আক্রান্ত: অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রডরিগেজ় কার্যভার গ্রহণের পর ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সামনে প্রতিবাদী জনতা, কারাকাস, ৫ জানুয়ারি। ছবি: রয়টার্স ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে অপহরণ করে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে কারারুদ্ধ করে তাঁর বিচারের তোড়জোড়— গোটা ব্যাপারটি ইদানীং কালের নানা আশ্চর্য বিষয়ের মধ্যেও অভূতপূর্ব। এই পদক্ষেপ আইনগত, নৈতিক, কৌশলগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক— সব দিক থেকেই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক ন্যায়, সার্বভৌমত্ব এবং বিধিনিষ্ঠ বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকারের স্বার্থে এই ঘটনার নিন্দা জানানোই একমাত্র যথাযথ প্রতিক্রিয়া।
ভেনেজ়ুয়েলায় আমেরিকার এই হস্তক্ষেপের পিছনে কোনও একক ও সুসংহত মহাকৌশলের অস্তিত্ব নেই। একে আমাদের বুঝতে হবে কৌশলগত, আদর্শগত এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিবেচনার বহুস্তরীয় সমন্বয় হিসেবে। এক দিকে, ভেনেজ়ুয়েলা দীর্ঘ দিন ধরেই লাতিন আমেরিকায় আমেরিকার আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ। সেই চাভেস যুগ থেকে কারাকাস যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক। ভেনেজ়ুয়েলা বিকল্প শক্তিকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে আদর্শগত ও কূটনৈতিক ভাবে নিজেকে যুক্ত করেছে এবং সার্বভৌমত্বের এমন এক ধারাভাষ্যকে সামনে এনেছে যা ওয়াশিংটনের ঐতিহ্যগত মনরো নীতিপ্রসূত ভূমিকার বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা নিয়েছিল।
নিকোলাস মাদুরো সরকারের টিকে থাকা তাই আমেরিকার সামনে কেবল একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং ওয়াশিংটনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও তার নিকটবর্তী অঞ্চলে কর্তৃত্ব বজায় রাখার পরীক্ষা হিসাবে দেখা হচ্ছিল। আমেরিকার সুনাম ও প্রতিপত্তির প্রশ্নটিই এখানে প্রধান। মুখ্যউদ্দেশ্য, অন্য রাষ্ট্রগুলিকে অনুরূপ অবাধ্যতা থেকে নিরুৎসাহ করা।
আর এক স্তরে, আমেরিকার হস্তক্ষেপের পিছনে রয়েছে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার যোগফল। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নানা পরিবর্তনের ফলে ভেনেজ়ুয়েলার বিপুল জ্বালানি সম্পদের গুরুত্ব আগের দশকগুলোর মতো গুরুত্বপূর্ণ না থাকলেও, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও সরবরাহ-বিঘ্নের প্রেক্ষাপটে এর কৌশলগত তাৎপর্য এখনও যথেষ্ট। আরও গুরুত্বপূর্ণ হল ভেনেজ়ুয়েলাকে রাশিয়া ও চিনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বহিরাগত অনুপ্রবেশের একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখার প্রবণতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ চাপ— নির্বাচনী রাজনীতি, প্রবাসী গোষ্ঠীর তদবির, এবং ‘গণতন্ত্র প্রসার’-এর ভাষ্য। সব মিলিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ওয়াশিংটনের কৌশলগত কর্তৃত্ব হারানোর গভীর উদ্বেগকেই এই পদক্ষেপ উন্মোচিত করে।
লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বার বার হস্তক্ষেপের প্রবণতা আসে ভৌগোলিক নৈকট্য, আদর্শের পার্থক্য এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অর্থনীতির পারস্পরিক ও বহুস্তরীয় মিথস্ক্রিয়ার ফল। লাতিন আমেরিকাকে দীর্ঘ দিন ধরেই ওয়াশিংটন তার কৌশলগত পশ্চাদ্ভূমি হিসেবে কল্পনা করে এসেছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির প্রভাব পড়লে তা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যের চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। অন্য দিকে, উদার-প্রাতিষ্ঠানিক ও আদর্শভিত্তিক বিশ্লেষকগণ আমেরিকান হস্তক্ষেপকে গণতন্ত্র, স্থিতিশীলতা ও আধুনিকায়নের ভাষ্যে বার বার বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় এই যুক্তি তৈরি হয়েছিল সাম্যবাদ-বিরোধিতার পরিপ্রেক্ষিতে; আর ঠান্ডা যুদ্ধোত্তর যুগে শাসনব্যবস্থা, মাদক-প্রতিরোধ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের উদ্বেগে নির্মিত হয়েছে সেই একই ভাষ্যের ভিন্ন ভাষা। কিন্তু, এর পাশাপাশি একটি কাঠামোগত মাত্রা যোগ করা প্রয়োজন। আমেরিকার হস্তক্ষেপে এমন এক আঞ্চলিক রাজনৈতিক অর্থনীতি দৃঢ় করেছে, যা আমেরিকার পুঁজির জন্য অনুকূল। এবং যা লাতিন আমেরিকায় পুনর্বণ্টনমূলক বা জনপ্রিয়তাবাদী প্রকল্পগুলিকে প্রতিহত করতে সক্ষম। অর্থাৎ লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপবাদ কোনও বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং এক ধরনের ধারাবাহিকতা, যা আমেরিকার আধিপত্য নীতির গভীরে প্রোথিত।
কিন্তু আজকের পৃথিবী অনেক পাল্টেছে। এমন হস্তক্ষেপ কোনও ভাবেই সমর্থনীয় হতে পারে না। একে তো এর ফলে আইনহীনতা ও মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপ বৈধতা পেয়ে গেল, সেই সব রাষ্ট্র উৎসাহিত বোধ করল যারা আন্তর্জাতিক আইন ও নৈতিকতার প্রতি নানা কারণে অবজ্ঞা পোষণ করে। ভেনেজ়ুয়েলার প্রতি চরম অন্যায় তো হলই, একই সঙ্গে সমগ্র আন্তর্জাতিক আইনগত ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিমজ্জিত হল ঘোর অনিশ্চয়তায়।
দ্বিতীয়ত, এই পদক্ষেপটি আমেরিকার নবসাম্রাজ্যবাদের অন্ধকারতম স্মৃতিগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করল। পূর্ববর্তী দশকগুলিতে এমন হস্তক্ষেপ— যতই ত্রুটিপূর্ণ হোক না কেন— সাধারণত গণতন্ত্র প্রসার বা মানবিক উদ্বেগের ভাষায় প্রকাশিত হত। এই ভাষ্য নিশ্চিত ভাবে অসত্য ছিল, তবু অন্তত নৈতিক বৈধতার প্রতি এক ধরনের বিশ্বাসের ইঙ্গিত বহন করত। আজ সেই ভানটুকুও পরিত্যক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার পছন্দসই শক্তিকে ক্ষমতায় বসানো পর্যন্ত কার্যত একটি দেশ শাসন করবে— এই দাবিটি এক নির্লজ্জ অবস্থানকে সদর্পে ঘোষণা করেছে।
