West Bengal Assembly Election 2026

আইনশৃঙ্খলার কিছু কিছু সমস্যা থাকলেও রাজ্যে ভোটের পরিবেশ রয়েছে, বিরোধীদের অভিযোগের সঙ্গে পুরো একমত নয় কমিশন

সোমবার রাজ্যের ২৩ জেলার জেলাশাসক, জেলা ও পুলিশ জেলার সুপার এবং রাজ্য ও কেন্দ্রের ২৪টি সংস্থার আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে কমিশনের ফুল বেঞ্চ। এ ছাড়াও, রাজ্যের আটটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে তারা।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ ২৩:১৫
What did the Election Commission of India say about the upcoming assembly elections in West Bengal

সোমবারের বৈঠকে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ছবি: সংগৃহীত।

পশ্চিমবঙ্গে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে, ভোটের পরিবেশ নেই! বিরোধীদের তোলা এমন অভিযোগ মানতে নারাজ নির্বাচন কমিশন। সোমবার রাজ্যের পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকের পর কমিশনের ফুল বেঞ্চ মনে করছে, ক্ষেত্রবিশেষে বা কোথাও কোথাও কিছু সমস্যা আছে। তবে রাজ্যে বিধানসভা ভোট হওয়ার পরিবেশ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা খুব খারাপ রয়েছে, এমনও মনে করছে না কমিশন।

Advertisement

সোমবার রাজ্যের ২৩ জেলার জেলাশাসক, জেলা ও পুলিশ জেলার সুপার এবং রাজ্য ও কেন্দ্রের ২৪টি সংস্থার আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে কমিশনের ফুল বেঞ্চ। সেই বৈঠকের পর কমিশন মনে করছে, রাজ্যে ভোট করানো নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। প্রশ্ন উঠছে, এসআইআরের প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যে ৬০ লক্ষ নাম বিবেচনাধীন রয়েছে, সেই সব ভোটারের নথি যাচাই এবং নিষ্পত্তি সময়মতো হবে তো? কমিশনের মতে, বিবেচনাধীন ভোটারদের তথ্য নিষ্পত্তির জন্য পর্যাপ্ত সময় রয়েছে। সূত্রের খবর, আগামী ১৫ বা ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজ্যের ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করতে পারে কমিশন। তাদের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোট করানোই মূল লক্ষ্য। তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ করা হবে।

রবিবার রাতেই কমিশনের ফুল বেঞ্চ পশ্চিমবঙ্গে এসেছে। সোমবার সকালে প্রথমে রাজ্যের আটটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে তারা। পরে পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গেও বৈঠকে বসে। সেই বৈঠকে ছিলেন রাজ্যের সকল জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার এবং পুলিশ সুপারেরা। কমিশনের কাছে বিরোধীরা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অভিযোগ করেন। শুধুমাত্র আশ্বাস না দিয়ে কমিশন শান্তিপূর্ণ ভোট করাতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন করেন বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা। কমিশনের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ ভাবে ভোটের জন্য সব রকম প্রস্তুতি নেওয়া হবে।

কমিশনের এক আধিকারিকের বক্তব্য, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে কিছু সমস্যা অবশ্যই রয়েছে। অনেক রাজ্যেই এমন সমস্যা থাকে। তা বলে ভোটের পরিস্থিতি নেই, এটা বলা যায় না। প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠকে সন্তুষ্ট কমিশন।’’ বৈঠকে আর কী কী আলোচনা হয়েছে? ওই আধিকারিক জানান, আলোচনায় নানা বিষয় উঠে আসে। কোনও একটি জেলাকে ধরে কমিশন বাকিদের ক্ষেত্রেও একই বার্তা দিয়েছে। ভোট ঘোষণার অনেক আগেই রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

ভোট ঘোষণার আগে রাজ্যে এত কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রয়োজন পড়ল কেন? ওই আধিকারিক বলেন, ‘‘শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, অন্য রাজ্যেও মোতায়েন করা হয়েছে। এর আগেও কমিশন প্রয়োজন অনুযায়ী অনেক রাজ্যে ভোটের আগে বাহিনী মোতায়েন করেছে। ভোটারদের মনোবল বৃদ্ধিতে এমন পদক্ষেপ করা হয়।’’ তবে কমিশনের ওই আধিকারিকের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সহযোগিতা করেনি। এমনকি, কমিশনের নির্দেশও মানা হয়নি। তাঁর কথায়, ‘‘অনেক নির্দেশ নিয়ে সংঘাত দেখা গিয়েছে ঠিকই। তবে আদর্শ আচরণবিধি চালু হলে মানতে বাধ্য হবে সরকার। তখন পুরো প্রশাসনই কমিশনের অধীনে থাকবে। অর্থাৎ, প্রশাসনিক আধিকারিকদের জন্য ভোটের নিরপেক্ষতা হারাবে এমনটা মনে করা ঠিক নয়।’’

