আদি তৃণমূলের তোপে দু’পক্ষই
TMC

নৈকট্য চায় এক তৃণমূল, তফাতে অন্য

তৃণমূল এখন দৃশ্যত তিন রকম। কালীঘাটের আদি তৃণমূলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভায় তাঁর মনোনীত বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় স্বীকৃতি পাননি। বিদ্রোহীদের তরফে জমা পড়া আবেদনের ভিত্তিতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দিয়েছেন স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু।

সন্দীপন চক্রবর্তী
শেষ আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ ০৬:৪৪

—প্রতীকী চিত্র।

একই অঙ্গে কত রূপ! প্রশ্ন আছে, উত্তর নেই এখনও।

দেশে ‘ডবল ইঞ্জিন’ তত্ত্বের প্রবক্তা বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে প্রথম বার সরকার গড়েছে। আর তার পরেই সদ্য ক্ষমতা হারানো তৃণমূল কংগ্রেসের ইঞ্জিন থেকে কামরা বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে। এক দল এখন কার্যত ‘শাসক’ তৃণমূল, আর এক দল বিরোধী। শাসক তৃণমূল চাইছে বিরোধী তৃণমূলের কাছাকাছি আসতে, দূরত্ব বজায় রাখতে চাইছে বিরোধী তৃণমূল! বিচিত্র বিড়ম্বনার সাক্ষী হচ্ছে বঙ্গ রাজনীতি!

তৃণমূল এখন দৃশ্যত তিন রকম। কালীঘাটের আদি তৃণমূলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভায় তাঁর মনোনীত বিরোধী দলনেতা শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় স্বীকৃতি পাননি। বিদ্রোহীদের তরফে জমা পড়া আবেদনের ভিত্তিতে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতার স্বীকৃতি দিয়েছেন স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু। ঋতব্রতের তৃণমূল (তাঁরা যাকে বলছেন ‘আসল তৃণমূল’) যদি দ্বিতীয় তৃণমূল হয়, তা হলে তৃতীয় এক ধরনের তৃণমূলের অবতারণা করেছেন সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদারেরা। তাঁরা ২০ জন সাংসদ মিলে এনসিপিআই নামক অনামী দলে মিশে যাওয়ার ঘোষণা করেছেন, যদিও নতুন দলের পতাকা নিয়ে যোগদানের কোনও দৃশ্য দেখা যায়নি। এই তৃতীয় তৃণমূল চাইছে বিজেপির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রের শাসক জোট এনডিএ-র সমর্থক হয়ে থাকতে। এ বার সেই ‘শাসক’ তৃণমূলের বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যে আর এক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে থাকা ‘বিরোধী’ তৃণমূলের সঙ্গে বসতে চাইছেন আলোচনায়। গোল বেধেছে সেখানেই।

আদি তৃণমূলের তরফে কুণাল ঘোষ কার্যত একাই দুই বন্দ্যোপাধ্যায়কে নানা বাণে বিঁধে চলেছেন। তাঁর মূল কথা, মমতার তৃণমূল বিধানসভা ভোটে জিতে এলে এঁরা কেউ বিদ্রোহই করতেন না। দিল্লিতে বিদ্রোহের প্রথম পর্ব সেরে কলকাতায় ফিরে যার জবাবে উত্তর কলকাতার সাংসদ সুদীপ বলছেন, ‘‘কী হলে কী হত’র কোনও জবাব হয় না। পিসির গোঁফ গজালে পিসেমশাইয়েরা তিন ভাই হত, এ সব আলোচনার কোনও অর্থ নেই!’’ তবে নতুন উদ্যোগ প্রসঙ্গে সুদীপের বক্তব্য, ‘‘এখন বিধানসভাতেও একই ধরনের প্রস্তুতি চলছে। উভয় পক্ষ কী ভাবে একসঙ্গে বসবে, কী ভাবে কাছাকাছি আসবে এবং এই নতুন দলের পরবর্তী কার্যক্রম কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।’’

