বর্ধমানে কার্জন গেটের কাছে এসআইআর নিয়ে প্রতিবাদ-সভায় সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। — নিজস্ব চিত্র।
রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে বহু নাম বাদ পড়া এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রেখে দেওয়ার প্রতিবাদে আগামী শুক্রবার ধর্মতলায় ধর্নায় বসতে চলেছেন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘বিবেচনাধীন’ তালিকার নিষ্পত্তি না-করে কোনও ভাবেই বিধানসভা ভোট ঘোষণা করে যাবে না বলে দাবি তুলে আজ, বুধবারই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরের সামনে বিক্ষোভ-জমায়েতের ডাক দিয়েছেন বাম নেতৃত্ব। বামফ্রন্টের দলগুলির পাশাপাশি সিপিআই (এম-এল) লিবারেশন এবং আরজেডি-রও ওই বিক্ষোভে শামিল হওয়ার কথা। ‘বিবেচনাধীন’ তকমা দিয়ে বহু ভোটারের ভাগ্য ঝুলিয়ে রেখে নির্বাচনে যাওয়া চলবে না বলে দাবি তুলেছে কংগ্রেসও। যার প্রেক্ষিতে রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) শেষ লগ্নে এবং বিধানসভা নির্বাচনের মুখে ‘অলিখিত ঐক্যে’ এসে পৌঁছচ্ছে তিন প্রধান রাজনৈতিক দল। উল্টো দিকে থাকছে বিজেপি।
ধর্মতলার ধর্না থেকে মমতা কী বার্তা দেবেন, সে দিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক শিবিরের। শাসক দলের অন্দরে সম্ভাব্য নানা পরিস্থিতি নিয়েই চর্চা চলছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে প্রায় ৬৩ লক্ষ নাম, ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রাখা হয়েছে আরও ৬০ লক্ষ মানুষকে। শাসক দলের আলোচনায় আসছে, এই ‘বিবেচনাধীন’দের বাদ রেখেই রাজ্যে বিধানসভা ভোট ঘোষণা করে দেওয়া হতে পারে। আবার ধাপে ধাপে কিছু নামের নিষ্পত্তি করে এবং বাকিদের তালিকার বাইরে রেখেই ভোটে চলে যেতে পারে নির্বাচন কমিশন, তেমন সম্ভাবনার কথাও মাথায় রাখা হচ্ছে। তার প্রেক্ষিতে কোনও ভোটারকে বাদ রেখে ভোট করা চলবে না, এই দাবি তোলার ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে তৃণমূলের অন্দরে। যাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাচ্ছে, তিনি ফর্ম ৬ পূরণ করে ফের নাম তোলার আবেদন করতে পারেন। কিন্তু ‘বিবেচনাধীন’ বলে ঝুলিয়ে রাখলে সংশ্লিষ্ট ভোটার না পারবেন ভোট দিতে, না সুযোগ পাবেন তখনই নতুন আবেদন করার। যে সংখ্যক ভোটারের নামই ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় শেষ পর্যন্ত রেখে দেওয়া হোক, তেমন কিছু ঘটলে তা গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকারের উপরে আঘাত হবে, এই যুক্তিই সামনে রাখতে চাইছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। এবং সেই যুক্তি থেকেই ভোটারের নিষ্পত্তি না-হওয়ার আগে ভোট নয়, এই দাবি তোলার ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিবাদের পাশাপাশি আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিতও ইতিমধ্যে দিয়ে রেখেছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সূত্রের খবর, প্রথম দু’টির পাশাপাশি তৃতীয় একটি সম্ভাবনার কথাও তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের ভাবনায় রয়েছে। ভোটার তালিকার নিষ্পত্তি হয়নি, এই কারণ দেখিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসনের দিকে চলে যাওয়ার কথা ভাবতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার। সেই ‘চক্রান্তের’ বিরুদ্ধে সরব হওয়ার আগাম প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। এমনিতেই পশ্চিমবঙ্গে অতীতে রাষ্ট্রপতি শাসনে যখনই ভোট হয়েছে, তার ফল কেন্দ্রের শাসক দলের বিরুদ্ধে গিয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে ‘বিবেচাধীনে’র ফয়সালার আগে ভোট করতে না দেওয়া হোক বা রাষ্ট্রপতি শাসন জারির বিরোধিতা— সব প্রশ্নেই তৃণমূলের সঙ্গে সিপিএম, কংগ্রেসের অবস্থান এক। বিজেপিকে কোণঠাসা করার ‘সুযোগ’ থাকছে শাসক দলের নেতৃত্বের সামনে।
আর এর সঙ্গে সঙ্গেই তৃণমূল নেতৃত্ব প্রস্তুতি নিচ্ছেন মানুষের ‘বিবেকের কাছে আবেদন’ করার। যাঁরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাবেন, তাঁরা বুথে যাওয়ার সময়ে যেন যাঁরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলেন না বা শুনানির নামে ‘যন্ত্রণা’ সহ্য করলেন, তাঁদের কথা মনে রাখেন— এমন আর্জি জনতার কাছে জানানো হতে পারে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে।
মতুয়া, আদিবাসী, সংখ্যালঘু-সহ বিভিন্ন অংশের মানুষের নাম ঝুলিয়ে রেখে ভোট করা যাবে না, এই দাবিতে পথে নেমে পড়েছে বামেরা। বর্ধমানের কার্জন গেট চত্বরে মঙ্গলবার তেমন কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। পরে দলের পূর্ব বর্ধমান জেলা কার্যালয়ে তিনি বলেছেন, “প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। আমাদের দাবি ভোটার তালিকা ঠিক মতো সংশোধন না করে ভোট করা অসম্ভব। আগে ভোটার তালিকা তৈরি করা হোক। কোনও ভাবেই প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া যাবে না।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘প্রয়োজনে আমরা সিইও দফতরের সামনে ঠায় বসে থাকব! বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু সকলকে ডাক দিয়েছেন সিইও দফতরে যাওয়ার জন্য।”
‘বিবেচনাধীনে’র নিষ্পত্তি না-করে ভোট ঘোষণা না-করার দাবি জানিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি দিয়েছেন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরী। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও ফের বলছেন, ‘‘আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলছি, কমিশন ‘যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতি’ অন্য কোনও রাজ্যে নয়, কেবল পশ্চিমবঙ্গেই কেন আমদানি করল? কেনই বা ওই অসঙ্গতির নামে ৬০ লক্ষের বেশি বৈধ নাগরিকদের ভোটাধিকার ‘বিচারাধীন’ রাখা হল? এক জনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ দিয়ে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা তৈরি এবং ভোট হলে তা হবে গণতন্ত্রের উপরে চরমতম আঘাত।’’
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য এই বিষয়টি কমিশন এবং বিচার বিভাগের বিচার্য বলে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। পাশাপাশি তাঁদের দাবি, ‘‘ফর্ম ৭ যা গ্রহণ করা হয়নি, সেগুলোর নিষ্পত্তি না-করে ভোট করা যাবে না।’’ অন্য দিকে কমিশন সূত্রের বক্তব্য, তথ্য আপলোড না-হওয়ায় অনেকের নাম ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় রয়ে গিয়েছে। এই কারণে ইআরও-এইআরও’দের ভূমিকা আতস কাচের নীচে ফেলতে চাইছে কমিশন। তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষ পাল্টা বলছেন, ‘‘তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে নিজেদের অপদার্থতার দায় ইআরও-দের উপরে চাপাতে চাইছে কমিশন!’’