জাত অস্বীকার করে নয়, জাত-বাস্তব মেনে নিয়ে সংশোধন চাই
Equity Regulations

চোখ খুলতেই হবে

আসলে, ‘সবর্ণ সমাজ’ কথাটিই সমতার পরিপন্থী, কারণ তার ভিত্তি গড়ে উঠেছে বৈষম্যমূলক জাতব্যবস্থার উপরে। তবু সবর্ণ সমাজ যে সমতার যুক্তি তুলে ধরছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি পরিচিত দাবি: শিক্ষাঙ্গনে সকল শিক্ষার্থী সমান, তাই ‘সবাইকে এক ভাবে দেখা হোক’।

রজত রায়
শেষ আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:০৬
পক্ষে: শিক্ষাক্ষেত্রে সমতার বিধির সমর্থনে ছাত্রদের মিছিল। ২ ফেব্রুয়ারি, পটনা।

পক্ষে: শিক্ষাক্ষেত্রে সমতার বিধির সমর্থনে ছাত্রদের মিছিল। ২ ফেব্রুয়ারি, পটনা। ছবি: পিটিআই।

দেশের সমস্ত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইউজিসি-র নতুন একুইটি রেগুলেশনস বা সমতার নিয়মাবলি, ২০২৬, প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই দেশ জুড়ে যে বিতর্ক ও প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে, তার গতি ও প্রকৃতি আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। ঠিক এমনটাই দেখা গিয়েছিল ১৯৯০-এর দশকে, মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) জন্য সংরক্ষণ কার্যকর হওয়ার সময়। পার্থক্য শুধু এই যে, আজ সমাজমাধ্যমের দৌলতে এই প্রতিবাদ আরও দ্রুত, আরও বিস্তৃত, আরও সমন্বিত রূপ নিয়েছে। এই আন্দোলন মূলত দেশের সবর্ণ, অর্থাৎ উচ্চজাতির সমাজ থেকেই উঠে আসছে। প্রতিবাদীদের প্রধান অভিযোগ: একুইটি রেগুলেশনস-এ জাতকে বৈষম্যের স্বীকৃত ক্ষেত্র হিসাবে চিহ্নিত করে ইউজিসি নাকি সমাজের ‘সমতা’ নষ্ট করছে। নতুন এই নিয়মে আলাদা একুইটি কমিটি গঠন করে তফসিলি জাতি, জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত ছাত্রছাত্রীদের জন্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। উচ্চজাতের আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, এই ব্যবস্থার অপব্যবহার হবে, বিশেষত তাঁদের অর্থাৎ সবর্ণদের বিরুদ্ধে।

সহজ ভাষায়, সবর্ণ সমাজের ভয় যে, নতুন নিয়ম চালু হলে উল্টে তারাই জাতভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হবে। ঠিক যেমন, আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বহু পুরুষ বলে থাকেন, কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য যৌন হেনস্থাবিরোধী আইন থাকায় নাকি পুরুষদের প্রতি বৈষম্য করা হয়।

ইউজিসি-র ঘোষিত উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট: বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে জাতভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ যেন প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শোনা যায়, তার বিচার সম্ভব হয়। এ কোনও জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়; বরং পশ্চাৎপদ জাতির জন্য ন্যায়বিচারের ন্যূনতম কাঠামো তৈরির চেষ্টা মাত্র।

তা সত্ত্বেও, এই দেশব্যাপী আলোড়নের প্রকৃত কারণ কী? উত্তর নিহিত আছে প্রশ্নকর্তার সামাজিক অবস্থান এবং তার সমতা-বোধের মধ্যেই। বর্তমান এই আন্দোলন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পিতৃতান্ত্রিক সবর্ণ সমাজে সমতাকে এমন এক তথাকথিত নিরপেক্ষতার ধারণা হিসাবে কল্পিত হয়, যেখানে শিক্ষাঙ্গনে জাতের উল্লেখকেই সমস্যা বলে মনে করা হয়। ফলে যে নীতি বা আইন জাতভিত্তিক বৈষম্যকে দৃশ্যমান করে, তাকেই মনে হয় পক্ষপাতদুষ্ট। অথচ বাস্তব কি সত্যিই ততটা সরল?

