শনিবার দলের পদাধিকারীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
এসআইআর আবহে রাজ্য সরকারের কাজের প্রচার যাতে ধাক্কা না-খায়, সেই লক্ষ্যে সময় ধরে দলকে কাজ নির্দিষ্ট করে দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। দলের প্রায় ১ লক্ষ পদাধিকারীর সঙ্গে শনিবার ভার্চুয়াল বৈঠক করে অভিষেক জানিয়ে দেন, দিনের বেলা এসআইআরের কাজ করতে হবে। তার পরে খানিকটা জিরিয়ে নিয়ে সন্ধ্যের পর থেকেই নেমে পড়তে হবে চলচ্চিত্র প্রদর্শনে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের প্রকল্পগুলিকে নিয়ে ছবি তৈরি হয়েছে। রাজ চক্রবর্তী পরিচালিত সেই ছবি ‘লক্ষ্মী এল ঘরে’তে অভিনয় করেছেন শুভশ্রী গঙ্গোপাধ্যায়, অঙ্কুশ হাজরা, সোহিনী সেনগুপ্তেরা। আনুষ্ঠানিক ভাবে সেই ছবির নির্মাণ রাজ্য সরকারের তথ্যসংস্কৃতি দফতর করলেও সেই ছবির চিত্রনাট্য শোনা থেকে মুখ্য পরিকল্পনা করেছিলেন অভিষেকই। শনিবারের বৈঠকে অভিষেক দলকে স্পষ্ট বলে দিলেন, দিনেরবেলা এসআইআরের কাজ মিটিয়ে সন্ধেবেলা পাড়ায় পাড়ায় পর্দা টাঙিয়ে ওই ছবি প্রদর্শন করতে হবে। যে পাড়ায় যবে ছবিটি দেখানো হবে, তার আগে সেখানে মাইকে প্রচারও করতে হবে।
দলকে কিছুটা ‘স্বাধীনতা’ও দিয়েছেন অভিষেক। তিনি বৈঠকে বলেন, ‘‘অনেক জায়গায় শুনছি সিনেমাটা দেখানোর পর খাওয়াদাওয়ার আয়োজন হচ্ছে। সেটা আপনাদের এক্তিয়ার। আপনারা করতেই পারেন।’’ তৃণমূলের অনেকের বক্তব্য, এই কথা বলে আসলে অভিষেক কৌশলে বার্তা দিলেন, শুধুমুখে সিনেমা দেখানো ঠিক হবে না। পারলে একটু খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত করুন স্থানীয় নেতৃত্ব।
এসআইআরের শুনানি পর্বে বাকি দিনগুলিতে কী ভাবে কাজ করতে হবে, তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন তৃণমূলের ‘সেনাপতি’। প্রায় ৭০ মিনিটের বক্তৃতার গোড়াতেই অভিষেক এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে ‘তৃণমূলের জয়’ হিসাবে তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা যা যা বলেছিলাম, সুপ্রিম কোর্ট সেগুলিকেই মান্যতা দিয়েছে।’’ এর পরেই অভিষেক জানিয়ে দেন, শুনানিতে ভোটারদের সঙ্গে দল নিযুক্ত বিএলএ-দের যেতে হবে। তাঁর বার্তা, ভোটারদের একা ছাড়া যাবে না।
‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’তে কাদের নাম রয়েছে, তার পঞ্চায়েত এবং পুরসভায় ওয়ার্ডভিত্তিক তালিকা প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। শনিবার বিকাল সাড়ে ৪টে নাগাদ অভিষেক বলেন, বৈঠক শুরুর আগেও তিনি খোঁজ নিয়েছেন, তালিকা টাঙানো হয়নি। তিনি জানান, যবেই এই তালিকা টাঙানো হোক, তার পর থেকে ১০ দিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে এই কাজই করতে হবে। ভোটার প্রতি বিএলএ-দের জন্য অনুমোদনপত্রের ধাঁচা শনিবারের মধ্যেই জেলায় জেলায় পাঠাবে ক্যামাক স্ট্রিট। বিধানসভা ভিত্তিক তা ছাপিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে এ-ও বলা হয়েছে যে, ভোটারের নথি আপলোড হওয়ার পরে তা ‘দিদির দূত’ অ্যাপেও আপলোড করতে হবে। যাতে কমিশনের উপর দল নজর রাখতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও নানাবিধ বিষয় কার্যকর না-হওয়া নিয়ে রবিবার কলকাতার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরে প্রতিনিধি দলও পাঠাচ্ছে তৃণমূল।
