ছবি: সংগৃহীত।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গত কাল এ বারের পুলিৎজ়ার পুরস্কার ঘোষিত হয়েছে। এই বছর একাধিক বিভাগে সম্মানিত হয়েছেন ভারতীয় সাংবাদিক ও শিল্পীরা। সচিত্র প্রতিবেদন ও ভাষ্য (ইলাস্ট্রেটেড রিপোর্টিং অ্যান্ড কমেন্ট্রি) বিভাগে পুরস্কৃত ব্লুমবার্গের দলে আছেন আনন্দ আর কে ও সুপর্ণা শর্মা। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন (ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্টিং) বিভাগে পুরস্কৃত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) অনুসন্ধানী দল। সচিত্র প্রতিবেদন ও ভাষ্য বিভাগে চূড়ান্ত মনোনীতদের তালিকায় রয়টার্সের দেবজ্যোতি ঘোষালের নাম ছিল।
ডিজিটাল অ্যারেস্টের নামে আট দিন গৃহবন্দি ছিলেন লখনউয়ের এক স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ। ভিডিয়ো কলে পুলিশ সেজে সাইবার অপরাধীরা ভয় দেখিয়ে তাঁর থেকে হাতিয়ে নেয় প্রায় বিপুল অঙ্কের টাকা। পুলিৎজ়ারজয়ী ব্লুমবার্গের সচিত্র প্রতিবেদন ‘ট্র্যাপড’-এ সুপর্ণা, আনন্দ ও নাটালি ওবিকো পিয়ারসন দেখিয়েছেন, কী ভাবে হাতের ফোনের সাধারণ একটি অ্যাপ অজান্তেই হয়ে উঠছে ফাঁদ। ‘ট্র্যাপড’ শব্দটির মধ্যে থাকা ‘অ্যাপ’ অংশটুকু বড় হাতের অক্ষরে লিখে সে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তাঁরা। দেখিয়েছেন, এখানে শুধু টাকা চুরি নয়, অপরাধীরা ‘কগনিটিভ ক্যাপচার’-এর মাধ্যমে মানুষের চিন্তাশক্তিকেও কব্জা করে নেয়। আনন্দের আঁকা ছবি ও সুপর্ণার শব্দের বুননে প্রতিবেদনটিতে গ্রাফিক নভেলের মতো ফুটে উঠেছে সেই মনস্তাত্ত্বিক কারসাজিই।
হাতের ফোন বা রাস্তার নজরদারি ক্যামেরা থেকে সারাক্ষণ কিছু অদৃশ্য রশ্মি বেরোয়, যেগুলি খালি চোখে দেখা যায় না। বিশেষ ইনফ্রারেড ক্যামেরায় সেই ‘অদৃশ্য নজরদারি’র ছবিই সামনে এনেছেন এপি-র সাংবাদিকেরা। সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি ব্যবহার করে কী ভাবে আমেরিকান সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের নজরদারি ব্যবস্থা সাধারণ মানুষ কিংবা গাড়ির গতিবিধি নজরে রাখে, তিন বছরের এই তদন্তে সেটাই স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন বিভাগে পুলিৎজ়ারজয়ী এই কাজ দেখিয়েছে, সাইবার অপরাধী থেকে রাষ্ট্রীয় নজরদারি— ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত পরিসর আজ কতটা বিপন্ন।
ডিজিটাল জালিয়াতির কারসাজির আর এক পিঠ ধরা পড়েছে রয়টার্সের দেবজ্যোতি ঘোষালের কাজে। সচিত্র প্রতিবেদন বিভাগে চূড়ান্ত মনোনয়নের তালিকাভুক্ত ‘স্ক্যামড ইনটু স্ক্যামিং’ নামে তাঁর কাজটিতে রয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘সাইবার ক্রীতদাস’দের কথা— চাকরির টোপ দিয়ে কী ভাবে বহু মানুষকে পাচার করা হয় ও বাধ্য করা হয় আন্তর্জাতিক জালিয়াতি চক্রের কল সেন্টার চালাতে।
১৯৩৭-এ বিজ্ঞান সাংবাদিকতায় গোবিন্দ বিহারী লালের হাত ধরে পুলিৎজ়ারে ভারতীয়দের যে যাত্রার শুরু, ২০২৬-এ তা ডিজিটাল মনস্তত্ত্ব ও প্রযুক্তির ব্যবচ্ছেদে নতুন মাত্রা পেল। আনন্দ-সুপর্ণাদের সাফল্য বুঝিয়ে দিল, তথ্যের কারচুপি বা নজরদারি যত প্রযুক্তিগত হচ্ছে, সত্য অনুসন্ধানের হাতিয়ারও হচ্ছে ততটাই বিজ্ঞাননির্ভর।