা ছিল ২.২০ কোটিরও বেশি। অন্নপূর্ণা যোজনায় শেষ পর্যন্ত কত উপভোক্তা থাকবেন, তা এখনও চূড়ান্ত নয়। তবে প্রাথমিক ভাবে ৩০ লক্ষ উপভোক্তাকে প্রথম দফায় তালিকাভুক্ত করার বার্তা পেয়েছেন জেলা আধিকারিকেরা। গত বুধবার অন্নপূর্ণা-আবেদনপত্র প্রকাশিত হয়েছে। সে দিন থেকে ৩০ লক্ষ উপভোক্তা বাছাইয়ের কাজ চলছে, যা শেষ করতে হবে ২ জুনের মধ্যে।দুই ২৪ পরগনা, দুই মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদের মতো জেলাতে এই লক্ষ্যমাত্রা বাকি জেলাগুলির তুলনায় অনেক বেশি। যে কাজের বোঝা চেপেছে, তাতে মোট ৩০ লক্ষ নিষ্পত্তি করতে দৈনিক (টানা ২৪ ঘণ্টা করে কাজ করলে) প্রায় ২১ হাজার করে উপভোক্তা বাছাই করতে হবে। প্রশাসনিক সূত্র জানাচ্ছে, এনএফএসএ-এর আওতায় বিভিন্ন গোত্রে প্রায় ছ’কোটি মানুষ কেন্দ্রের রেশন পেয়ে থাকেন। বিগত সরকার আরও কিছু উপভোক্তাকে রেশনের আওতাভুক্ত করেছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রের তথ্যভান্ডারই মান্যতা পাবে। তাতে যে নামগুলি অভিন্ন থাকছে, সেগুলি সরাসরি চিহ্নিত হয়ে যাবে ৩০ লক্ষের মধ্যে। কারণ, কেন্দ্রের ওই প্রকল্পে উপভোক্তা যাচাইয়ের মান খুবই উন্নত ছিল। তা ছাড়া রেশন তুলতে বায়োমেট্রিকের ব্যবহার সেই যাচাইকে আরও পাকাপোক্ত করেছে। ফলে বৈধতা যাচাইয়ে কেন্দ্রের রেশন উপভোক্তা তালিকার ব্যবহার সুবিধাজনক।
শনিবার বিধাননগরের এক সরকারি অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘প্রকৃত প্রাপকদের প্রত্যেকে চিহ্নিত হবেন। বিচলিত হবেন না, প্রত্যেকের বাড়িতে আমাদের লোকেরা যাবেন। যাঁরা ফর্ম পূরণ করতে পারবেন না, আমাদের লোকেরা বাড়িতে গিয়ে ফর্ম পূরণ করে আনবেন। আমরা চাই, প্রকৃত প্রাপক টাকা পান, কোনও অভারতীয়র অ্যাকাউন্টে এই টাকা যেন না যায়।’’
কিন্তু গোল বেধেছে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের যাচাই ঘিরে। উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের পৃথক যাচাই হবে। কারণ, বহু ক্ষেত্রে বৈধ উপভোক্তার বদলে লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা পৌঁছেছে অন্য ব্যক্তির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। এমনকি, অন্নপূর্ণা যোজনার আবেদনপত্র প্রকাশের দিনেই মুখ্যমন্ত্রী নাম এবং ভোটার কার্ডের তথ্য-সহ জানিয়েছিলেন, মালদহের এক ব্যক্তি মহিলাদের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পের টাকা পেয়ে এসেছেন বছরের পর বছর। এমন ঘটনা আরও যে রয়েছে, তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন তিনি। এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘এ কার্যত উভয়সংকট। কারণ, রাজ্যের বেঁধে দেওয়া লক্ষ্যমাত্রা মানতে যেমন হবে, তেমনই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বৈধতা নিয়ে পরে প্রশ্ন উঠলে তা-ও খারাপ উদাহরণ তৈরি করবে। প্রাথমিক উপভোক্তা বাছাইয়ের কাজ দ্রুত করা গেলেও, প্রতিটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের বৈধতা এত অল্প সময়ের মধ্যে খতিয়ে দেখা খুব কঠিন। আবার শোনা যাচ্ছে, উপভোক্তার লক্ষ্যমাত্রা ৩০ থেকে বেড়ে ৫০ লক্ষও হতে পারে। তা হলে কাজটা আরও কঠিন হবে।’’
এ দিন শুভেন্দু বলেন, ‘‘ইতিমধ্যে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে পুরুষদের, যাঁরা অবৈধ ভাবে লক্ষ্মীর ভান্ডার পাচ্ছিলেন, তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এই সরকারস্বচ্ছতা, আর্থিক শৃঙ্খলা মেনে কাজ করবে। আমরা চাই না, পুরুষদের অ্যাকাউন্টে মহিলাদের এই কর্মসূচির টাকা যাক।’’
অন্নপূর্ণা ভান্ডারের জন্য নির্দিষ্ট পোর্টাল তৈরির কাজ শেষ হয়নি। ফলে মনে করা হচ্ছে, বাছাই হওয়ার পরে লক্ষ্মীর ভান্ডারের পোর্টালে থাকা সংশ্লিষ্ট উপভোক্তাদের নামগুলি চিহ্নিত হবে। পরে অন্নপূর্ণা পোর্টাল তৈরি হয়ে গেলে বাছাই হওয়া নামগুলি চলে যাবে সেখানে। প্রশাসনের অন্দরের বক্তব্য, নতুন প্রকল্পে ভোটার কার্ড সংযুক্ত করার একটি বিষয়ও থাকতে পারে। এখন জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের আওতায় থাকা উপভোক্তাদের একাংশের নামের সঙ্গে ভোটার কার্ডের বিবরণ থাকলেও, নেই বেশির ভাগের। আবার এসআইআরের পরে ভোটার-নম্বর ইত্যাদি বদলে থাকলে পরিমার্জিত তথ্যই সংযুক্ত করতে হবে। সব মিলিয়ে তাই গোটা কাজটিকে বেশ জটিল হিসাবেই দেখছেন আধিকারিকেরা।