চূড়ান্ত ভোটার তালিকার প্রায় ৬০ লক্ষ ৬ হাজার তথ্য বিবেচনাধীন রয়েছে। বিচারকেরা সেগুলির নিষ্পত্তি করছেন। হাতে আর কয়েক দিন রয়েছে, এই অবস্থায় ভোট ঘোষণার আগে ওই কাজ কি শেষ করা সম্ভব? না কি অসম্পূর্ণ তালিকা নিয়েই ভোটে করাবে কমিশন? ওই আধিকারিক বলেন, ‘‘বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট দেখছে। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। তবে ভোট ঘোষণা হলেও হাতে অনেক সময় রয়েছে। এখন প্রায় প্রতি দিন এক লক্ষ করে নিষ্পত্তি হচ্ছে। প্রার্থীদের মনোনয়নের জমা দেওয়ার শেষ দিন পর্যন্ত যোগ্য ভোটারদের তালিকায় জায়গা দেওয়া হবে। ফলে ভোট ঘোষণা হলেও ওই কাজ চলবে।’’ তিনি মনে করেন, আগামী ক’দিনের মধ্যে ভোট ঘোষণা হলেও, নিষ্পত্তির জন্য এক মাসের কাছাকাছি সময় পাওয়া যাবে।

সোমবারের বৈঠকে কমিশনের ভর্ৎসনার মুখে পড়েন ডিজি (আইনশৃঙ্খলা) বিনীত গোয়েল। রাজ্যে মাদক নিয়ন্ত্রক উপদেষ্টা কমিটি নেই কেন প্রশ্ন তোলেন জ্ঞানেশ। প্রশাসনের আধিকারিকদের নিয়ে কমিশনের ফুল বেঞ্চের বৈঠকে ‘ধমক’ খান রাজ্য এবং কেন্দ্রের বিভিন্ন আধিকারিক। সূত্রের খবর, কমিশনের বার্তা, প্রত্যেকের কাজের ‘ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট’ আছে। জেলাশাসক হোন বা পুলিশ কমিশনার, গাফিলতি দেখলে কাউকে রেয়াত করা হবে না। একই সঙ্গে রিজ়ার্ভ ব‍্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই), বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, আবগারি, মাদক নিয়ন্ত্রক সংস্থাও (নার্কোটিক্স) কমিশনের ভর্ৎসনার মুখে পড়ে।

তৃণমূলের সঙ্গে কিছুটা বাগ্‌বিতণ্ডা হলেও, সোমবার কলকাতায় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে মোটের উপর খুশি কমিশনের ফুল বেঞ্চ। কমিশন সূত্রে খবর, কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম ও কংগ্রেসের প্রদীপ ভট্টাচার্যেরা ভাল ব্যবহার করেছেন। সিপিএমের তরুণ নেত্রী আফ্রিন বেগমের কথা মন দিয়ে শোনে ফুল বেঞ্চ। তৃণমূলের চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য একাধিক বিষয় কমিশনের সামনে তুলে ধরেন। ওই বিষয়গুলি লিখে নেন জ্ঞানেশ। তবে অভিযোগ, মাইক থাকলেও রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা জোর গলায় কথা বলেন। সেই নিয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। কমিশন সূত্রে খবর, পরিস্থিতি স্বাভাবিকতায় আনার চেষ্টা করেন রাজ্যের আর এক মন্ত্রী ফিরহাদ। কমিশনের আধিকারিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিক নেতারা সভায় বক্তব্য রাখেন। সেই অভ্যাস থেকে কথা বলার এমন ধরন। এর মধ্যে অন্য উদ্দেশ্য কিছু নেই।’’ পরে চন্দ্রিমাও সহমত হন। এ নিয়ে কমিশনের এক আধিকারিক জানান, চন্দ্রিমার ওই অংশটি ছাড়া বৈঠক ভাল হয়েছে। সূত্রের আরও খবর, বিজেপি-সহ রাজ্যের সব বিরোধী দলগুলিই এক বা সর্বোচ্চ দু’দফায় ভোট করানোর আর্জি জানিয়েছে। তবে ভোটের দফা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূল কিছু জানায়নি।

সফরের তৃতীয় দিনে মঙ্গলবার রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীর সঙ্গে বৈঠক করবে কমিশনের ফুল বেঞ্চ। সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ নিউ টাউনের একটি হোটেলে ওই বৈঠক শুরু হবে। কমিশন সূত্রে খবর, মঙ্গলবার মুখ্যসচিবের পাশাপাশি, রাজ্য পুলিশের ডিজি পীযূষ পাণ্ডে, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল, রাজ্য পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর নোডাল অফিসারেদের সঙ্গে বৈঠক করবে কমিশন। দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ জ্ঞানেশ কুমার-সহ কমিশনের ফুল বেঞ্চ সাংবাদিক বৈঠক করবে। বিকেলে তারা দিল্লির উদ্দেশে রওনা হবে।

পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে অসম, কেরল, তামিলনাড়ু এবং পুদুচেরিতে বিধানসভা ভোট রয়েছে। কলকাতায় আসার আগে ওই চার জায়গায় গিয়েছিল কমিশনের ফুল বেঞ্চ। কমিশনের মতে, পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ুতে কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা থাকলেও, সব রাজ্যে ভোটের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে। প্রশাসনিক ভাবে সবচেয়ে ভাল অবস্থা রয়েছে কেরল।

Advertisement
আরও পড়ুন