আসলে এই নিয়মগুলি আদৌ নতুন নয়। ২০১২ সালেও ইউজিসি নীতি চালু করেছিল। তখনও সমান সুযোগ ছিল, অভিযোগ জানানোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল। পার্থক্য শুধু এই যে, তখন স্পষ্ট করে বলা হয়নি কারা কাঠামোগত ভাবে জাতভিত্তিক বৈষম্যের শিকার। এত দিন সেই রেগুলেশনগুলি দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যত কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল।

বহু শিক্ষার্থী বিশ্বাস করতেন না যে, সেখানে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব, যে-হেতু কমিটির নেতৃত্বে থাকতেন যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর সদস্যরাই। ইউজিসি-র পরিসংখ্যান এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতারই সাক্ষ্য দেয়। গত পাঁচ বছরে জাতভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ ১১৮.৪% বেড়েছে। বেড়েছে তফসিলি জাতি, জনজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাও। এমনকি সর্বোচ্চ আদালতও প্রশ্ন তুলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি আদৌ বৈষম্যবিরোধী ব্যবস্থা কার্যকর করতে ইচ্ছুক কি না।

এ বার আসা যাক তথাকথিত ‘অপব্যবহার’ প্রশ্নে। প্রথমেই বলা দরকার, যে কোনও অভিযোগ ব্যবস্থার অপব্যবহার সম্ভব। আদালতেও মিথ্যা মামলা হয়; কিন্তু তাই বলে কেউ আদালত ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার দাবি করেন না। হয়রানি-বিরোধী আইনেও অপব্যবহারের আশঙ্কা থাকে; তবু আইন বাতিল করা হয় না। তা হলে এ ক্ষেত্রে কেন অপব্যবহারের দোহাই দিয়ে গোটা ব্যবস্থাটিকেই বাতিল করার দাবি উঠছে? উত্তরটা সহজ। কেবল এর মাধ্যমে জাতভিত্তিক বৈষম্যের বাস্তবতাকে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলে।

আসলে, ‘সবর্ণ সমাজ’ কথাটিই সমতার পরিপন্থী, কারণ তার ভিত্তি গড়ে উঠেছে বৈষম্যমূলক জাতব্যবস্থার উপরে। তবু সবর্ণ সমাজ যে সমতার যুক্তি তুলে ধরছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে একটি পরিচিত দাবি: শিক্ষাঙ্গনে সকল শিক্ষার্থী সমান, তাই ‘সবাইকে এক ভাবে দেখা হোক’। এই দাবি শুনতে ন্যায্য মনে হলেও, এর মধ্যেই একটি মৌলিক প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়। জাতভিত্তিক সমাজে সবাই কি একই সামাজিক অবস্থান থেকে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে? উত্তর হল, না। কেউ আসে বহু প্রজন্মের শিক্ষিত পরিবার থেকে, যার কাছে বই, ভাষা, আত্মবিশ্বাস, সামাজিক নেটওয়ার্ক আগে থেকেই প্রস্তুত। আবার কেউ আসে প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী হিসাবে, যার কাছে বিশ্ববিদ্যালয় একটি অপরিচিত, ভীতিকর পরিসর।

এই পার্থক্যগুলি কেবল অর্থনৈতিক নয়। ভাষা, আচরণ, আত্মবিশ্বাস এবং গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে এই সব পার্থক্য বড় ভাবে অনুভূত হয়। কেবল উচ্চারণ দিয়েই কে যোগ্য, কে অযোগ্য, তা নির্ধারিত হয় যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সেখানে সবাইকে একই ভাবে দেখার দাবি অর্থহীন।

এবং ঠিক এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধু একটি প্রাতিষ্ঠানিক বা ফিজ়িক্যাল স্পেস হিসাবে দেখা যথেষ্ট নয়— বরং একটি সোশ্যাল স্পেস বা সামাজিক ক্ষেত্র হিসাবেই দেখতে হবে। এখানে কে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে, কে শিক্ষকের অতিরিক্ত মনোযোগ পাবে, আর কে নীরবে আড়ালে থেকে যাবে— এ সবই কিন্তু সমাজ ও সংস্কৃতির দ্বারা নির্ধারিত। সাম্প্রতিক গবেষণা দেখায়, দলিত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অপমান, বঞ্চনা, ঘৃণা, এবং একাকিত্ব বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নিয়মিত অংশ। এর প্রভাব কখনও কখনও এতই গভীর যে, তা প্রাণঘাতী হতে পারে। এই অসমতাকে উপেক্ষা করে সবাইকে ‘একই ভাবে’ দেখার দাবি আসলে সমতার দাবি নয়। বরং বলা যায়, এক কাগুজে নিরপেক্ষতার দাবি।

