BJP State Committee

বিজেপির ‘ভোটের মুখ’ কারা, স্পষ্ট হল শমীকের নতুন কমিটি ঘোষণা হতে, সুকান্ত-জমানার অনেকেই বহাল রইলেন দায়িত্বে

সুনীল বনসল পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির পর্যবেক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পাওয়ার পরেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, ভোটে লড়া এবং সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা একসঙ্গে হবে না। বিজেপির নতুন রাজ্য কমিটির তালিকায় চোখ রাখলে বনসলের সেই নীতির প্রতিফলন স্পষ্ট।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:৫৪
Who are BJP’s electoral faces, Clear indication as Bengal BJP President Samik Bhattacharya releases new state committee

(বাঁ দিকে) শমীক ভট্টাচার্য, সুকান্ত মজুমদার (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।

প্রথম সারির নেতাদের মধ্যে কারা ভোটে লড়তে চলেছেন, তা স্পষ্ট হয়ে গেল বিজেপির নতুন রাজ্য কমিটি ঘোষিত হতেই। এমন তিন নেতাকে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে সহ-সভাপতি করা হল, যাঁদের ভোটে লড়া নিশ্চিত। সাধারণ সম্পাদক পদে যাঁরা থেকে গেলেন বা নতুন এলেন, তাঁদের মধ্যে কারওরই আসন্ন নির্বাচনে লড়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। রাজ্য বিজেপির নতুন কমিটিতে ‘আদি’-‘নব্য’ ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টাও লক্ষণীয়। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘শিকড়ের কথা মনে রেখেই কমিটি গঠন করা হয়েছে।’’

Advertisement

বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোয় দলচালনার প্রশ্নে সভাপতির পরে সাধারণ সম্পাদক পদই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই সাধারণ সম্পাদক পদে কারা থাকছেন, কারা নতুন আসছেন, তা নিয়ে কৌতূহল ছিল। সুকান্ত মজুমদারের কমিটিতে যে পাঁচ জন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তাঁদের মধ্যে দু’জন শমীকের কমিটিতেও ওই পদেই থেকে গেলেন। হুগলির প্রাক্তন সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায় এবং পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় মাহাতো। বাকি তিন জন অর্থাৎ জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়, অগ্নিমিত্রা পাল এবং দীপক বর্মনকে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে সরিয়ে সহ-সভাপতি করা হল। অগ্নিমিত্রা আসানসোল দক্ষিণ এবং দীপক ফালাকাটার বিধায়ক। তাঁরা দু’জন এ বারও নির্বাচনে লড়বেন বলে বিজেপি সূত্রের খবর। জগন্নাথ গত নির্বাচনে সিউড়ি বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী ছিলেন। এ বারও তিনিই সিউড়ি থেকে লড়বেন বলে বিজেপি সূত্রের দাবি। বিজেপি নেতৃত্বের ব্যাখ্যা, ‘‘নির্বাচন লড়া আর নির্বাচন লড়ানো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। যাঁরা লড়বেন, তাঁরা শুধু নিজের নিজের কেন্দ্রে লড়বেন। আর সংগঠনের বিভিন্ন গুরুদায়িত্বে থেকে যাঁরা দলকে নির্বাচনে লড়াবেন, তাঁরা আসলে সকলের হয়ে লড়বেন।’’

সুনীল বনসল পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির পর্যবেক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পাওয়ার পরেই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, ভোটে লড়া এবং সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকা একসঙ্গে হবে না। বিজেপির নতুন রাজ্য কমিটির তালিকায় চোখ রাখলে বনসলের সেই নীতির প্রতিফলন স্পষ্ট। লকেট ও জ্যোতির্ময় ছাড়া সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন উত্তরবঙ্গের বাপি গোস্বামী, রাঢ়বঙ্গের সৌমিত্র খাঁ এবং কলকাতার শশী অগ্নিহোত্রী। জ্যোতির্ময় এবং সৌমিত্র সাংসদ, তাই বিধানসভা ভোটে তাঁদের লড়ানো হবে না। লকেট নিজেই নির্বাচনে লড়ার বদলে সাংগঠনিক কাজে মনোনিবেশ করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। বাপি এবং শশীকেও সাংগঠনিক দক্ষতার জন্যই বেছে নেওয়া হয়েছে। তাঁদেরও নির্বাচনে লড়ানো হবে না বলেই দাবি বিজেপি সূত্রের।

