ইজরায়েলের রামাত গানে ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত আবাসন। ছবি: পিটিআই।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াধে আমেরিকান দূতাবাসে ভোরবেলা হামলা চালাল ইরানি ড্রোন। পাল্টা আক্রান্ত হল ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যম ‘আইআরআইবি’ চত্বর আর দেশের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর সংলগ্ন এলাকাও। সেই সঙ্গে ক্রুদ্ধ ট্রাম্প ইরানকে বদলার হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন, ‘ওদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী এবং নেতৃত্ব— সব শেষ। ওরা এখন কথা বলতে চায়। আমি বলেছি, বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে।’ অন্য দিকে, ইজ়রায়েল আরও আগ্রাসী হল লেবাননে।
আজ রিয়াধের আকাশে বেশ কিছু ইরানি ড্রোন প্রতিহত করা হলেও, দু’টি আঘাত হানে সেখানকার আমেরিকান দূতাবাস চত্বরে। দূতাবাসের ভিতরে আগুন ধরে যায়। কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় রিয়াধের কূটনৈতিক এলাকা। সৌদির প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, হামলায় কোনও প্রাণহানি হয়নি, তবে ‘সীমিত অগ্নিকাণ্ড’ এবং কিছু ‘ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। সৌদির বিদেশ মন্ত্রক এই হামলার কড়া নিন্দা করে বলেছে, নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় ‘পাল্টা জবাব দেওয়ার অধিকার’ তাদের রয়েছে।
রিয়াধের আগে কুয়েতের আমেরিকান মিশনেও একই ধরনের ড্রোন হামলা হয়েছিল। দাহরানের আমেরিকান কনস্যুলেট নিশানা করে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার আশঙ্কায় বিশেষ নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয়েছে। জেড্ডা, রিয়াধ এবং দাহরানে থাকা আমেরিকান নাগরিকদের বলা হয়েছে, নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে। সৌদি আরব, কুয়েতে দূতাবাস বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। কাতার, বাহরিন, ইরাক এবং জর্ডন থেকে আমেরিকান কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্য ও বাড়তি কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তেহরানে আজ আমেরিকা এবং ইজ়রায়েল এই যুদ্ধে প্রথম বারের জন্য ‘লুকাস’ সুইসাইড ড্রোন ব্যবহার করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হামলা চালিয়েছে। এ দিকে, রাষ্ট্রপুঞ্জের পরমাণু তদারকি সংস্থা আইএইএ কৃত্রিম উপগ্রহের ছবির মাধ্যমে নাতানজ় পারমাণবিক কেন্দ্রের প্রবেশপথের ভবনগুলো ধ্বংস হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে। রুশ সংস্থা ‘রোসাটম’ ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে এবং সেখান থেকে ৬০০ কর্মীকে সরিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। কেরমান প্রদেশে আমেরিকান-ইজ়রায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১৩ জন ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্য নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ ইরানের জাস্ক বন্দরে হামলায় প্রায় ১০০টি মাছ ধরার নৌকা ভস্মীভূত হয়েছে।
রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৮১২ জনের। প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত। বিমান হামলার আতঙ্কে তেহরান-সহ বিভিন্ন বড় শহরের বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন। রাস্তায় দীর্ঘ যানজট। বহু মানুষ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়ে রাত কাটাচ্ছেন। যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় হিসেবে দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে ঘটনাটি তুলে ধরা হচ্ছে। যদিও ইজ়রায়েল দাবি করেছে, এটি আইআরজিসি-র কারিগরি ত্রুটি বা অন্তর্ঘাত হতে পারে। আর আমেরিকান সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, তারা ‘সামরিক অভিযানের ফলে অসামরিক ক্ষয়ক্ষতির’ রিপোর্টগুলো খতিয়ে দেখছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার শাখা এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
