বৃহস্পতিবার প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
কিছু একটা প্রতিক্রিয়া যে তৈরি হতে চলেছে সেটা খানিকটা আন্দাজ করেছিলেন। কিন্তু এমনটা যে হতে পারে, সেটা ভাবেননি ইডির আধিকারিকেরা। ভাবেননি, দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়বেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী!
লাউডন স্ট্রিটের বহুতলে তখন আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালাচ্ছে ইডি। আচমকাই সেখানে ঢুকে পড়েন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিছু একটা যে হতে পারে, তার আঁচ অবশ্য মিনিটপাঁচেক আগে পেয়েছিলেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকেরা। যখন সেখানে পৌঁছেছিলেন কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা। তাঁরও আগে পৌঁছেছিলেন দক্ষিণ কলকাতার ডেপুটি পুলিশ কমিশনার প্রিয়ব্রত রায় এবং শেক্সপিয়ার সরণি থানার পুলিশ অফিসারেরা।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৫৯ মিনিটে প্রতীকের ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ঢোকেন মমতা। ১২টা ১৩ মিনিট নাগাদ সেখান থেকে বেরিয়ে যান। নীচে নেমে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলে সটান চলে যান প্রতীকের সংস্থার সল্টলেকের দফতরে। সেখানে ছিলেন প্রায় পৌনে চার ঘণ্টা।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই প্রতীকের ফ্ল্যাট এবং আইপ্যাকের দফতরে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছিল ইডি। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, ভোর ৬টা থেকে অভিযান শুরু হয়েছিল। তল্লাশির খবর ছড়িয়ে পড়তেই যে প্রতীকের ফ্ল্যাটে পৌঁছন দুই পুলিশ আধিকারিক, তা তাদের বিবৃতিতে সরকারি ভাবে জানিয়েছে ইডি। তারা জানিয়েছে, এক পুলিশকর্মীর সঙ্গে ওই পদস্থ অফিসার এবং বাকি পুলিশ অফিসারেরা এসে তল্লাশি অভিযানে শামিল ইডি আধিকারিকদের পরিচয় খতিয়ে দেখেন। ওই বিবৃতিতেই ইডি জানিয়েছে, কিছু ক্ষণ পরে লাউডন স্ট্রিটের ওই ফ্ল্যাটে ঢোকেন পুলিশ কমিশনার মনোজ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কলকাতা পুলিশের কয়েক জন আধিকারিকও।
তখনই আধিকারিকেরা আঁচ করে ফেলেছিলেন যে, কিছু একটা হতে চলেছে। কিন্তু খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা যে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়বেন, সেটা তাঁরা ভাবেননি। মমতাকে দেখে খানিকটা হকচকিয়েই যান তাঁরা। মমতা সংক্ষিপ্ত বাক্য বিনিময় করেন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে। সামনের টেবিল থেকে একটি সবুজ রঙের ফাইল এবং একটি ল্যাপটপ নিয়ে বেরিয়ে যান তিনি। তদন্তকারী আধিকারিকদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী কথাবার্তার কোনও অবকাশ হয়নি। ইডির একটি সূত্র বলছে, মমতা কিছু নথি নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যান দুপুর ১২টা ১৩ মিনিট নাগাদ। পরে ইডি বিবৃতিতে দাবি করে নথিপত্র এবং বৈদ্যুতিন নথি-সহ ‘প্রমাণ’ নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যান মুখ্যমন্ত্রী। পরিস্থিতির আকস্মিকতায় তদন্তকারী আধিকারিকেরা এতটাই হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন যে, তাঁরা কিছু বলেই উঠতে পারেননি। ফোন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে যে জানাবেন, তারও সময় হয়নি। মমতা পরে বলেন, তিনি তল্লাশির খবর পেয়ে প্রতীককে ফোন করেছিলেন। সাড়া না পেয়ে তিনি নিজস্ব সূত্রের খবর পান যে, প্রতীকের বাড়িতে ইডির অভিযান চলছে। কালক্ষেপ না করে তিনি সেখানে পৌঁছন। তার আগে পুলিশ কমিশনারকেও জানান। প্রসঙ্গত, লাউডন স্ট্রিটেই কলকাতার পুলিশ কমিশনারের সরকারি বাসভবন।
