বিদেশ থেকে ভারতে প্রবেশের সময় যাত্রীদের এখন একটি ডিজিটাল ফর্ম ভরতে হচ্ছে। জানাতে হচ্ছে, তাঁরা কোন কোন দেশে ঘুরে এসেছেন, কোনও অসুখের লক্ষণ দেখা দিয়েছে কি না। গত ১৭ মে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইবোলার প্রার্দুভাবের কথা জানিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে সতর্কতা জারি করার পর ২৫ জুন থেকে ভারতের বিমানবন্দরগুলিতে শুরু হয়েছে এই তথ্যের পরীক্ষা। বিশেষ সতর্কতা তাঁদের প্রতি, যাঁরা ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব দ্য কঙ্গো (ডিআরসি), উগান্ডা বা সাউথ সুদানে গিয়েছিলেন।
ইবোলা ভাইরাস নতুন নয়। তবে তা বরাবরই সীমাবদ্ধ থেকেছে আফ্রিকার কিছু এলাকায়। এ বার তবে বিশ্ব জুড়ে সতর্কতা কেন? প্রথম কারণ অবশ্যই ভাইরাসের মারণক্ষমতা। এ বার যে প্রজাতিটি ছড়িয়েছে, তা তুলনায় বিরল— বুন্দিবুজিয়ো। এর প্রতিষেধক নেই, ওষুধও নেই। মৃত্যুর হার প্রায় ৫০%। দ্বিতীয় কারণ, ডিআরসি-র গ্রাম, খনি অঞ্চলে ইবোলা সংক্রমণ শুরু হলেও দ্রুত তা ছড়িয়েছে বড় শহরগুলিতেও। ভাইরাস পৌঁছেছে প্রতিবেশী উগান্ডার রাজধানী কাম্পালাতে। ১৯৭৬-এ কঙ্গোর ইবোলা নদীর পাড়ে প্রথম এই ভাইরাসের সন্ধান মেলে। সেখানে আক্রান্ত ৩১৮ জনের মধ্যে ২৮০ জনেরই মৃত্যু হয়। তার পরে অনেক বার ইবোলার নানা প্রজাতি বহু মানুষের প্রাণ কেড়েছে। ২০১৪ সালে সবচেয়ে মারাত্মক মহামারি শুরু হয়— দু’বছরে পশ্চিম আফ্রিকায় ৩০ হাজারের বেশি লোক সংক্রামিত হন ‘জায়ের’ প্রজাতিতে, প্রাণ হারান অন্তত ১১ হাজার। এ বার ১৭তম ইবোলা সংক্রমণ। এবং ভাইরাসটির গতি লাগামছাড়া। গত ২৪ এপ্রিল প্রথম আক্রান্তের খোঁজ মিলেছিল ডিআরসি-র বুনিয়ায়, এক স্বাস্থ্যকর্মীর শরীরে। প্রচণ্ড জ্বর ও অভ্যন্তরীণ রক্তপাতে তিন দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানতে পারে ৫ মে। মাঝে আরও ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৪ মে রক্ত পরীক্ষায় ভাইরাসের প্রজাতি শনাক্ত করার দু’দিন পরই উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় দু’জন ইবোলা রোগীর সন্ধান মেলে। এঁরা কঙ্গো থেকে উগান্ডায় এসেছিলেন। এখনও অবধি আক্রান্ত প্রায় ৮৫০, মৃত ১৭০। আশঙ্কা, বাস্তবে আক্রান্ত আরও বেশি।
২০০৭-এ বুন্দিবুজিয়োর সংক্রমণ হলেও এ বারের প্রজাতিটি অনেকটাই আলাদা। আক্রান্তের শরীরে উপসর্গের দেখাও মেলে দেরিতে। শুরুতে জ্বর, শরীরে ব্যথা। ক্রমে বিবিধ অঙ্গ বিকল হতে শুরু করে। ইবোলা ছড়ায় রক্ত বা অন্যান্য দেহ-তরল থেকে। স্বাস্থ্যকর্মীরাই প্রথমে সংক্রমিত হন। প্রথম মৃত এক নার্সের দেহ নিয়ে আসা হয় বুনিয়া থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে মঙ্গওয়ালুতে। শেষকৃত্যে আরও সংক্রমণ ছড়ায়। রোগ ছড়ানোর একটি প্রধান কারণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা। ইতিপূর্বে ইবোলা নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে কাজ করেছে আমেরিকা। আমেরিকার বিজ্ঞানী থেকে সেনাবাহিনী, সকলে যোগ দিত সংক্রমণ আটকানোর কাজে। সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিত ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট (ইউএসএড)। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই স্বায়ত্তশাসিত ইউএসএড-এর কাজ প্রায় বন্ধ করে দেন। বেশির ভাগ কর্মী বরখাস্ত হন। পাশাপাশি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় অর্থসাহায্য বন্ধ করে সেখান থেকে সরে যায় আমেরিকা। বাতিল করা হয় ইবোলা রোধের জন্য বরাদ্দ টাকা, যাবতীয় গবেষণা। ট্রাম্প প্রশাসনের মনে হয়েছিল, এই গবেষণায় আমেরিকার করদাতাদের লাভ হচ্ছে না। পরে অর্থসাহায্য কিছু বাড়ালেও আগেকার ব্যবস্থাপনা ফিরে আসেনি। কিছু ইউরোপীয় দেশও আমেরিকার দেখাদেখি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় সাহায্য কমিয়েছে। ফলে বিশ্ব জুড়ে অতিমারি নিয়ন্ত্রণের পরিকাঠামো দুর্বল হয়েছে।
এ বারের সংক্রমণ প্রতিরোধ শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছে। টাকার অভাবে ক্লিনিকগুলো বন্ধ হওয়ায় রক্ত পরীক্ষা হয়নি। রোগীকে চিহ্নিতই করা যায়নি, পৃথক রাখা তো দূরের কথা। তার উপর চিকিৎসার সরঞ্জাম, নিরাপদ পোশাকের অভাব হয়েছে। নজরদারি ব্যবস্থার অভাবে অনুশাসন বলবৎ করা যাচ্ছে না। বিধিমতো মৃতদেহ সৎকার করারও লোক নেই। ইউএসএড-এর কর্মীরা স্থানীয়দের মধ্যে তাঁদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতেন, তাঁদের অভাব বোঝা যাচ্ছে। তার উপর রয়েছে হিংসা। সর্বাধিক আক্রান্ত অঞ্চলগুলিতে দু’টি সোনার খনি রয়েছে, তা নিয়ে সংঘাত চলছেই। আক্রান্তরা ভয়ে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আসতে পারছেন না। আশঙ্কা, এমন চললে এক বছরেও সংক্রমণ আটকানো যাবে না।
২০২৪-এ আমেরিকা তার ফেডারাল বাজেটের মাত্র ০.৩% বরাদ্দ করেছিল বিশ্ব জুড়ে ইউএসএড-এর কর্মকাণ্ডের জন্য। সেই টাকা বাঁচিয়ে কতটুকুই বা সাশ্রয় হয়েছে? কিন্তু ইউএসএড-এর সহযোগিতার অভাব প্রতি পদে উপলব্ধি করছেন ইবোলা প্রতিরোধে সামনের সারির যোদ্ধারা। রয়েছে অর্থাভাবও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আফ্রিকা সেন্টার্স ফর ডিজ়িজ় কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন জুনের গোড়ায় আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ৫ কোটি ১৮ লক্ষ ডলার আপৎকালীন সাহায্যের আবেদন করে। বিশ্বের ধনী দেশগুলি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তৎক্ষণাৎ ৯ কোটি ডলারেরও বেশি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু এখনও অবধি মিলেছে মাত্র ১ কোটি ১৮ লক্ষ ডলার। এই বিলম্বের সুযোগে ইবোলা আরও তীব্র রূপ নিচ্ছে। কোভিডের পর আরও একটি অতিমারির সামনে দাঁড়িয়ে কি বিশ্ব?