Review of Books

কবিকে ছুঁয়ে আত্ম অন্বেষণ, এক প্রাণবন্ত মজলিশ

সেই কারণেই বইটি কেবল ফয়েজ়কে আবিষ্কারের এক মনোজ্ঞ বিবরণ হয়ে থেকে যায় না, এটি লেখকের নিজস্ব বৌদ্ধিক, মানসিক এবং রাজনৈতিক বিকাশেরও দলিল হয়ে ওঠে।

কথাকলি জানা
শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ ০৫:৫৬

ফয়েজ়-পরিক্রমা এক আশ্চর্য বই। আশ্চর্য শুধু এই কারণে নয় যে, বইটির লেখক নীলাঞ্জন হাজরা তাঁর যাপনের সঙ্গে উর্দু ভাষার কিংবদন্তি ফয়েজ় আহমেদ ফয়েজ়ের গভীর সংযোগের কথা বলতে গিয়ে কবির সঙ্গে তাঁর আজীবনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের আখ্যান বর্ণনা করেছেন। আশ্চর্য এই কারণে যে, প্রিয় কবি বা লেখককে এত অন্তরঙ্গ ভাবে উপলব্ধি করার জন্য ক’জনই বা এ ভাবে জীবন সমর্পণ করেন! তথ্য-প্রমাণ জোগাড়ের জন্য ক’জন এমন চষে বেড়ান পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত? আর সেই বৃত্তান্ত এমন সাবলীল অথচ সুগভীর বয়ানে তুলে ধরেন পাঠকের কাছে?

নীলাঞ্জনের ফয়েজ়কে নিয়ে দীর্ঘ সফর যতটা আত্ম অন্বেষণের, ততটাই ভৌগোলিক। সেই কারণেই বইটি কেবল ফয়েজ়কে আবিষ্কারের এক মনোজ্ঞ বিবরণ হয়ে থেকে যায় না, এটি লেখকের নিজস্ব বৌদ্ধিক, মানসিক এবং রাজনৈতিক বিকাশেরও দলিল হয়ে ওঠে। মাত্র ক্লাস ফোরে ভিনদেশি এক সুর কোন পথে তাঁর কর্ণে ও মর্মে প্রবেশ করে, পরে সেই সুর গজলের মাতলা এবং মকতা বেয়ে তাঁর মধ্যে তৈরি করে দেয়কবির সঙ্গে এক নিবিড় আত্মীয়তা, এবং কী ভাবে সেই স্পন্দমান সম্পর্কের টানে নীলাঞ্জন ক্রমশ কবির জগতে আবিষ্ট হয়ে পড়েন, বইটি তারই এক বহুস্তরী আখ্যান।

লেখকের আজীবনের এই উষ্ণ অবগাহন পাঠককেও টেনে নেয় তার আবর্তে। তাঁর সঙ্গেই পাঠক প্রবেশ করেন ফয়েজ়ের জীবন, কবিতা, রাজনীতি ও ইতিহাসের দুনিয়ায়। নীলাঞ্জনের গদ্য যেমন সংবেদী ও মজলিশি, তেমনই গভীর আত্মমগ্নতায় ঋদ্ধ। তার প্রতিটি স্তরে অনুভব করা যায় কবিকে আরও নিবিড় ভাবে ছুঁয়ে দেখার নিরলস আকুলতা।

ফয়েজ়-পরিক্রমা

নীলাঞ্জন হাজরা

৪০০.০০

এবং অধ্যায়

তবে কি এই বইয়ে শুধুই কবিকে ধরার চেষ্টা করলেন লেখক? না, এই বইয়ের প্রসার তার চেয়ে অনেক বড়। ফয়েজ়ের সময়, পরিপার্শ্ব এবং ইতিহাস অবধারিত ভাবে নানান রাজনৈতিক ঘাত-প্রতিঘাত’সহ ধরা দিয়েছে নীলাঞ্জনের মেধাবী বিশ্লেষণে। ফয়েজ়ের ঠিকুজি-কুলজির অনুসন্ধানে নীলাঞ্জন যেমন ওয়ালি মোহাম্মদ, মীর তাকি মীর ও গালিবের সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের সূত্রগুলির সন্ধান করেছেন, তেমনই ফয়েজ়কে এক আদ্যন্ত রাজনৈতিক মানুষ হিসাবে দেখে তাঁর মতাদর্শ, রাজনৈতিক অবস্থান ও কর্মকাণ্ডেরও সূক্ষ্ম পর্যালোচনা করেছেন তিনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ফয়েজ়ের ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক, তারও সাক্ষ্যপ্রমাণ-সহ বিচার করেছেন লেখক।

তবে এতটুকু বললে বইটি সম্পর্কে বিশেষ কিছুই বলা হয় না। কারণ এটি শুধু একটি বিশ্লেষণধর্মী লেখা নয়, একই সঙ্গে এক প্রাণবন্ত মজলিশ যেন। বই জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কবিতা/গজলের অনুবাদ এবং অসংখ্য কিউআর কোড পাঠককে নিয়ে যায় গীত, গজল, ফয়েজ়ের স্বকণ্ঠে কবিতাপাঠ এবং আরও নানা উপকরণের কাছে। ফলে পাঠ কেবল শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ক্রমশ বহুস্তরীয় এক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। পড়তে পড়তে এবং শুনতে শুনতে পাঠকও যেন নিজস্ব এক সমান্তরাল সফরে শামিল হয়ে পড়েন।

বইটির নামকরণের সার্থকতা এতক্ষণে নিশ্চয়ই স্পষ্ট। সূর্যকে কেন্দ্র করে যেমন পৃথিবী তার কক্ষপথে আবর্তিত হয়, তেমনই লেখকও ফয়েজ়কে কেন্দ্র করে ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে, কৈশোর থেকে যৌবনে, যৌবন থেকে মাঝবয়সে। তাঁর অনুসন্ধান ও মননের কেন্দ্রবিন্দুতে সর্বদা থেকেছেন ফয়েজ়। এই পরিক্রমার সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এই যে, এটি ফয়েজ়কে ফিরে দেখার পাশাপাশি জীবনী ও মননশীল গবেষণার সম্ভাবনাকেও প্রসারিত করে। ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা, সাহিত্যের ইতিহাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং ভ্রমণবৃত্তান্ত— এই উপাদানগুলিকে একসূত্রে গাঁথার যে উচ্চাভিলাষ বইটি ধারণ করে, তার সফল বাস্তবায়নই একে সাম্প্রতিক বাংলা গদ্যের একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন করে তুলেছে।

আরও পড়ুন