—প্রতীকী চিত্র।
শহরের উষ্ণতম দিনে/ পিচগলা রোদ্দুরে— প্যারিস শহরে আজ মনে হয় সবার মনের ভাব এটাই। প্রেমের শহর প্যারিসের গোধূলি আলো রাঙিয়ে দেয় সেন নদীর তীর, শঁসে লিজ়ে-র পৃথিবী বিখ্যাত বুলেভার্ডে উপচে পড়া পর্যটকদের ভিড় যে গ্রীষ্মকালকে উপভোগ করে, সেই শহর আজ যেন এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লেলিহান অগ্ন্যুপাতে পুড়ে যাচ্ছে। একে ফরাসি ভাষায় বলে ‘ক্যানিকুলা’।
‘বিশ্ব উষ্ণায়ন’— এই দু’টি শব্দ এত দিন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির জন্যই যেন প্রাসঙ্গিক ছিল। সে আফ্রিকা হোক বা ভারতীয় উপমহাদেশ— যেখানে গ্রীষ্মের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক উচ্চতায় পৌঁছে যায়। প্রথম বিশ্বের লোকজনের কাছে সেটা আলোচনার বিষয়বস্তু হত মাত্র। কিন্তু আজ তাঁরা অনুভব করছেন এই দহনজ্বালা। বুঝতে পারছেন এই অগ্নিস্রাবী গরম সাদা-কালো, গরিব-ধনী— কোনও জাতপাত, বিভাজনকেই মানে না। এই বায়ুমণ্ডল আর কিছু দিন পরে মানুষের বসবাসের যোগ্য থাকবে কি না, সেটা হয়তো বিজ্ঞানীদের গবেষণার বিষয়বস্তু। কিন্তু উষ্ণায়নের ফল এই ভাবে ইউরোপের উপরে, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপের উপরে পড়বে, তা বোধহয় কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। প্রথম বিশ্বের দেশুগুলির একটা সমস্যা হল, এরা প্রচণ্ড বাঁধাধরা নিয়মের মধ্যে জীবনটাকে বেঁধে ফেলে। তাই যখনই নিয়মের কিছু ব্যতিক্রম হয়, তখনই তারা কার্যত দিশাহীন হয়ে পড়ে। ত্রাহি ত্রাহি রব উঠতে থাকে।
প্যারিসের বাড়িগুলির কথাই ধরা যাক, এখানের বাড়িগুলি যে হেতু হেরিটেজ তকমা পাওয়া, তাই বাড়িগুলির কোনও সংস্কার করা যাবে না। ফলে এখানের বাড়িগুলিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র লাগানোর কোনও ব্যবস্থা নেই। ফ্রান্সের রাজধানীতে সাধারণত গরম থাকে মেরেকেটে ৩-৪ সপ্তাহ। তাই কেউ এই সব বিষয় নিয়ে এত দিন মাথাও ঘামায়নি। দ্বিতীয়ত, প্যারিসে যে হেতু বছরের বেশির ভাগ সময় ঠান্ডা থাকে, তাই বাড়িগুলি তৈরির করা হয়েছিল এমন ভাবে যাতে ইট এবং ইট-জাতীয় পদার্থগুলি তাপশোষক হয়। ঘর গরম রাখতে পারে। শুধু বাড়ি বা অফিসগুলি কেন! বাস, ট্রাম, ট্রেনের ক্ষেত্রেও একই প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে। স্বভাবতই, প্যারিসের তাপমাত্রা যখন ৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পার করে যাচ্ছে, তখন শহরবাসী বুঝে উঠতে পারছেননা কী করবেন!
এই গরম সহ্য করতে না পেরে গা ভেজাতে অনেকেই সেন নদীতে নামছেন, একটু ঠান্ডার খোঁজে। তাতে বিপত্তিও ঘটছে। ইতিমধ্যেই কমপক্ষে ১৫ জন ওই নদীতে ডুবে মারা গিয়েছেন। বিপত্তি ঘটছে পথে-ঘাটে। প্যারিস শহরেই বাস চালাতে চালাতে গরমে জ্ঞান হারান এক বাসচালক। বাসটি দুর্ঘটনার কবলে পড়লেও বড় কোনও অঘটন ঘটেনি। ট্রেনে বহু যাত্রী অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন বলে খবর। অনেক জায়গায় জ্ঞান হারানো যাত্রীদের চিকিৎসার জন্য নামিয়ে দেওয়া হয়েছে কোনও স্টেশনে।
এসির ব্যবস্থা যেমন নেই, তেমন নেই সিলিং ফ্যানের ব্যবস্থাও। তাই টেবিল ফ্যান কিনতে দোকানগুলিতে ভিড় উপচে পড়ছে। লাইনে দাঁড়িয়ে টেবিল ফ্যান কেনার দুঃসহ অভিজ্ঞতা অনেক দিন মনে থাকবে। জলের ক্রেটগুলির চাহিদা তুঙ্গে। সুপার মার্কেটগুলিতে সপ্তাহান্তে জলের ক্রেট পাওয়া দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। আইসক্রিমের শেল্ফগুলি মুহূর্তে ফাঁকা হয়েছে যাচ্ছে। জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছে বড় বড় মার্কেটগুলি। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলির অবস্থাও তথৈবচ। অনেক অফিসেই এসির ব্যবস্থা নেই। যে অফিসগুলিতে রয়েছে সেখানেও এত গরমে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটি খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
আমরা ভারতীয়েরা যেমন শীতকালটাকে উপভোগ করি, এখানে ফরাসিরা গরমকালকে উপভোগ করেন। বাইরে বসে খাওয়ার একটা চল রয়েছে এই শহরে। এ বারে দহনজ্বালায় তা-ও আর উপভোগ্য হচ্ছে না। রাস্তাঘাটে, অফিস-আদালতে অনেককেই বলতে শোনা যাচ্ছে, “এই নিদারুণ পরিস্থিতির জন্যআমরাই দায়ী।”
৮৬ বছর আগে এক রাষ্ট্রপ্রধান তাঁর সেনাপ্রধানকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘‘ইস প্যারিস বার্নিং? প্যারিস কি জ্বলছে?’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগুন সে দিন প্যারিসকে জ্বালাতে পারেনি। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্ররোষে এ বছর এই প্রেমের শহর সত্যিই জ্বলছে।