ঘটনাচক্রে, গত কালই রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে আয়োজিত একটি বিশেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন মেলানিয়া ট্রাম্প—যা কোনও রাষ্ট্রপ্রধানের পত্নী হিসেবে বিশ্বে প্রথম। ‘সংঘাতের আবহে শিশু, প্রযুক্তি এবং শিক্ষা’ শীর্ষক ওই সম্মেলনে তিনি বলেছেন, “আমেরিকা বিশ্বের সমস্ত শিশুর পাশে আছে।” রাষ্ট্রপুঞ্জে ইরানের দূত আমির সইদ ইরাভানি এই অধিবেশনকে ‘চরম লজ্জাজনক এবং ভন্ডামি’ বলে অভিহিত করেছেন। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল। সে কথা উল্লেখ করে এই হামলার কড়া নিন্দা করেছেন নোবেলজয়ী শিক্ষা আন্দোলনকর্মী মালালা ইউসুফজ়ায়ি। ঘটনার নিন্দা করেছেন রাষ্ট্রপুঞ্জে চিনের দূত ফু কং-ও।
ইজ়রায়েলি সেনা গত কাল রাতেই দক্ষিণ লেবাননের পুরো সীমান্ত খালি করতে বলে সতর্ক করেছিল। আজ ইজ়রায়েলি পদাতিক বাহিনীর ঢোকার পরে লেবানিজ় সেনা অন্তত সাতটি জায়গা থেকে সরে গিয়েছে। বেরুটের দক্ষিণ শহরতলিতে হিজ়বুল্লার কমান্ড সেন্টার এবং হিজ়বুল্লাহ গোয়েন্দা সদর দফতরের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রভান্ডার ও স্যাটেলাইট যোগাযোগের যন্ত্রাংশ ধ্বংস করা হয়েছে। ভারী বোমাবর্ষণ হয়েছে ‘আল-মানার’ টিভির সদর দফতরে।
হিজ়বুল্লা পাল্টা উত্তর ইজ়রায়েলের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে তিন দফায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে একটি ইজ়রায়েলের একটি বসতবাড়িতে সরাসরি আঘাত করায় আহত হয়েছেন এক জন। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রক আজ জানিয়েছে, গত দু’দিনে ইজ়রায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৫২, যার মধ্যে সাতটি শিশু রয়েছে। আহত ২৪৬ জন। যুদ্ধের জেরে লেবাননে আশ্রয় নেওয়া প্রায় পাঁচ লক্ষ সিরিয়ার শরণার্থী নতুন করে সঙ্কটে পড়েছেন। লেবানন সরকার অবশ্য হিজ়বুল্লার সামরিক তৎপরতাকে ‘বেআইনি’ ঘোষণা করেছে।
এ দিকে, ওমানের ডুকম বাণিজ্যিক বন্দরের জ্বালানি ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে আজ বেশ কয়েকটি ড্রোন হামলা হয়েছে। একটি ড্রোন সরাসরি একটি ট্যাঙ্কারে আঘাত হানে। তবে কোনও প্রাণহানি ঘটেনি। কালও এই বন্দরে হামলা হয়েছিল। আজ প্রথম বারের জন্য আক্রান্ত হয়েছে ওমানের অন্যতম প্রধান বন্দর সালালা। ডুকম বন্দর, আসিয়াদ ড্রাই ডক এবং সালালা বন্দরের জেনারেল কার্গো টার্মিনালের সমস্ত কাজকর্ম স্থগিত করা হয়েছে। ইরান অবশ্য আনুষ্ঠানিক ভাবে ওমানে হামলা চালানোর খবর অস্বীকার করেছে। তেহরানের দাবি, তারা প্রতিবেশীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত নয়।
দিল্লি থেকে ময়ূর সিংহাসন লুট করে তেহরানের গোলেস্তান প্রাসাদে রেখেছিলেন নাদির শাহ। অনেক দিন ছিল সেখানে। ইজ়রায়েল-আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র হানায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত ষোড়শ শতাব্দীর সেই প্রাসাদ। ছবি: রয়টার্স।
কাতার আনুষ্ঠানিক ভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে তাদের কোনও ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগ নেই। ফ্রান্স ও গ্রিস এই অঞ্চলে তাদের সামরিক সতর্কতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। জার্মানি ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ‘বেপরোয়া’ আচরণের কড়া নিন্দা জানিয়েছে। সাইপ্রাসে অবস্থিত ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে হামলার পর ব্রিটেন সেখানে বাড়তি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আকাশপথ রুদ্ধ হওয়ায় ইজ়রায়েল সাইপ্রাস থেকে বিশেষ মালবাহী কন্টেনার জাহাজে করে তাদের চিকিৎসকদের দেশে ফেরাচ্ছে। এই আবহে রুশ বিদেশমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ সতর্ক করেছেন, এই সংঘাত পুরো অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূত্রপাত ঘটাবে। আমেরিকার এই ‘একতরফা’ সামরিক পদক্ষেপের সমালোচনা করে মস্কো বলেছে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছিল বলে প্রমাণ তাদের কাছে নেই।