—প্রতীকী চিত্র।
ভোট ঘোষণার অল্প কিছুক্ষণ আগেই সমাজমাধ্যমে বকেয়া মিটিয়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তা নিয়ে খুশির হাওয়া ছড়িয়েছিল কর্মচারী মহলে। কিন্তু তা পুরোপুরি বদলে গেল ডিএ সংক্রান্ত আদেশনামা প্রকাশের পরেই। সরকারি, সরকার পোষিত-অধিগৃহীত, শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী, বোর্ড-কর্পোরেশন— সর্বস্তরের কর্মীদের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সরকারি আদেশনামার বয়ান নিয়ে। মামলাকারী কর্মচারী সংগঠনগুলি রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ভোটের আগে এই ঘটনা নিয়ে ‘কথার খেলাপের’ অভিযোগ তুলে বিরোধীরাও নিশানা করেছেন রাজ্য সরকারকে।
রবিবার ভোট ঘোষণা হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই নিজের এক্স হ্যান্ডলে মমতা জানিয়েছিলেন—মার্চ থেকেই বকেয়া ডিএ অর্থ পাবেন সরকারি, সরকার পোষিত-অধিগৃহীত, শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী, বোর্ড-কর্পোরেশন, পুরসভা-পঞ্চায়েত, পেনশনভোগী সকলেই। কিন্তু সোমবার সন্ধ্যায় যে সরকারি আদেশনামা সকলের হাতে পৌঁছয়, তাতে দেখা যায়, বকেয়া ডিএ-র ঘোষণা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তাতে প্যাঁচ রয়েছে বিস্তর। তা বিশ্লেষণের পরে মামলাকারী সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলি ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাদের অভিযোগ, সুপ্রিম কোর্ট যে নির্দেশ দিয়েছিল, তার সঙ্গে কোনও মিল নেই নবান্নের আদেশনামার বয়ানের।
মূল ডিএ-মামলাকারী সংগঠন কনফেডারেশন অব স্টেট গভর্নমেন্ট এমপ্লয়িজ়ের অভিযোগ, রাজ্য প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, কলকাতা হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট সুনির্দিষ্ট ভাবে বলেছে, অর্থসঙ্কটের কথা বলে কর্মীদের প্রাপ্য আটকে রাখা যাবে না৷ এ ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার আদালতের বক্তব্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে৷ প্রসঙ্গত, গত ৫ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট রাজ্যকে নির্দেশ দিয়েছিল—২০০৮ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বকেয়া ডিএ-র ২৫% অবিলম্বে দিতে হবে। বাকি ৭৫%-এর মধ্যে একটা অংশ দিতে হবে ৩১ মার্চের মধ্যে। ১৫ এপ্রিল সেই কার্যকর করার রিপোর্ট সুপ্রিম কোর্টকে দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। রাজ্য রায় মেনেছে কি না, ১৫ মে তা খতিয়ে দেখবে সুপ্রিম কোর্ট।
সংগঠনের সভাপতি শ্যামল কুমার মিত্র এবং সাধারণ সম্পাদক মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আমরা এই আদেশনামা প্রত্যাহার করে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে নতুন আদেশনামা প্রকাশ করার দাবি জানাচ্ছি৷ অন্যথায় আমরা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হব৷’’
অপর মামলাকারী সংগঠন কর্মচারী কর্মচারী পরিষদের সভাপতি দেবাশিস শীলের প্রতিক্রিয়া, ‘‘ইতিমধ্যেই দায়ের করা আদালত অবমাননার পিটিশন সুপ্রিম কোর্টে শুনানির জন্য আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলেছি।’’ সংগ্রামী যৌথ মঞ্চের আহ্বায়ক ভাস্কর ঘোষ বলেন, ‘‘মডিফিকেশন পিটিশন বাতিল করে সকল কর্মচারীকে তাদের অ্যাকাউন্টে টাকা দিতে হবে। না হলে আমরা ঘরে ঘরে গিয়ে বলব এই সরকারকে ভোট না দিতে।’’ জাতীয়তাবাদী পেনশনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান উপদেষ্টা মনোজ চক্রবর্তীর কথায়, “সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বিপরীত অবস্থানে সর্বস্তরে অসন্তোষ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।”
রাজনৈতিক স্তরেও আক্রমণ তীব্র হয়েছে। রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি তাপস রায় বলেন, “এই সরকার সরকারি কর্মীদের সঙ্গে বছরের পর বছর প্রতারণা করছে। এই সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে গিয়েছে।” সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীর কথায়, “এটা প্রতারণা এবং একই সাথে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরিপন্থী।” পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির মুখপাত্র সুমন রায় চৌধুরী বলেন, “মমতা-সরকার শুধু মানুষের সঙ্গে নয়, সরকারি কর্মচারীদেরও ঠকানোয় উদ্যত।”
তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "সুপ্রিম কোর্টের রায় স্পষ্ট করা আছে শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীদের জন্য। যেটা সংবিধানের ৩০৯ নম্বর অনুচ্ছেদে রয়েছে। সেখানে সরকার পোষিত কর্মচারী, পুরসভার কর্মচারীদের কথা বলা নেই।"