এই প্রসঙ্গে, মতাদর্শগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ ও বাম, উভয় রাজনৈতিক ধারাতেই ‘জাতহীন সমতা’-র ভাষা প্রবল। দক্ষিণপন্থী রাজনীতি ধর্ম ও জাতীয় ঐক্যের বয়ানের মাধ্যমে জাতগত বিভাজনকে আড়াল করে, পাশাপাশি অন্য ধর্মকে বিচ্ছিন্ন ও ‘অন্য’ হিসাবে চিহ্নিত করে। অন্য দিকে, বামপন্থার একাংশ শ্রেণি ও সার্বজনিক ন্যায়ের কথায় জোর দিতে গিয়ে জাতিগত সুবিধা ও ক্ষমতার প্রশ্নকে আড়ালে ঠেলে দেয়। ফলে উভয় ক্ষেত্রেই জাতকে অতীতের বা গ্রামীণ সমস্যা হিসাবে কল্পনা করা হয়, আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক জীবনের বর্তমান বাস্তবতা হিসাবে দেখা হয় না।

এই দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। নিজেদের ভদ্র বাঙালি ও প্রগতিশীল বলে ভাবেন যাঁরা, তাঁদেরই একটি বড় অংশ দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষা, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক পরিসরে সামাজিক বৈচিত্র এবং ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণে অনাগ্রহী থেকেছেন। ভদ্রশ্রেণির বাঙালির ব্যক্তিগত পরিসর— বন্ধুবৃত্ত, নিকট সমাজ, প্রতিবেশী ও পারিবারিক জাতপরিচয়— সবেতেই এই সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। অথচ ১৯৩১ সালের জাতভিত্তিক জনগণনা অনুযায়ী অবিভক্ত বাংলায় ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্য মিলিয়ে সবর্ণ হিন্দুর সংখ্যা ছিল মোট হিন্দু জনসংখ্যার ১৫ শতাংশেরও কম; বৈদ্য সম্প্রদায় ছিল এক শতাংশেরও নীচে। দেশভাগ ও উদ্বাস্তু আগমন এই পরিসংখ্যানে পরিবর্তন এনেছে ঠিকই, কিন্তু এই তথ্য মোটের উপরে দেখিয়ে দেয় সংখ্যাগত সংখ্যালঘু সবর্ণ গোষ্ঠীর হাতেই দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষমতার অগণতান্ত্রিক কেন্দ্রীভবন ঘটেছে। আজ যদি এই রাজ্যে জাতভিত্তিক জনগণনা হয়, চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

এই ধারাবাহিকতা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও চোখে পড়ে। এআইএসএইচই, ২০১৪-এর রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসসি, এসটি ও ওবিসি শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ১০ শতাংশেরও কম। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী তা বেড়ে প্রায় ২৩ শতাংশে পৌঁছেছে, তবু প্রতিনিধিত্ব এখনও অসম। এই তথ্যগুলি তুলে ধরা মানে বৈষম্য সৃষ্টি করা নয়, কিংবা সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করা নয়। বরং এটি দু’ধরনের সমতার ধারণার ফারাক স্পষ্ট করে: একটি সবর্ণ সমতা-বোধ, যা আনুষ্ঠানিক সমতার নামে সামাজিক বৈষম্যকে অদৃশ্য রাখে। আর একটি নীতিগত সমতা, যা বৈষম্যের বাস্তবতাকে স্বীকার করে সংশোধনের মধ্য দিয়ে সমতার দিকে এগোতে চায়।

দুঃখের বিষয়, বাংলার বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক চর্চায় দ্বিতীয় ধারণাটির উপস্থিতি খুবই দুর্বল। যাঁরা আলোচনার কেন্দ্র দখল করে আছেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের জাতিগত সুবিধা স্বাভাবিক ও প্রশ্নাতীত বলে মনে করেন। ফলে শুধু প্রতিনিধিত্বের অসমতা নয়, জাত নিয়ে আলোচনা, সংবেদনশীলতা ও জবাবদিহির উদ্যোগ আজও সীমিত।

সুতরাং, রেগুলেশনস-এর ‘অপব্যবহার’-এর আশঙ্কা আসলে ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে নয়— বরং এত দিন অদৃশ্য থাকা সামাজিক পুঁজি ও সুবিধা প্রশ্নের মুখে পড়ার কারণে অস্বস্তির প্রকাশ। একুইটি রেগুলেশনস ২০২৬ নীরবতার রাজনীতি ও সবর্ণ সমতার আদর্শের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে চোখ খুলতেই হবে। জাতকে অস্বীকার করার মাধ্যমে নয়, জাতকে বুঝে এবং তা সংশোধনের মাধ্যমেই এগোতে হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন