Russia-Ukraine War

দিনের নিরিখে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে ছাপিয়ে গেল রাশিয়া-ইউক্রেন লড়াই! পুতিনের সামনে এখন শুধু হিটলার-স্তালিন

ইউক্রেনের সেনাবাহিনী টানা সাড়ে চার বছর ধরে যে ভাবে প্রবল শক্তিশালী রুশ ফৌজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তা দেখে চমকে গিয়েছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের অনেকেই।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ ১৬:২৩
Day 1,569 of Russia-Ukraine war, list of key events

(বাঁ দিক থেকে) স্তালিন, পুতিন এবং হিটলার। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ৬টায় (মস্কোর স্থানীয় সময়) রাশিয়ার সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে জাতির উদ্দেশে বক্তৃতায় কিভের বিরুদ্ধে ‘সামরিক অভিযানের’ কথা ঘোষণা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেনের ‘নির্দিষ্ট ৭০টি লক্ষ্যে’ ক্রুজ় ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমান হামলা চালিয়েছিল রুশ ফৌজ। পরবর্তী ধাপে শুরু হয়েছিল স্থলপথে অভিযানও। সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের পূর্বাভাস ছিল, কয়েক মাসের মধ্যেই পরাস্ত হবে ইউক্রেন। কিন্তু ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কির বাহিনী টানা চার বছর ধরে যে ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তা দেখে চমকে গিয়েছেন অনেকেই।

Advertisement

২০২২ সালের মে মাসে উত্তর ও পূর্ব ইউক্রেনের জ়াপোরিঝিয়া, খারকিভ, ওডেসা-সহ বিভিন্ন এলাকার দখল নিয়েছিল পুতিনসেনা। কিন্তু ২০২৩ সালে শীতের পর তার বড় অংশই পুনর্দখল করেছিল আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের সাহায্যপুষ্ট জ়েলেনস্কির বাহিনী। বর্তমান পরিস্থিতি বলছে পূর্ব ইউক্রেনের ডনবাস (ডনেৎস্ক এবং লুহানস্ক অঞ্চলকে একত্রে এই নামে ডাকা হয়) অঞ্চলের বড় অংশ রুশ বাহিনীর কব্জায় থাকলেও মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপে কিভের প্রতিরক্ষাবলয় এখনও মজবুত। ফলে আপাতত নির্ণায়ক জয়-পরাজয়ের কোনও সম্ভাবনা নেই। অনিশ্চয়তার এই আবহেই বৃহস্পতিবার ১,৫৬৯তম দিনে পা দিয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।

ইতিহাস বলছে, ইতিমধ্যেই মেয়াদের নিরিখে প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে পিছনে ফেলে দিয়েছে পুতিনের ইউক্রেন অভিযান। বসনিয়ায় আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যাকাণ্ডের জেরে ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া এবং হাঙ্গেরি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল সার্বিয়ার বিরুদ্ধে। ওই ঘটনাই ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা। তার ৪ বছর ৩ মাস (১৫৬৪ দিন) পরে, ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর ফ্রান্সের কমপিয়েঁতে মিত্রবাহিনীর কাছে জার্মানি এবং তার সহযোগীদের আত্মসমর্পণের পরে শেষ হয়েছিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধ।

তবে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের নিরিখে এখনও ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। জার্মানির নাৎসি একনায়ক হিটলারের পাশাপাশি যে যুদ্ধের অন্যতম কুশীলব ছিলেন ক্রেমলিনে পুতিনের এক পূর্বসূরি— জোসেফ স্তালিন। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মান স্থলসেনার প্যানজ়ার ডিভিশন আর বিমানবাহিনী ‘লুফৎওয়াফে’ পোল্যান্ডে ঝটিকা হামলা চালিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেছিল। পশ্চিম সীমান্তে পোল্যান্ড সেনা জার্মানির বিরুদ্ধে মরণপণ প্রতিরোধ চালানোর সময়ই স্তালিনের নির্দেশে ১৯৩৯-এর ১৭ সেপ্টেম্বর সোভিয়েত রেড আর্মি পূর্ব দিক থেকে পোল্যান্ডে হামলা চালিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মেয়াদ ছিল ৬ বছরেরও বেশি (২,১৯২ দিন)! ১৯৪৫ সালের ২ মে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে নাৎসি জার্মানির আত্মসমর্পণের পরেও জাপান যুদ্ধ চালিয়ে গিয়েছিল। শেষপর্যন্ত হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পরমাণু হামলার অভিঘাত ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর টোকিও উপসাগরে মার্কিন রণতরী ইউএসএস মিসৌরিতে জাপানকে আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মসমাপ্তির দলিলে সই করতে বাধ্য করে। ইতিহাসবিদদের একাংশ বলছেন, প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ইউক্রেনের যুদ্ধও আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংঘাত-পর্বগুলির মধ্যে একটি হিসেবে ভবিষ্যতে বিবেচিত হবে।

ইউক্রেনীয় ইতিহাসবিদ ইয়ারোস্লাভ হ্রিৎসাক বলেন, ‘‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মতোই আমাদের যুদ্ধও ইউরোপের সামরিক জোটগুলিকে পুনর্গঠিত করেছে এবং কয়েক দশকে দেখা যায়নি এমন প্রতিরক্ষা সম্প্রসারণকে ত্বরান্বিত করে ইউরোপের ভূরাজনীতিকে বদলে দিয়েছে।’’ ফরাসি কর্নেল এবং সামরিক ইতিহাসবিদ মিশেল ঘোয়া ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেছেন, “অনেক দিক থেকেই, ইউক্রেনের যুদ্ধের সঙ্গে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বেশ মিল রয়েছে। তুলনাটি শুরু হয় উভয় যুদ্ধের প্রারম্ভিক পর্যায় থেকে। ১৯১৪ সালে, জার্মানরা দ্রুত বিজয় নিশ্চিত করার আশায় প্যারিসের দিকে একটি ঝটিকা আক্রমণ শুরু করেছিল। ২০২২ সালে রুশ বাহিনী একই লক্ষ্য নিয়ে ইউক্রেনের রাজধানী কিভের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। উভয় ক্ষেত্রেই, আক্রমণকারীরা তাদের লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত তাদের পিছু হটতে বাধ্য করা হয়।’’ এর পর দু’টি যুদ্ধই মূলত স্থবির ও স্থিতিশীল লড়াইয়ে পরিণত হয়।’’ ২০২২ সালের শেষ দিকে যখন ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে সেনারা পরিখা ও বাঙ্কারে অবস্থান নিয়েছেন। সামরিক ইতিহাসবিদরা এটিকে ‘প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-শৈলীর পরিখা যুদ্ধের প্রত্যাবর্তন’ হিসাবে বর্ণনা করেন। ট্যাঙ্কের আগমন বাঙ্কার গুঁড়িয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছিল। কিন্তু আমেরিকার দেওয়া ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ‘এফজিএম-১৪৮ অ্যান্টি ট্যাঙ্ক জ্যাভলিন’ ক্ষেপণাস্ত্র পুতিনের সেই আশাপূরণের পথে বড় বাধা।

Advertisement
আরও পড়ুন