শুনানি প্রক্রিয়ায় বিএলএ-দের যুক্ত করার প্রসঙ্গে কমিশন যে নির্দেশিকা জারি করেছে, তাতেও ‘ফন্দি’ রয়েছে বলে অভিষেক বৈঠকে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আদালত বলেছে ভোটারেরা শুনানিকেন্দ্রে যেতে পারেন। চাইলে তিনি বিএলএ-কে নিযুক্ত করতে পারেন। কিন্তু কমিশনের নির্দেশিকায় ভোটারদের সশরীরে যাওয়া ‘বাধ্যতামূলক’ করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষিতেই অভিষেক বলেন, ‘‘আপাতত সব ভোটারের সঙ্গে বিএলএ-দের যেতে হবে। কাউকে একা ছাড়া যাবে না। বুথ স্তরে ভোট অধিকার রক্ষা কমিটিও গড়ে দেওয়া হচ্ছে। যাঁরা শুনানিতে ডাক পাওয়া ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝাবেন। কেন ডাকা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখবেন। তার পরে নথি নিয়ে জমা দিতে যাবেন।’’
দলের সামনে ভোটসংক্রান্ত আরও একটি ‘গোপন কৌশল’ উল্লেখ করেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘কমিশন ভার্চুয়াল বৈঠক করে জেলার নির্বাচনী আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছে মাইক্রো অবজার্ভারদের জন্য পৃথক পোর্টাল তৈরি করতে। এমন খবর পেলেই দলকে জানান। এটা করা যায় না। এটা বেআইনি। দরকারে আমরা আবার কোর্টে যাব।’’
শনিবার বৈঠকের শুরুতে প্রারম্ভিক ভাষণ দেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী। তিনি জানিয়েছেন, রবিবার (২৫ জানুয়ারি) জাতীয় ভোটার দিবস। ওই দিন রাজ্যের সর্বত্র ব্লকে ব্লকে এসআইআরে হয়রানির প্রতিবাদে বিক্ষোভ কর্মসূচি করতে হবে দলকে।
সাংসদেরা দিল্লি ছেড়ে এলাকায় ফিরুন
বেশ কিছু এলাকায় এসআইআর সংক্রান্ত দলের ওয়াররুম কাজ করছে না বলে উল্লেখ করেন অভিষেক। তা আগামী ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সক্রিয় করার বার্তা দেন দলের সাংসদদের। তৃণমূলের সাংসদদের উদ্দেশে অভিষেক বলেন, ‘‘এখন দিল্লি যেতে হবে না। বাজেটের দিনটা (১ ফেব্রুয়ারি) যাবেন। বাকি দিন এলাকায় থাকুন। ওয়াররুম সক্রিয় করুন। প্রয়োজনে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে সাংসদদের এই কাজ করতে হবে। আমরা অন্য দলের মতো আপনাদের বেতনের ৫০ শতাংশ নিই না। শীতঘুম কাটিয়ে নামুন!’’ সাংসদদের উদ্দেশে অভিষেক এ-ও বলেছেন যে, আগামী ১৫ দিন ধরে তিন দিন অন্তর অন্তর জেলার নির্বাচনী আধিকারিকের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সমন্বয় করতে হবে। দৈনিক কাজের রিপোর্ট পাঠানো বাধ্যতামূলক। যে যে এলাকায় তৃণমূলের লোকসভার সাংসদ নেই, সেখানে সেখানে রাজ্যসভার সাংসদদের পাঠানো হবে বলেও জানিয়ে দিয়েছেন অভিষেক। তবে ওয়াররুম সক্রিয় করতেই হবে। জেলার নির্বাচনী আধিকারিকদের উপর ধারাবাহিক ‘চাপ’ রাখার বার্তা দিয়েছেন অভিষেক।
চলবে ‘উন্নয়নের পাঁচালি’
মমতার সরকারের ১৫ বছরের খতিয়ান তুলে ধরতে ইতিমধ্যেই ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ প্রকাশিত হয়েছে। তা পাড়ায় পাড়ায় প্রচার করছে মহিলা তৃণমূল। সেই কাজ চালিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন অভিষেক। অর্থাৎ, এসআইআরের জন্য ‘উন্নয়নের পাঁচালি’ প্রচার যেন থমকে না-যায়। সমান্তরাল ভাবেই সব কাজ চালু রাখতে হবে।