Book Review

নারীর শ্রমের বহুমাত্রিকতা

টানা একটি বই হিসেবে না দেখে, আটটি প্রবন্ধের সঙ্কলন হিসেবে দেখা ভাল কাজটিকে। নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন লেখিকাদ্বয়।

অন্বেষা সেনগুপ্ত
শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ ০৭:১৫

সহোদরা ঈশিতা ও দীপিতা চক্রবর্তী তাঁদের গবেষণার ক্ষেত্রেও সহযাত্রিণী। পেশায় তাঁরা এক জন ইতিহাসবিদ, অন্য জন অর্থনীতিবিদ। কিন্তু তাঁদের দু’জনের গবেষণার কেন্দ্রেই রয়েছেন রোজগেরে মেয়েরা— বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত গণ্ডির বাইরে যাঁরা, তাঁরা। মেয়েদের শ্রম ও তাঁদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পর্বের (বিয়ে, মাতৃত্ব ও বৈধব্য) মধ্যে যোগাযোগ তাঁদের ভাবিয়েছে। সেই ভাবনার ফসল এই বইটি।

টানা একটি বই হিসেবে না দেখে, আটটি প্রবন্ধের সঙ্কলন হিসেবে দেখা ভাল কাজটিকে। নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন লেখিকাদ্বয়। বিশ শতকের গোড়ায় যখন নানা পত্রপত্রিকায় বিধবা মেয়েদের রোজগার করার পক্ষে সওয়াল করা হচ্ছে, তখনই কেন সেই একই কাগজপত্রে আমরা পাচ্ছি মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধি নিয়ে হিন্দুদের উদ্বেগ বিষয়ে অসংখ্য লেখা? কোনও যোগাযোগ কি রয়েছে এই দুই বিষয়ের মধ্যে? বিশ শতকের শেষে/একুশ শতকের গোড়াতেও কেন পশ্চিমবঙ্গের শহরগুলিতে ছোট মেয়েদের কাজে যোগদানের হার দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি? অন্য দিকে, ঐতিহাসিক ভাবে এ রাজ্যে পারিশ্রমিক-ভিত্তিক কাজে মেয়েদের উপস্থিতি কম কেন? পশ্চিমবঙ্গে মেয়েদের শ্রমজগতের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা জমির মালিকানার ধরন ও বিয়ে-বৈধব্যের সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতিনীতির দ্বারা প্রভাবিত, বা তাকে প্রভাবিত করে? দেশভাগ কী ভাবে পাল্টে দিয়েছিল গৃহশ্রমের বাজার? ঔপনিবেশিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক পশ্চিমবঙ্গে গৃহস্থ-গৃহশ্রমিকদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল; ১৯৪৭-এর আগে-পরে কি তাতে কোনও বদল এসেছিল? লোকে বলে বাঙালির ব্যবসা হয় না, কিন্তু ঔপনিবেশিক বাংলার পুঁজির বাজারে ও অন্যান্য বাণিজ্যক্ষেত্রে মেয়েদের উপস্থিতির ছিল চোখে পড়ার মতো। এই উপস্থিতি কী ভাবে পাঠ করা সম্ভব? এই রাজ্যে নতুন কাজের অভাব ও নির্দিষ্ট কিছু কাজে মেয়েদের যুক্ত হওয়ার প্রবণতার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নাবালিকা বিয়ে ও নাবালিকা মাতৃত্বের প্রাবল্যের কী ধরনের সম্পর্ক রয়েছে? এই সব প্রশ্নের ধরন থেকেই স্পষ্ট এই বইয়ের মেয়েরা একমাত্রিক নয়— বয়স, শ্রমের ধরন (চাষবাস, অন্যের বাড়িতে কাজ, ব্যবসা), বসবাস, সময় ইত্যাদি নানা বৈশিষ্ট্য তাঁদের বহুমাত্রিক গোষ্ঠীতে পরিণত করেছে।

বাংলার মেয়েদের শ্রম, বিবাহ ও বৈধব্য: দেশভাগের আগে-পরে

ঈশিতা চক্রবর্তী, দীপিতা চক্রবর্তী

৫০০.০০

আশাদীপ

প্রশ্নের ধরন ও ঈশিতা-দীপিতার নিজস্ব প্রশিক্ষণ ঠিক করে দিয়েছে তাঁদের গবেষণার পদ্ধতি ও উপাদান। কোনও কোনও প্রবন্ধে দৈনিক ও সাময়িক পত্রপত্রিকা গুরুত্বপূর্ণ। তেমনই তাঁরা ব্যবহার করেছেন আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা, সাহিত্য। নানা প্রবন্ধে ব্যবহৃত হয়েছে জনগণণা রিপোর্ট, জাতীয় নমুনা সমীক্ষা (ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে), জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা, কৃষি মন্ত্রকের থেকে পাওয়া তথ্য সাক্ষাৎকার ও ক্ষেত্রসমীক্ষা (ফিল্ড সার্ভে)। ইতিহাস ও অর্থনীতির মেলবন্ধন সব প্রবন্ধে সমান তালে না হলেও (হওয়ার কথাও নয়), পদ্ধতি ও উপাদানের ব্যাপ্তি এই বইটির জোরের জায়গা। অবশ্য, ইতিহাস-ঘেঁষা প্রবন্ধগুলিতে মাঝে মাঝে মনে হয়, উপাদান যেন সেই সময়ের প্রেক্ষিতে আরও খুঁটিয়ে পড়া সম্ভব ছিল। সরকারি মহাফেজখানার অনুপস্থিতিও চোখে পড়ে সেখানে।

পাঠক হিসাবে অভিযোগ একটিই। আড়ষ্ট, খটমট বাংলা, ভুল বাক্যবিন্যাস, অনেক জায়গায় ইংরেজি থেকে স্পষ্ট আক্ষরিক অনুবাদ বইটির বড় দুর্বলতা। ভূমিকায় লেখিকাদ্বয় লিখেছেন, “মেয়েদের শ্রম, বিবাহ, মাতৃত্ব, বৈধব্য নিয়ে আলাদাভাবে অথবা এগুলির আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে গবেষণাধর্মী কাজ বাংলা ভাষায় নেই বললেই চলে।” এই খামতিপূরণ যখন উদ্দেশ্য, ভাষার প্রতি আর একটু যত্নশীল হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল।

আরও পড়ুন