এই বিন্যাসের মধ্যে ‘আদি’-‘নব্য’ মেলবন্ধনের চেষ্টাও দৃশ্যমান। ‘আদি’ বিজেপি হিসাবে পরিচিত বাপি বছরখানেক আগে পর্যন্ত জলপাইগুড়ি জেলা বিজেপির সভাপতি ছিলেন। গোটা উত্তরবঙ্গের বিজেপিতেই তাঁর পরিচিতি ‘দাপুটে নেতা’ হিসাবে। রাঢ়বঙ্গ থেকে বিজেপির টিকিটে পর পর দু’বার জিতে আসা সাংসদ সৌমিত্র ‘নব্য’দের তালিকায় পড়েন। কিন্তু কঠিন সময়ে নিজের এলাকায় সংগঠন ধরে রাখা, জনসংযোগে থাকা এবং সফল ভাবে ‘ভোট করিয়ে নেওয়া’র সক্ষমতা সৌমিত্রের জন্য ইতিবাচক হয়েছে। কলকাতার শশীও বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন ফরওয়ার্ড ব্লক থেকে। সদস্য সংগ্রহ পর্ব থেকে বুথ সশক্তিকরণ, বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজ দক্ষতার সঙ্গে সামলানোর ‘পুরস্কার’ পেয়েছেন তিনি। সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে অন্তত দু’জন মহিলাকে রাখার দলীয় নীতিও তাঁর জন্য সহায়ক হয়েছে। অগ্নিমিত্রার বিকল্প খুঁজতে বসে সাংগঠনিক কাজে শশীর চেয়ে ‘মনোযোগী’ মুখ বনসল আর খুঁজে পাননি বলেই বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে।

প্রবীণ রাজনীতিক তথা তৃণমূল নেতা ও বিধায়ক তাপস রায় বিজেপিতে শামিল হয়েছিলেন ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে। কিন্তু কলকাতার রাজনীতিতে তিনি অভিজ্ঞ মুখ। ভাবমূর্তিও মোটের উপর স্বচ্ছ। বিজেপি সূত্রের খবর, তাপসকে ‘যোগ্য’ স্থান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি শমীকই দিয়েছিলেন। তাপস রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি হয়েছেন। এ ছাড়া আলিপুরদুয়ারের সাংসদ মনোজ টিগ্গা, দুই প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী ও নিশীথ প্রামাণিকও সহ-সভাপতি হয়েছেন। ‘আদি’ বিজেপি রাজু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সঞ্জয় সিংহকে সহ-সভাপতি পদে রাখা হয়েছে। ‘নব্য’ তথা ফরওয়ার্ড ব্লক ছেড়ে বিজেপিতে শামিল হওয়া আর এক নেতা প্রবাল রাহাও পেয়েছেন সহ-সভাপতি পদ। শশীর মতো প্রবালও বিভিন্ন সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার ‘মনোযোগী ম্যানেজার’ হিসাবে দলে পরিচিতি পেয়েছেন। তারই ‘পুরস্কার’ পেয়েছেন তিনি। রাহুল সিংহের ঘনিষ্ঠ তথা যুব মোর্চার প্রাক্তন সভাপতি অমিতাভ রায় এবং শমীকের ঘনিষ্ঠ তথা মহিলা মোর্চার প্রাক্তন সভানেত্রী তনুজা চক্রবর্তীকেও রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি করা হয়েছে।

বহু বছর ধরে শমীকের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে থাকা বিদ্যাসাগর মন্ত্রীকে করা হয়েছে যুগ্ম কোষাধ্যক্ষ। দলের কোষাগারের উপরে সরাসরি নজর রাখতেই বিদ্যাসাগরকে শমীক ওই ‘গুরুদায়িত্ব’ দিয়েছেন বলে বিজেপি সূত্রে জানা যাচ্ছে। আলি হোসেনকে ফেরানো হয়েছে সংখ্যালঘু মোর্চার সভাপতি পদে। ২০১৪ সালের যে উপনির্বাচনে বসিরহাট দক্ষিণ আসনে জিতেছিলেন শমীক, সেই নির্বাচনের প্রচারে বসিরহাটের সংখ্যালঘু এলাকায় মাসাধিক কাল ঘাঁটি গেড়ে প্রচার চালিয়েছিলেন আলি। যুব মোর্চা এবং মহিলা মোর্চায় কোনও বদল করেননি শমীক। যথাক্রমে ইন্দ্রনীল খাঁ এবং ফাল্গুনী পাত্রকেই ওই দুই সংগঠনের সভাপতি পদে রেখে দেওয়া হয়েছে। তবে বদলে গিয়েছে এসসি মোর্চা, এসটি মোর্চা এবং ওবিসি মোর্চার সভাপতি। এসসি মোর্চার দায়িত্ব পেয়েছেন সুজিত বিশ্বাস। এসটি মোর্চা গিয়েছে মালদহ উত্তরের সাংসদ খগেন মুর্মুর হাতে। সুকান্তর শহর বালুরঘাটের বিজেপি নেতা শুভেন্দু সরকার পেয়েছেন ওবিসি মোর্চার দায়িত্ব।

Advertisement
আরও পড়ুন