তৃতীয়ত, এই ঘটনাটি উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার যা কিছু অবশিষ্ট রয়েছে তার ভাঙনকে আরও ত্বরান্বিত করবে। উন্মুক্ত বাণিজ্যের মানদণ্ড ও গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের ক্ষয় ইতিমধ্যেই সেই ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। ভেনেজ়ুয়েলা দেখাল উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৌলিক ভিত্তি, আইনের শাসনের, অবসান। যখন নীতি আর শক্তিশালী রাষ্ট্রসমূহের উপর বাধ্যতামূলক থাকে না, তখন ‘ব্যবস্থা’ নিজেই এক ধরনের শূন্যতায় পরিণত হয়, যার চরিত্র বলপ্রয়োগকে আড়াল করার এক মুখোশ-মাত্র। এর স্থান দখল করে নৈরাজ্যের বৈধতা, যেখানে শক্তিই একমাত্র নীতির নির্ধারক এবং আন্তর্জাতিক নিয়মাবলির কার্যকারিতা মহাশক্তিধর রাষ্ট্রের সুবিধামাত্র। এটি নিছক বিশৃঙ্খলা নয়; বরং শাসনের নীতি প্রয়োগে বিশৃঙ্খলাকেই স্বাভাবিক করে তোলার প্রক্রিয়া।
চতুর্থত, আমেরিকার বিদেশনীতির স্বার্থে এই পদক্ষেপটি বাস্তববাদী মানদণ্ডেও দুর্বোধ্য। এই হস্তক্ষেপ তার কোনও সুস্পষ্ট ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করবে বলে মনে হয় না। দুর্বল রাষ্ট্রগুলিকে দমন করা শুধু নৈতিক ভাবে ভুল নয়; কৌশলগত দিক থেকেও আত্মঘাতী। কেননা ইতিহাসে বার বার দেখা গিয়েছে যে বড় শক্তিগুলিকে তাদের নিকটবর্তী অঞ্চলে সংযম প্রদর্শন করতে হয়। বলপ্রয়োগ শুধু আঞ্চলিক ক্ষোভ, প্রতিরোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার জন্ম দেয়।
পঞ্চমত, এ এক প্রতিযোগিতামূলক ও শোষণমূলক সাম্রাজ্যবাদের নির্লজ্জ প্রদর্শন। পূর্ববর্তী বিশ্বব্যবস্থা গভীর ভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং প্রায়শই অসম ছিল; তবু অন্তত সংযম ও পর্যালোচনার প্রতি তার একটি অঙ্গীকার ছিল। এখন যে সব ঘটনা আমাদের সামনে ঘটছে, তা আরও অনেক বেশি নির্মম। এ ধরনের প্রবণতা বিচ্ছিন্ন বা সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং অন্যদেরও উৎসাহিত করে। রাশিয়া ও চিন নিজেদের প্রতিবেশী অঞ্চলে আরও অসংযমী কঠোরতা প্রদর্শনের এক ধরনের অনুমতিপত্র খুঁজে পেল। মনে রাখতে হবে, নীতিগত অবক্ষয় সংক্রামক।
এক অনিবার্য প্রশ্ন হল— ভারতের প্রতিক্রিয়া কেমন এই ঘটনার পর? ভারতের সুরটি প্রত্যাশিত। আবারও সেই কৌশলগত নীরবতা, যেখানে চুপ করে থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে হস্তক্ষেপ-বিরোধী, কৌশলী নৈতিক ভাষ্য তৈরি করার প্রয়াস। এক সময় ভারতের নৈতিক কর্তৃত্ব তার সামরিক শক্তির তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তার বক্তব্য গুরুত্ব পেত কারণ তা সুস্পষ্ট নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। আজ ভারত একটি উদীয়মান বৃহৎ শক্তি। কিন্তু তার নৈতিক শক্তির কোনও চিহ্ন নেই।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনা কোথায় থামবে জানি না। আমরা কি আইনহীন নৈরাজ্যের এই নতুন স্বাভাবিকতাকে মেনে নিয়ে তাকে ‘বাস্তববাদ’ বলে বৈধতা দেব? এই বিভীষিকাময় বাস্তবতা ন্যায়, নীতি দিয়ে তৈরি আন্তর্জাতিক বিধি ও ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপরীত।
তবে কিনা, এই পৃথিবী তো আমাদেরই সচেতন সিদ্ধান্তের ফল, অথবা সচেতন নীরবতার পরিণতি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়