কিন্তু আলোচনা চলছে কার সঙ্গে? দ্বিতীয় তৃণমূলের তরফে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বলছেন, ‘‘সাংসদেরা এনসিপিআই দলের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন। সেটা তাঁদের বিষয়, আমাদের কিছু বলার নেই। কিন্তু আমরা এখানে বিরোধী দল। তৃণমূলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কেরা মিলে বিরোধী দল হয়েছি, বিজেপির বিরোধিতা করব। আমাদের কারও সঙ্গে মেশার বা বসার কথা আসবে কেন?’’ সূত্রের খবর, দ্বিতীয় তৃণমূলে নাম লেখানো বিধায়কদের একাংশ চাইছেন, বিজেপির থেকে পৃথক সত্তা যেন বজায় থাকে। সেই ‘চাপ’ নিতে হচ্ছে ঋতব্রতকে এবং তার ফলে সুদীপদের প্রস্তাবে সাড়া দেওয়া মুশকিল!

দ্বিতীয় তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রথম তৃণমূল আদালতে মামলাও ঠুকেছে। কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি কৃষ্ণ রাও বিধানসভার স্পিকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, একই দল থেকে দু’রকম নাম (বিরোধী দলনেতা পদে) এলে কী করণীয়? স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন? নাকি দু’পক্ষের মতামত শুনে তার পরে ঠিক করবেন? স্পিকারের আইনজীবী জানিয়েছেন, বিধায়কদের সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বীকৃত ‘বিরোধী’ দলের তরফে আইনজীবীর সওয়াল অবশ্য এখনও বাকি। আদালতে যখন এই সওয়াল-জবাব চলছে, বিধানসভা চত্বরে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রতের প্রস্তাব, ‘‘অধিবেশন কক্ষে শক্তি যাচাই (‘ফ্লোর টেস্ট’) নেওয়া হোক। দুধ-জল যাচাই হয়ে যাবে!’’

সে যাচাই হওয়ার আগে গুলিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছুই। সূত্রের খবর, বিধানসভার বাজেট অধিবেশনের আগে সর্বদল বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে স্পিকারের দফতরের চিঠি চলে গিয়েছিল তৃণমূলের দুই বিধায়কের কাছে। অথচ স্বীকৃত বিরোধী দলের পরিষদীয় নেতৃত্বের কাছে তাঁদের নাম চাওয়া হয়নি। খবর পেয়ে স্বীকৃত বিরোধী দলের নেতারা বুঝতে পারেন, গন্ডগোল হয়ে গিয়েছে! তাঁদের তরফে দু’জন আবার দৌত্য করতে গিয়েছিলেন স্পিকারের কাছে। শেষমেশ ভুল সংশোধন করা হয়েছে। বৈঠকে হাজিরা দিয়েছেন দ্বিতীয় অর্থাৎ স্বীকৃত বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা। ‘ব্রাত্য’ থেকেছে আদি তৃণমূল।

প্রশ্ন এখন থেকেই যাচ্ছে, ‘আসল’ তৃণমূল আসলে কোনটা? সাংসদ সুদীপের মতে, ‘‘আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বলছে, তৃণমূলের দলীয় প্রতীক চিহ্ন, দলের তহবিল ও অর্থ-সম্পদ নিয়ে শেষ পর্যন্ত কী হবে, আদালতের মাধ্যমেই সেটা নিষ্পত্তি হবে। আসল-নকলের জবাব পেতে আদালতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’’

আপাতত চলবে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের কিস্সা! আরও এক জন বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য আছেন মাঝখানে! বিধায়ক নয়না, যিনি স্পষ্ট করছেন না ঠিক কোন শিবিরে থাকছেন। আর যদি প্রশ্ন ওঠে যে, এমন কেউ কি আছেন যিনি তিন শিবিরেই অন্তর্যামীর মতো আছেন? এক বিধায়কের জবাব, ‘‘আছেন তো! তিনি নবান্নে বসেন।’’

আরও পড়ুন