মমতা যখন প্রতীকের বাড়ি থেকে বেরিোচ্ছেন, তত ক্ষণে সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতরে তল্লাশিকারী আধিকারিকেরা আঁচ করে ফেলেছিলেন, সেখানেও যেতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী। বস্তুত, প্রতীকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়ে দেন, এর পরে তিনি সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের দফতরে যাচ্ছেন। সেই কথামতোই প্রতীকের বাড়ি থেকে মুখ্যমন্ত্রী সটান পৌঁছে যান সেখানে। প্রসঙ্গত, মমতা সেখানে পৌঁছতে পারেন, সেটা শুনেও ইডি আধিকারিকেরা তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত মুখোমুখি মমতাকে দেখে তাঁরা খানিকটা হকচকিয়েই যান।
বেলা পৌনে ১টা নাগাদ আইপ্যাকের দফতরে পৌঁছন মমতা। তবে লাউডন স্ট্রিটের মতো সেখানে অত কম সময় তিনি থাকেননি। ছিলেন প্রায় পৌনে চার ঘণ্টা। ইডির একটি সূত্র বলছে, সে সময় আইপ্যাকের দফতরে ‘অদ্ভুত’ এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। এক দিকে দফতরে চলছে তল্লাশি। অন্য দিকে সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তবে ইডি সূত্রের খবর, মুখ্যমন্ত্রী নিজে কোনও কিছুতে হাত দেননি। তাঁর সঙ্গে যাওয়া নিরাপত্তারক্ষী এবং পুলিশ আধিকারিকেরাই যা যা নথিপত্র নেওয়ার তুলে নেন। তার পর সেগুলি নিয়ে চলে যান নীচে। বেসমেন্টে দাঁড় করানো মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে ওই নথিপত্র তুলে দেওয়া হয়।
তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা আইপ্যাকের দফতরে সশরীরে পৌঁছে যাওয়ার পরে তদন্তকারী আধিকারিকেরা আর তাঁদের অভিযান এগোতে পারেননি। ইডির একটি সূত্রের বক্তব্য, যে কাজের জন্য দফতরে অভিযান, মুখ্যমন্ত্রী গিয়ে উপস্থিত হওয়ায় সেই কাজের পরিস্থিতি আর ছিল না। ই়ডির বিবৃতিতেও দাবি করা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী আসার আগে পর্যন্ত তল্লাশি ‘সুষ্ঠু’ ভাবেই হচ্ছিল। অর্থাৎ, মুখ্যমন্ত্রীর অভিযানের পরে তল্লাশি অভিযান কার্যত আর এগোয়নি। তবে সেটি বিশদে ওই বিবৃতিতে লেখা হয়নি। এক আধিকারিক জানিয়েছেন, অনেক সময়েই তল্লাশি অভিযানে গিয়ে অসহযোগিতার সম্মুখীন হতে হয় তাঁদের। কিন্তু বৃহস্পতিবারের পরিস্থিতি একেবারেই বেনজির! মুখ্যমন্ত্রী যে নিজে চলে আসবেন, আধিকারিকেরা তা ভাবতেও পারেননি। তবে মমতা আধিকারিকদের সঙ্গে কোনও কথাবার্তা বলেননি। তাঁদের সঙ্গে কোনও ধরনের দুর্ব্যবহারও করেননি। এমনকি, মুখ্যমন্ত্রী আধিকারিকদের উপর ‘চাপ’ সৃষ্টি করেছেন, এমন অভিযোগও ইডির তরফে করা হয়নি।
পরে ইডি সরকারি বিবৃতিতে দাবি করেছে, প্রতীকের বাড়ি থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় পৌঁছয় আইপ্যাকের দফতরে। সেখানে মমতা, তাঁর সহযোগীরা এবং রাজ্য পুলিশ ‘জোরপূর্বক নথি এবং বৈদ্যুতিন নথি সরিয়ে নেন’। পরে তারা সেই মর্মে কলকাতা হাই কোর্টে মামলাও করে। যার শুনানি হওয়ার কথা শুক্রবার। পাল্টা মামলা করেছে তৃণমূলও। সেটিরও শুনানি হওয়ার কথা শুক্রবারেই।
আইপ্যাকের দফতর থেকে বেরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা জানান, এই ‘হামলার’ প্রত্যুত্তর রাজ্যের জনগণ দেবে। তিনি এ-ও জানান, তাঁর দলের নির্বাচনী কৌশলের তথ্য ‘ট্রান্সফার’ করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। তাই তাঁর মতে ইডির এই হানা ‘অপরাধ’। সে সব নিয়ে অবশ্য ইডি সূত্রের ভাল বা মন্দ কোনও বক্তব্যই নেই। আপাতত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ব্যস্ত তাদের নামে কী কী অভিযোগ করা হয়েছে, তার বিশদ তথ্য পেতে এবং তল্লাশি অভিযান চলতে চলতে রাজ্যের খোদ মুখ্যমন্ত্রীকে দরজা ঠেলে ঢুকতে দেখার আকস্মিকতার বিহ্বলতা সামলাতে!