—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
চা-শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্রীয় শ্রম মন্ত্রকের অধীনস্থ ইএসআই-এর (এমপ্লয়িজ় স্টেট ইনসিয়োরেন্স) হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে বিধানসভা নির্বাচনের মুখে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী সিপিএমের শ্রমিক সংগঠনের রোষের মুখে পড়েছে রাজ্যের শ্রম দফতর! এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে দফতরে চিঠিও দিয়েছে তৃণমূলের সংগঠন। সম্প্রতি কেন্দ্র শ্রম-বিধি চালু করেছে, যা মেনে নিলে ইএসআই সংক্রান্ত নিয়মও মানতে হবে রাজ্যগুলিকে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার যেখানে কেন্দ্রের শ্রম-বিধি এখনও মানেনি, সেখানে উত্তরবঙ্গের চা-ক্ষেত্রে কেন ইএসআই-কে ডাকার চেষ্টা করছে রাজ্যেরই শ্রম দফতর, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন শ্রমিক নেতৃত্বের একাংশ।
চা-বলয়ে সাম্প্রতিক কালে বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছিল বিজেপি। বিধানসভা ভোটের মুখে বিজেপি-পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম বিধির একটি শর্ত রাজ্যের শ্রম দফতর কার্যকর করতে চাইছে এবং তৃণমূল-সিপিএম এক সুরে তার বিরোধিতা করছে, এই ঘটনাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ। শ্রম দফতর সূত্রে অবশ্য বলা হচ্ছে, বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য শ্রম দফতরের কাছে পৌঁছেছে। শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটকেরও বক্তব্য, শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই শ্রম দফতর যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার, নেবে।
শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, শ্রম দফতরের বৈঠকে চা-বাগানে ইএসআই চালুর প্রস্তাব নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে। এই প্রস্তাব চালু হয়ে গেলে, চা-শ্রমিকেরা ব্যাপক ভোগান্তি এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা শ্রমিক নেতৃত্বের। প্রসঙ্গত, ‘প্ল্যানটেশন লেবার আইন ১৯৫১’ অনুযায়ী, প্রতিটি চা-বাগানে রয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কোনও শ্রমিকের শরীর খারাপ হলে সেখানকার চিকিৎসকের কাছ থেকে শংসাপত্র এনে ছুটির আবেদন করা যায়। কিন্তু ইএসআই চালু হয়ে গেলে ছুটতে হবে ইএসআই হাসপাতালেই, যা এই মুহূর্তে রয়েছে একমাত্র শিলিগুড়িতে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের শ্রমমন্ত্রীর কাছে চা-বাগানগুলিতে ইএসআই প্রকল্পের পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রাখার আর্জি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি অনুমোদিত তৃণমূল চা-বাগান শ্রমিক ইউনিয়ন (টিসিবিএসইউ)। সংগঠনের সভাপতি বীরেন্দ্র বরা ওরাওঁ বলেছেন, “ইএসআই হাসপাতাল রয়েছে শুধু শিলিগুড়িতে। তা-ও পুরোপুরি কার্যকর নয়। ফলে দূরের চা-বাগানগুলি থেকে কোনও শ্রমিক অসুস্থ হলে সেখানে যাওয়াটাই সমস্যার হবে। চা-বাগানের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির উন্নয়ন করেছে রাজ্য সরকার। সেগুলিই আরও উন্নত করা হোক।” রাজ্যের শ্রমমন্ত্রী আদতে তৃণমূলের না বিজেপির, সেই বিস্ময়ও প্রকাশ করছেন শাসক সংগঠনের নেতাদের একাংশ!
সরব সিপিএমের শ্রমিক সংগঠন সিটু অনুমোদিত ডিডিসিকেএমইউ। ১৯৫১-র আইন অনুযায়ী চা-শ্রমিকেরা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু ইএসআই-ব্যবস্থায় শ্রমিককে মজুরি থেকেই একটি অংশ (.৭৫%) দিতে হবে। এই দিকে ইঙ্গিত করেই ডিডিসিকেএমইউ নেতা গৌতম ঘোষ বলেছেন, “ভোটের আগে লোক দেখাতে শ্রম দফতর ইএসআই মানার কথা বলছে। আমরা এত দ্রুত, ভাবনা-চিন্তা না-করে এই নিয়ে মতামত জানাতে পারব না। উত্তরবঙ্গে ইএসআই-এর কোনও পরিকাঠামো নেই। পাশাপাশি, এই প্রকল্প মানলে চা-শ্রমিকদের মজুরিতেও (বর্তমানে যা ২৫০ টাকা) কোপ পড়বে।” পাশাপাশি, সিটুর অভিযোগ, ইএসআই চালুর মাধ্যমে রাজ্য আসলে বাগানের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিকে ‘কর্পোরেট’-ব্যবস্থার হাতে তুলে দিতে চাইছে।
পাশাপাশি, শ্রম দফতরের ১৬ ফেব্রুয়ারির বৈঠকের কার্যবিবরণী নিয়েও লিখিত আপত্তি জানিয়েছে টিসিবিএসইউ। শাসক দলের সংগঠনটির তরফে শ্রম দফতরে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘ওই বৈঠকে এবং পরে ২০ তারিখ লিখিত ভাবে আমরা রাজ্য সরকারের নবনির্মিত চা-বাগান হাসপাতালগুলি ইএসআই-এর হাতে তুলে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। কারণ এতে, পরোক্ষ ভাবে শ্রম-বিধি বাস্তবায়নের পথ সুগম হতে পারে।’ শ্রমিক সংগঠনগুলির অভিযোগ, বৈঠকে ইএসআই-বিষয়ে তারা আপত্তি জানালেও বৈঠকের কার্যবিবরণীতে ‘সম্মতি’র কথা বলা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে তৃণমূলের সংগঠনের দাবি, ‘১৬ তারিখের কার্যবিবরণীতে আমাদের বক্তব্য যথাযথ ভাবে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হোক।’